০৮ অগাস্ট, ২০২১ ০৯:৩০ পিএম

ইন্টার্নসংকটে পড়ছে মেডিকেলগুলো, স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা

ইন্টার্নসংকটে পড়ছে মেডিকেলগুলো, স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা
প্রতীকী ছবি।

সাখাওয়াত আল হোসাইন: করোনাভাইরাসের কারণে দফায় দফায় ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইন্টার্ন চিকিৎসক সংকটে পড়তে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলো। এতে করোনার এই সময়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হাসপাতালে একজন রোগীকে সুস্থ করে তোলার বিষয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আসন্ন সংকট সমাধানে ইন্টার্নিরত চিকিৎসকদের আরও মাস তিন হাসপাতালে রাখতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলেই তা কার্যকর হবে। তবে করোনায় এরই মধ্যে জীবনের অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে ইন্টার্নশিপ প্রলম্বিত করার বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন তরুণ চিকিৎসকরা।  

সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে বড় একটি অংশ ইন্টার্ন শেষ করেছেন এবং আগামী ৯ আগস্ট শেষ করবেন আরেকটি অংশ। অল্প কিছু ইন্টার্ন চিকিৎসক হাসপাতালে থাকবেন, যারা জানুয়ারিতে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। ইন্টার্ন চিকিৎসক সংকট চলমান থাকায়, কিছু কিছু হাসপাতালে তিনজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের কাজ একজন দিয়ে করানো হয়। এতে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকেন তারা। কারও কাছে কোনো অভিযোগ দেওয়ার সুযোগও পান না এসব চিকিৎসক।

সূত্রে আরও জানা গেছে, হাসপাতালের ইভেনিং শিফটে ইন্টার্ন চিকিৎসকদেরকে সিনিয়র চিকিৎকরা বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়ে যান। সে অনুযায়ী কাজ করেন শিক্ষানবিশ এ চিকিৎসকরা। অনেক হাসপাতালে বাকি শিফটগুলোতে প্রায় সময় শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই রোগীকে দেখাশোনা করে থাকেন। এ হিসেবে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হাসপাতালের প্রাণ বিবেচনা করা হয়। দিন-রাত পরিশ্রম করে রোগীকে সুস্থ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালান এ চিকিৎসকরা। অধিকাংশ সময় একজন রোগী হাসপাতালে এলে তার চিকিৎসার সূচনা হয় ইন্টার্নদের মাধ্যমে।

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক জেরিন শিকদার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এমবিবিএস কোর্সে আমরা যেসব কিছু পড়াশোনা করেছি। তা বাস্তবে শিখতে পারি ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে। কিভাবে প্রেসক্রিপশন লিখতে হবে, কিভাবে একজন রোগীকে রিসিভ করতে হবে। কিভাবে একজন রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে ইত্যাদি।’

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে সারাদিন রোগীর খোঁজ-খবর নেয় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এছাড়া সকাল-বিকাল রোগীদের ফলোআপ দেওয়াও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দায়িত্ব। করোনাকালীন সময়ে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম থাকায়, শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হয়।

শহীদ সোহরাওর্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ফায়াজ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘একজন রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা দেন ইন্টার্ন চিকিৎসক। রোগীকে সবসময় দেখাশোনা করেন ইন্টার্নরা। একজন রোগীর কাছে সবচেয়ে বেশি সময় দেন তারা। এছাড়া রোগীদের সমস্যাগুলো সিনিয়র চিকিৎসক বা স্যারদের কাছে আমরাই প্রথমে তুলে ধরি। এরপর রোগী তার মত করে জানান।’

দায়িত্বের বিপরীতে কম সম্মানি পাওয়ায় খেদোক্তি প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘ইন্টার্ন চিকিৎসকরা হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করেন, সেই তুলনায় তাদেরকে সম্মানি দেওয়া হয় খুবই কম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সুযোগ-সুবিধার দিকগুলো তেমন দেখা হয় না। আমরা যে এত ডিউটি বা পরিশ্রম করি, সেই অনুযায়ী মাসিক বেতন-ভাতা খুবই অল্প।’

গোপালগঞ্জ শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. নুর মোহাম্মদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসক যা থাকার কথা তার তুলনায় খুবই কম রয়েছে। কারণ বড় একটি অংশ গত জুলাই মাসেই ইন্টার্নশিপ শেষ করেছেন। এতে হাসপাতালে আমাদেরকে বেশি সময় এবং পরিশ্রম দেওয়া লাগে।’

ইন্টার্ন হিসেবে এক বছরের বেশি সময় থাকার বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করে বেশ কয়েকজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক বলেন, ‘একবছরের ইন্টার্ন শেষ হওয়ার হওয়ার পর আর কেউই ইন্টার্ন হিসেবে থাকতে চায় না। ইন্টার্নে বেতন-ভাতা কম। বেশি কাজ এবং পরিশ্রম করা লাগে। আমরা পরবর্তী বিসিএস, উচ্চতর ডিগ্রি বা ভালো চাকরির জন্য চেষ্টা করবো।’

গোপালগঞ্জ জেলা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. অসিত কুমার মল্লিক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে এখন আছে মাত্র ১৮ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক। যা থাকার কথা তাঁর তুলনায় অনেক কম। আজ তো পরীক্ষা শুরু হয়েছে, এ পর্যন্ত আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া চিকিৎসক বাড়ানোর জন্য আমরা ঢাকা বিভাগের পরিচালক স্যারের কাছে দরখাস্ত দিয়ে রেখেছি।’

তিনি আরও বলেন, ইন্টার্ন যে সম্মানি দেওয়া উচিত, তার তুলনায় খুবই কম দেওয়া হয়। তাদের বেতন আরও বাড়ানো উচিত।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কবির মেডিভয়েসকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। এজন্য কেন্দ্রীয় একটা সিদ্ধান্ত আসবে। ইন্টার্ন চিকিৎকরা চলে গেলে সেবা একটু ব্যাহত হবে, কিন্তু আমরা তো টিচিং হসপিটাল। অন্যান্য এমডি, এমএস কোর্সে  যারা আছেন, বিকল্প হিসেবে তাদেরকে দিয়ে আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ ধরনের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। তারপরও এ ব্যাপারে কেন্দ্র একটা সিদ্ধান্ত দেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইন্টার্ন ছাড়া হাসপাতাল চলবে না এমনটা নয়। তারপরও হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের প্রয়োজন রয়েছে।’

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া মেডিভয়েসকে বলেন, ‘চলমান ইন্টার্ন চিকিৎসক যারা রয়েছেন, তাদেরকে আরও মাস তিন হাসপাতালে রাখার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় প্রস্তাবের অনুমোদন দিলে, তা কার্যকর করা হবে।’

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সম্মানি বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সম্মানি বাড়ানোর জন্য আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। আর আর্থিক লেনদেনের বিষয়টা সম্পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন, মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সম্মানি বাড়ানো যাবে।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক