অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল

অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল

অধ্যক্ষ, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ;
মহাসচিব, বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি। 


২০ মার্চ, ২০২১ ০৮:৪০ এএম

দাঁত-মুখের পরিচর্যায় মিলবে করোনা থেকে সুরক্ষা

দাঁত-মুখের পরিচর্যায় মিলবে করোনা থেকে সুরক্ষা
ছবি: সংগৃহীত

আজ ২০ মার্চ, ওয়ার্ল্ড ওরাল হেলথ ডে। ২০০৭ সালে দিবসটি ঘোষণা করেছে ডেন্টাল চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড ডেন্টাল ফেডারেশনের (এফডিআই)। এর পর ২০১৩ সালে বিশ্বব্যাপী দিবস উদযাপন শুরু হয়। দেশে ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। 

‘বি প্রাউড অব ইউর মাউথ’—এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এ বছর পালিত হচ্ছে দিবসটি। প্রতিবারের ন্যায় এবারও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল ডেন্টাল সার্জনদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি। 

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) অনুষ্ঠেয় এ আয়োজনে অংশ নিতে প্রস্তুত ছিলেন সারাদেশের প্রায় এক হাজার ২০০ ডেন্টাল চিকিৎসক। তবে সেখানে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীর সকল অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকায় অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে।

দিবস উদযাপন

দিবসটি দুইভাবে পালন হয়ে থাকে। একটি সতর্কতামূলক, অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী মুখ ও দাঁতের রোগ সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক-সচেতন করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ডেন্টাল প্রফেশনাল এবং নীতিনির্ধারকদের সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে মুখ ও দাঁতের সতর্কতামূলক সামগ্রিক কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া।

বাংলাদেশে দিবসটি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে পালন করা হয়। এ দিবসে দেশের সকল ডেন্টাল সার্জনদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা হয়, যা বিশ্বে নজিরবিহীন ঘটনা। একই রকম আয়োজন প্রায় দুইশ’ দেশের ১৪ লক্ষাধিক ডেন্টাল সার্জনরা করলেও বাংলাদেশে এটি উদযাপনের ভিন্নতা ও চমৎকারিত্বে অভিভূত এফডিআই। এরই ফলশ্রুতিতে ২০১৮ সালে ঢাকার কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এতে নেতৃত্ব দেন এফডিআই’র প্রেসিডেন্ট।

দাঁতের যত্নে অমনোযোগিতা 

দেশের মানুষ দাঁতের যত্নের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে অমনোযোগী ও উদাসী। করোনা মহামারীতে এটি আরও কমে গেছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাও দাঁতের ব্যথা নিয়ে আসেন। এ ব্যথা দুই ধরনের; একটি দাঁতের, আরেকটি মাড়ির ব্যথা। একজন রোগী ব্যথা নিয়ে আসা মানে উপসর্গগুলো একটি সংকট তৈরি করে ফেলেছে। অথচ উপসর্গগুলো অনুভূত হওয়ার সময় কিংবা তার আগেই এ সম্পর্কে সচেতন হলে ব্যথায় কষ্ট কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজন পড়তো না। কারণ প্রতিরোধ প্রতিষেধকের চেয়ে উত্তম। প্রতিরোধে মনোযোগ দিলে কিংবা দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে দাঁতের সুরক্ষা সম্ভব। 

দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্যবিধি

প্রাপ্ত বয়স্কদের দিনে দুইবার ব্রাশ করতে হবে। সকালে নাস্তা গ্রহণের পর এবং রাতে শোবার আগে। কোনো কারণে একবার করতে চাইলে অবশ্যই রাতে খাবার গ্রহণের পরে, শোবার আগে করতে হবে।

আরেকটি বিষয়, অনেক সময় ব্রাশেও সকল ময়লা পরিষ্কার হয় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো—দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থানে জমে থাকা খাদ্য কণা পরিষ্কার করার জন্য ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে। ফ্লস হলো এক ধরনের মেডিকেটেড সুতা। দুই দাঁতের মাঝখানে এমন কোনো ফাঁকা নেই, যেখানে এই সুতা প্রবেশ করবে না। সুতরাং এটি স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা, যা দাঁতের সুরক্ষায় অভাবনীয় ভূমিকা রাখে। 

