বিশেষজ্ঞদের ভাবনা
স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত
মুন্নাফ রশিদ: করোনাভাইরাসে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে যেমন বিরুপ প্রভাব পড়েছে তেমনি মানুষের জীবনযাত্রায়ও এসেছে পরিবর্তন। আর স্বাস্থ্যখাতের ধাক্কা জানিয়ে দিয়েছে বিশ্বজুড়ে তার প্রয়োজনীয়তা। যদিও এই ধাক্কা থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশ। করোনার প্রথম ধাক্কার পর অর্থনীতিসহ স্বাস্থ্যখাতের ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই হাজির করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। যদিও করোনার ভ্যাকসিনে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছে গোটা বিশ্ব। তাই সবার মতো সরকারেরও দৃষ্টি এই প্রতিরোধী ভ্যাকসিন বা টিকার দিকে।
ফলে জনগণের চাহিদা ও অর্থনীতির চাকা ঠিক রাখতে সংশ্লিষ্ট খাতে বাড়াতে হচ্ছে কর্মসূচি। তাই আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোর মধ্যে চলে আসছে স্বাস্থ্যখাত। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্যখাতে গত বছরের তুলনায় এবার বরাদ্দ বাড়াচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গণমাধ্যমে সে আভাস দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদসহ চিকিৎসকরা বলছেন, স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যবহারে সক্ষমতার পাশাপাশি বজেট পাসের পর দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রণোদনার জন্য আলাদা বাজেট রাখার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের এই বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। তবে ভ্যাকসিনসহ সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আগামী বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে বরাদ্দের হবে পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ থাকবে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটে রয়েছে ২২ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগকে দেয়া হবে প্রায় নয় হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটে রয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।
যদিও চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা যা জিডিপির ১.৩ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ৭.২ শতাংশ। পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে যা দাঁড়ায় ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছর থেকে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় ৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মোট বাজেটের অনুপাতে বরাদ্দ বাড়লেও এবং জিডিপির শতাংশ হিসাব করা হলে বরাদ্দ বাড়ছে না। চলতি অর্থবছরে মোট বাজেটের ৫.১৫ শতাংশ বরাদ্দ ছিল স্বাস্থখাতে। এবার সেটি বাজেটের ৫.৬ শতাংশে উন্নীত হচ্ছে। অন্য দিকে চলতি সালে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ০.৯২ শতাংশ বরাদ্দ ছিল এবার তা কিছুটা কমে ০.৮৬ শতাংশে নেমে আসছে। বাড়তি বাজেটের বড় একটি অংশই অবশ্য খরচ হবে পরিচালন ব্যয়ে। বাকিটা মূলত ব্যয় হবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে।
জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সরকারি হাসপাতালগুলোকে অত্যাধুনিক করার পাশাপাশি করোনা মোকাবেলায় নতুন করে দুই হাজার চিকিৎসক, ছয় হাজার নার্স এবং ৭৩২ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব করা হতে পারে।
আগামী ৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ‘জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য, আগামীর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে যে বাজেট বক্তৃতা দিবেন সেখানে স্বাস্থ্য খাতের এসব বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য থাকবে বলে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে যা ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের দেশে বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ সবসময় জিডিপির দুই শতাংশের নিচে থাকে। এই উপমহাদেশের মধ্যে আমাদেরটাই সর্বনিম্ন বরাদ্দ। ফলে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো উচিত। এ খাতে কমপক্ষে জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। তবে বাজেট বাড়ানোর চেয়ে আমি মনে করি স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির কত শতাংশ বরাদ্দ হচ্ছে।’
