নিপসমের গবেষণা
এইচআইভিতে সর্বাধিক সংক্রমিত পরিবহন শ্রমিকরা, তারপরে দিনমজুর শ্রেণী
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার যক্ষ্মা রোগীর মধ্যে একজন এইচআইভিতে আক্রান্ত। এইচআইভি সংক্রমিতদের শীর্ষে রয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। আর তারপরের অবস্থানে দিনমজুর শ্রেণী। সোমবার (২৮ জুন) ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা কর্মের মুখ্য গবেষক নিপসম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশে যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের ব্যাপ্তি নিরূপণ’ শীর্ষক জাতীয় জরিপ পরিচালনায় ছিল নিপসম। এতে অর্থায়ন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের TB-LASP 'অপারেশন প্ল্যানে'র মাধ্যমে গ্লোবাল ফান্ড (GFATM)। দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ‘টিবি রিপোর্টিং সেন্টারের’ (টিআরসি) মাধ্যমে বাংলাদেশের যক্ষ্মা রোগীদের নিবন্ধন ও সেবা প্রদান করা হয়। গত বছরের অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত TRC-তে নিবন্ধিত ১২ হাজার ৬৫ জন যক্ষ্মা রোগীর কাছ থেকে রক্ত এবং ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে।'
ফলাফলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক নিচে উপস্থাপন করা হলো:
১. বাংলাদেশে যক্ষা রোগীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার ০.১% অর্থাৎ অর্থাৎ প্রতি ১০০০ যক্ষা রোগীর মধ্যে ১ জনের দেহে AIDS রোগের জীবাণু এইচআইভি (HIV) ভাইরাস রয়েছে।
২. নারী এবং পুরুষ উভয়ের মধ্যে এই হার সমান ০.১%, তবে তৃতীয় লিঙ্গের মধ্যে কোনো এইচআইভি সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
৩. ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা (Drug Resistance Tuberculosis=DRTB) রোগীদের মধ্যে একজনও এইচআইভি সংক্রমিত নয়।
৪. বয়স ভিত্তিক দলের মধ্যে ৩৫-৪০ বছর বয়সী দলে এইচআইভি সংক্রমণ হার (০.২%) সবচেয়ে বেশি। ১৫ বছরের চেয়ে কম বয়সীদের মধ্যে কোনো এইচআইভি সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। অন্যান্য বয়সভিত্তিক দলে এইচআইভি সংক্রমণের হার একই (০.১%)।
৫. ফুসফুসের যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার ০.১% এবং ফুসফুস বহির্ভূত অঙ্গে যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এই হার ০.০৭%। অন্যদিকে যারা এইচআইভি পজিটিভ হয়েছেন তাদের বেশির ভাগই (৮৩.৩%) ফুসফুসের যক্ষ্মায় আক্রান্ত।
৬. যারা গবেষণায় স্যাম্পল (রক্ত) ও উত্তর প্রদানকারী তাদের মধ্যে ২ হাজার ৮০ জন (১৭.২%) বিভিন্ন সহরোগে (Comorbidity) আক্রান্ত; শতকরা ১৪.৪ ভাগের অন্তত ১টি সহরোগ রয়েছে, ২.৩ ভাগের ২টি সহরোগ এবং ০.৫% ভাগের তিনটি বা তার অধিক সহরোগ রয়েছে।
৭. যাদের সহরোগ হয়েছে তাদের মধ্যে বেশির ভাগই (৪৪.৮%) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত; তারপরে পর্যায়ক্রমে রয়েছে হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ (১৭.২%), অ্যাজমা বা হাঁপানি (১৫.৪%), শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধি (COPD) (৯.৮%), হৃদরোগে (৮%), হেপাটাইটিস (২.৩%), দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (১.৯%) ভাগ ইত্যাদি।
৮. এক-চতুর্থাংশ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বড় বা ছোট সার্জারির ইতিহাস রয়েছে এবং ৫.৪% ভাগের নিজ দেহে রক্ত সঞ্চালনের ইতিহাস রয়েছে।
৯. যক্ষ্মা রোগীদের মুখে এক-চতুর্থাংশই ছিল ঢাকা বিভাগ থেকে এবং সবচেয়ে কম সংখ্যক ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা (DRTB) এবং যক্ষ্মা (TB) রোগীদের অনুপাত সবচেয়ে বেশি রাজশাহীতে এবং সবচেয়ে কম খুলনা এবং ময়মনসিংহে।
১০. পেশার হিসেবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এইচআইভি সংক্রমণ পরিবহন শ্রমিকদের মাঝে (০.৫%), তারপরই রয়েছে দিনমজুর (০.৩%)।
১১. পূর্ণসংখ্যার হিসেবে যে ১২ জন HIV-Positive যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে, তাদের ভিতর ৪ জনই গৃহিণী।
১২. শিক্ষাগত যোগ্যতার সূচকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এইচআইভি সংক্রমণ পাওয়া গেছে যারা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করতে পারেননি তাদের ভিতর (০.২%)।
১৩. এইচআইভি সংক্রমিত যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে কারোরই নিজ দেহে রক্ত পরিসঞ্চালনের ইতিহাস নেই।
১৪. যে সমস্ত TRC-তে যক্ষ্মা রোগীদের কাছ থেকে ডাটা ও স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে সে সমস্ত TRC-র মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের ভৌগলিক বিতরণে কোনো পার্থক্য নেই (গ্রামীণ/শহুরে/ শহরের আশপাশে)।
১৫. যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে কোভি-১৯ রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় RT-PCR পরীক্ষা করার হার কম (৪.৫%); যারা পরীক্ষা করেছেন তাদের ভিতর পজিটিভ ৪.২%।
সহ-মুখ্য গবেষক হিসেবে কাজ করা নিপসম গবেষক দলের সদস্যরা হলেন ডা. শামসুল ইসলাম মাসুম ও ডা. ফাহমিদা খানম। গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন ডা. কামরুল আমিন, ডা. জাবিন আখতার, ডা. নাসরীন ফারহানা রনক, ডা. নাজনীন জাহান, ডা. মোহাম্মদ জামালুদ্দিন সাইফ, ডা. নাজমুল হাসান রিফাত, ডা. উম্মুল খায়ের আলম, ডা. ফাতেমা, ডা. বায়জিদ আমিন, ডা. সাদিয়া সোবহান এবং ডা. ইফরান নওরোজ নূর।
সহ-গবেষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ বলেন, ‘তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ঐক্যবদ্ধ সমন্বয়ের সুন্দর ফলশ্রুতি এই জরিপের মধুরেণ সমাপয়েৎ। তাদের সকলের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। একই সাথে TB-LASP-এর লাইন ডিরেক্টর এবং তার দলের সকল সদস্য ধন্যবাদার্হ। স্যাম্পল ও ডেটা সংগ্রহকারী (Medical Technologist) এবং সুপারভাইজার হিসেবে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করেছেন এবং প্রকল্প কার্যালয়ে অর্থ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় যারা কাজ করেছেন তাদের কাছেও আমরা ঋণী।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন TB-LASP-র লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. সামিউল ইসলাম সাদী। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে স্বল্পসংখ্যক অতিথিকে সশরীরে উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়া গিয়েছিল।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা Zoom-এর মাধ্যমে সংযুক্ত ছিলেন। এটি ফেসবুকে Live প্রচার করা হয়।