মনে রাখতে হবে, নিয়মিত ব্রাশ এবং ফ্লস করার পরও ১০ ভাগ ময়লা, খাদ্য কণা মাড়ি ও দাঁতের সংযোগস্থলে থেকে যায়। সেজন্য মাউথওয়ার্শ করতে হবে। মাউথওয়াশ দিয়ে কুলকুচি করলে পুরো মুখাভ্যন্তর ওরাল ডিজিজমুক্ত হওয়ার সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। 

দাঁতের রোগ ও চিকিৎসা

দাঁতে যখন ব্যথা হয়, তখন বুঝতে হবে দন্তক্ষয় থেকে অগ্রসর হয়ে সংকটটি দাঁতের মজ্জায় গিয়ে ঠেকেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে রোডক্যানাল, ক্রাউন ও ব্রিজ করার প্রয়োজন পড়ে। দাঁতের এ রকম অসুস্থতায় চিকিৎসা করা না হলে টিউমার, এফসেস, সিস্ট হতে পারে। 

দাঁতের রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো মুখের ক্যান্সার। দক্ষিণ এশিয়ায় এর মারাত্মক প্রকোপ আছে। বাংলাদেশে এর তীব্রতা অনেক বেশি। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ পান, চুন, জর্দা, সুপারি, কৈনি—এগুলো নিয়মিত সেবন করেন। কেউ আবার গুল মুখের মধ্যে জমিয়ে রাখে, কখনো কখনো এ অবস্থায় ঘুমিয়ে যায়। কেউ আবার অ্যালকোহলিক, কেউ প্রচুর ধূমপান করে। এসব কারণে বাংলাদেশে মুখে ক্যান্সারের প্রবণতা বেড়ে গেছে। 

অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসায় মুখের ক্যান্সার

এছাড়াও কোয়াকের আধা ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার কারণেও মানুষ ব্যাপক হারে দাঁত ও মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ভয়ঙ্কর কথা হলো, বাংলাদেশে লক্ষাধিক কোয়াক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কম পয়সায় চিকিৎসার প্রত্যাশা, অসচেতনতা কিংবা অজ্ঞানতার জন্য তাদের কাছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এতে রোগীদের বড় একটি অংশ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। 

এর বিপরীতে ক্যান্সারের চিকিৎসা হচ্ছে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল ফ্যাকাল্টি, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে। এছাড়া কয়েকটি মেডিকেল কলেজের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেশিয়াল সার্জারি বিভাগসহ বেসরকারি কিছু কলেজ ও করপোরেট হাসপাতালে মুখের এ ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়, যা দেশের মানুষের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।

করোনায় মুখের স্বাস্থ্য 

বলার অপেক্ষা রাখে না, অন্য সময়ের চেয়ে করোনাকালে দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অনেক বেশি জরুরি। কারণ করোনাভাইরাস আমাদের ভেতরে প্রবেশ করছে চোখ-নাক-মুখ দিয়ে। এ ক্ষেত্রে ফোকাল পয়েন্ট হলো মুখ। ভাইরাসটি আমাদের মুখের ভেতরে গিয়ে গলায় দুই থেকে তিন দিন অবস্থান করে। এ সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে ব্রাশ, কুসুম গরম পানির কুলকুচি, ফ্লসিং এবং মাউথওয়াশ দিয়ে গার্গেলের মাধ্যমে মুখাভ্যন্তরে অবস্থান করা করোনাভাইরাসের আউটার লেয়ার লিপি স্তরটি ভেঙে যায়। সাধারণত এটি ফুসফুসে গেলে সংক্রমণের বিশেষ ঝুঁকি তৈরি হতো। কিন্তু মুখের স্বাস্থ্যবিধি মানার সুবাদে করোনার আউটার লেয়ারটি ফেটে যাওয়ার ফলে এটি পাকস্থলীতে চলে যায়। আর এতে ভাইরাসটি ধ্বংস হয়ে যায়। অর্থাৎ মুখের স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়মগুলো মানার মাধ্যমে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে করোনা পরিস্থিতিতে অনেক বেশি ফল দেবে। এর মাধ্যমে সংক্রমণ থেকে অনায়াসে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যাবে। অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের পরও মুখে ভাইরাস প্রবেশ করলে এসব পরিচর্যার মাধ্যমে সংক্রমণ থেকে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। 

ইংল্যান্ডের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাপত্রে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। ১৮৮৩ সালে দক্ষিণ ওয়েলসে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়টি পৃথিবীর বড় বড় স্কলারদের গবেষণার একটি জায়গা। করোনাকালে এই গবেষণাকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন টুলসের আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক