ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
সাবেক প্রধান,
প্যাথলজি বিভাগ,
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ
এবং
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ
সিনিয়র কনসালটেন্ট এন্ড চিফ
হাসপাতাল ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি,
কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ।
০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ০২:৪৪ পিএম
কিংবদন্তি শিক্ষক অধ্যাপক ডা. আব্দুল হাই
অধ্যাপক ডা. আব্দুল হাই ফকির স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। এনাটমির শিক্ষক। আমার অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক। সবচেয়ে ভয় পেতাম যে শিক্ষককে।
১৯৮০ সনে মাত্র এমবিবিএস ক্লাস শুরু হয়েছে। আমার পাশে বসা বন্ধু ক্লাসে একটু ঝিমিয়ে পড়ছিল। স্যার, বেত হাতে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। আমার সেই ক্লাসমেটকে বললেন ‘হাত তোলো। ঘুম ছাড়িয়ে দেই। হাত পাতো। গুনে গুনে ৫টি বেত মারবো। হাত নামাবে না।’
এই বলে খুব জোড়ে জোড়ে ৩টি বেত মারলেন। হাত নিচে নেমে গেল। আবার হাত পাততে বললেন। বাকী ২টি শেষ করে মঞ্চে চলে গেলেন।
এই বেত্রাঘাত সর্ব শেষ দেখেছিলাম হাই স্কুলে। মেডিকেল কলেজে বেত্রাঘাত দেখতে হবে কল্পনাও করিনি। এরপর স্যারের ভয়ে ক্লাসে কারো আর তন্দ্রা আসেনি।
স্যার ক্লাসে খুব সুন্দর করে পড়া বুঝিয়ে দিতেন। শেষে বলতেন, ‘সবাই বুঝতে পেরেছো? কেউ যদি বুঝতে না পারো, ক্লাসের পর আমার রুমে যাবে। আমি আরও ভালো করে বুঝিয়ে দেবো।’
শাহ আলম কাকা আমাকে বলে দিয়েছিলেন, ‘কেউ যদি ক্লাসের পর স্যারের রুমে গিয়ে বলে আমি ভালো বুঝতে পারিনি। স্যার তাকে নাস্তা নাবুদ করে ছেড়ে দেন। বলেন, আমি ক্লাসে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছি, তখন তুমি ঘুমিয়ে ছিলে? এই রকম ছাত্রের ফেল করার আশঙ্কাই বেশি আছে।’
অনেক ছাত্রই আমার মতো স্যারকে ভয় পেতো। স্যার অত্যন্ত সৌখিন জীবনযাপন করতেন। তিনি প্রাইভেট প্রাক্টিস করতেন না। মাঝে মঝে দেখতাম, বিকেলে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরে মাঘমারা বয়েস হোস্টেলের মাঠের ভিতর দিয়ে হেঁটে উত্তর দিকে বেড়াতে যেতেন। প্রভাবক শিক্ষক হওয়ায় তাকে হোস্টেল সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কেউ হোস্টেলে ফাইজলামী করলে স্যার তাকে খপ করে ধরে ফেলতেন।
স্যারকে নিয়ে আমরা মজার মজার স্মৃতিচারণ করি। স্যারকে আমি শেষ দেখেছি ১৯৯৩ সনের দিকে। আমি পিজিতে এমফিল কোর্সে ছিলাম। একই সময় লিফটে উঠেছিলাম। দেখে আগের মতোই ভয় পেলাম। সালাম দিয়ে বললাম, ‘স্যার, আমি আপনার ছাত্র সাদেক।’
স্যার আমার পিঠে হাল্কা একটা কিল দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে আমি চিনি না? আমার কাছে পরিচয় দিতে হবে? এখন কি করছো?’ স্যারের কিল খেয়ে আমি ধন্য হলাম।
একটি মজার ঘটনা বলে শেষ করি। আমি ও নজরুল সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে বাঘমারা হোস্টেল থেকে বের হয়ে গাংগিনার পাড়ের উদ্দেশে এক বিকেলে রেললাইনের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি, বিপরীত দিক থেকে সেবাব্রত ও শফিক দৌড়িয়ে আসছে।
-কি হইছে? দৌঁড়াও কেন?
-ওই দিকে যেও না। হাই স্যার গেছে।
-আমরা দুজন ইউটার্ন নিয়ে তাদের সাথে এক লাইন হয়ে হোস্টেলের দিকে এক যোগে দৌঁড়াতে লাগলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর খুব সম্ভব আলীর সাথে দেখা। সে না বুঝেই আমাদের সাথে দৌঁড়াতে লাগলো। হাঁপাতে হাঁপাতে যার যার রুমে আশ্রয় নিলাম, হাই স্যারের ভয়ে।