নীতিমালায় পরিবর্তন পরিবর্ধন করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে পরিমাণ বরাদ্দ হচ্ছে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্যখাতে যারা কাজ করছে তারা যেন সঠিকভাবে ব্যয় করতে পারে সে জন্য নীতিমালাগুলোকে একটু পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা দরকার। কারণ যা বরাদ্দ থাকে আইনি জটিলতার কারণে তাও আমরা সঠিকভাবে খরচ করতে পারি না। ফলে ব্যয় সংশ্লিষ্টদের প্রশাসনিক জ্ঞানের পাশাপাশি যথেষ্ট অর্থনৈতিক জ্ঞান থাকা দরকার। তাই স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি একাডেমি অর্থাৎ একাডেমি অব প্লানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট দরকার।’
স্বাস্থ্যখাতে অনেক বেশি বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম বলেন, ‘আশা করি সরকার এবার চলতি বাজেটের চেয়ে স্বাস্থ্যখাতে অনেক বেশি বরাদ্দ বাড়াবে। কেননা স্বাস্থ্যেই হচ্ছে সর্বসুখের মূল। কেননা স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে কোনও কিছুই সম্ভব না। তাই এ খাতের বাজেটে অন্য দৃষ্টি দিতে হবে। ফলে প্রতিরক্ষা খাতে যে বরাদ্দ থাকে তার চেয়ে বেশি না হলেও সমপরিমাণ বরাদ্দ হওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের দেশে স্বাস্থ্যখাতে সব সময় বাজেট কম থাকে। দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বা এ খাতের চাহিদা অনুযায়ী যে বাজেট আছে তা মোটেই প্রতুল নয় অপ্রতুল। সে কারণে আমরা সবসময় স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য তাগিদ দিয়েছি। তাহলে এখানে কত বাড়াতে হবে? সেটিও আমরা বলেছি। তা হচ্ছে মোট বাজেটের কমপক্ষে ১০ শতাংশ বাড়ানো উচিত। এছাড়া করোনা নিয়ন্ত্রণসহ ভ্যাকসিনের জন্য বিশেষ বাজেট রাখাতে হবে।
প্রণোদনার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতে চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রণোদনা যতটুকু পাওয়ার কথা ছিল তা পুরোটা পায়নি কিছু কিছু পেয়েছি। ফলে প্রণোদনার জন্য আলাদা বাজেট করতে হবে।’
এছাড়া বাজেটের সঠিক ব্যবহারে মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতার দূর্বলতা আছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, ‘অনেক সময় মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতার অভাবের কারণে দেখা যায় যে, বাজেট শেষ হয়ে যাচ্ছে বা সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। সুতরাং মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যবহারে সক্ষমতা থাকতে হবে। এর পাশাপাশি বজেট পাশের পর দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা অর্থবছরের একেবারে শেষের দিকে যদি ছাড় করা হয় তাহলে কাজ হওয়ার বদলে অপব্যবহার বেশি হয়।’
বিএসএমএমইউর সাবেক ভিসি বলেন, ‘দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থার তুলনায় যে অবকাঠামো রয়েছে তা মোটামুটি সন্তোষজনক। তবে এর আওতা বাড়ানোর জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থার কিছু সংস্কারের দরকার আছে।’
এছাড়া বাজেট ব্যয়ের ক্ষেত্রে যাতে কোনও ধরনের দুর্নীতি না হয় সে জন্য কড়া নজরদারীর ব্যবস্থা করতে হবে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান।
সূত্রে জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন বাজেটের আকার হতে পারে প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা। প্রয়োজনে তা বাড়তে বা কমতে পারে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া করোনার কারণে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
একনজরে বিগত অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ
২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। এটি ওই অর্থবছরের মোট বাজেটের ৪.৯২ শতাংশ।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা; যা মোট বাজেটের ৫.০৫ শতাংশ।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ১৪ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের ৫.৩৯ শতাংশ।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১৪ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা; যা মোট বাজেটের ৪.৬৮ শাতংশ।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৪ হাজার ৮১১ কোটি টাকা; যা ওই সময়ের মোট বাজেটের ৫.৬০ শতাংশ।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। এটি ওই অর্থবছরের মোট বাজেটে ৫.১০ শতাংশ।
-
১১ অগাস্ট, ২০২৫
-
০৬ জুন, ২০২৪
-
২১ জুন, ২০২৩
-
২২ মে, ২০২৩
-
০৬ জুন, ২০২১
বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞ ভাবনা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত নিজেদের বাজেট উপস্থাপন করা