অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম
ফ্যাকো ও গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ
বাংলাদেশ আই হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট
১৩ মার্চ, ২০২১ ১১:০২ পিএম
শিশু ও নবজাতকরাও গ্লুকোমায় আক্রান্ত হতে পারে
গ্লুকোমা চোখের একটি রোগ, যা মানুষকে নীরবেই অন্ধ করে দেয়। চোখের মধ্যেও রক্ত সঞ্চালন হয়। সারাদেহে রক্তের চাপের মতো চোখেও চাপ তৈরি হয়। চোখের মধ্যে পানি তথা অ্যাকুয়াস হিউমার আছে। অ্যাকুয়াস হিউমার মানুষের চোখের পাশ থেকে তৈরি হয়। এর মধ্যে নিউট্রিশন থাকে। চোখের মধ্যে যে সকল স্থানে রক্তনালী নেই সেসব অংশে তারা পুষ্টি সরবরাহ করে। আবার তারা চোখ থেকে বেরিয়েও যায়।
অ্যাকুয়াস হিউমারের এ সার্কুলেশন কোনো কারণে ব্যাঘাত ঘটলে চোখের প্রেশার বেড়ে যায়। প্রতি চোখের ভেতর প্রায় ১২ লাখ নার্ভ থাকে, এ নার্ভগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নার্ভের ক্ষতি হলে আমাদের ভিজ্যুয়াল ফিল্ড কমে যায়। যখন ফিল্ড একদম নষ্ট হয়ে যায়, তখন মানুষ সম্পূর্ণভাবে অন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ চোখের প্রেশার বা চাপ বেড়ে গিয়ে নার্ভের ক্ষতির ফলে অন্ধত্ববরণ করাকে গ্লুকোমা বলে।
শনাক্তের উপায়
গ্লুকোমা নীরব অন্ধত্বের কারণ। গ্লুকোমা নানা রকম হয়। বেশিরভাগ গ্লুকোমা হলো প্রাইমারি ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা। এর কোনো কারণ জানা যায় না। কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে এ ধরনের রোগীদের বেশির ভাগ ৩৫ ঊর্ধ্ব।
৩৫ বছরের পর একজন চাইলে চিকিৎসকের কাছে টেস্ট করাতে পারেন। চিকিৎসক খুবই সাধারণ কিছু পরীক্ষার মধ্যমে নিশ্চিত হতে পারবেন তার গ্লুকোমা আছে কিনা। এছাড়াও কিছু কিছু গ্লুকোমার ক্ষেত্রে চোখে ব্যথা, চোখ লাল হয়ে যায়, চোখের দৃষ্টি কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। সেক্ষেত্রে রোগীরা নিজ উদ্যোগেই আমাদের কাছে আসেন। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে লক্ষণ থাকে না তাদেরও আসতে হবে। তারা যদি অন্য কোনো কারণে আসে তখন আমাদের দায়িত্ব তাদের গ্লুকোমা টেস্ট করা।
কারা আক্রান্ত হয়?
৩৫ বছরের নিচেও মানুষ গ্লুকোমাতে আক্রান্ত হতে পারে। নবজাতক শিশু জন্মগতভাবে গ্লুকোমায় আক্রান্ত হতে পারে। গ্লুকোমা বংশগত কারণে হতে পারে অথবা মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় মা হাম-রুবেলাসহ ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, তখনও বাচ্চার কিছু কিছু অঙ্গ তৈরি হয় না। চোখের অনেক অংশও তখনও গঠন বাকি থাকে, মায়ের ভাইরাসজনিত অসুস্থতার জন্য সে বাচ্চা চোখে ছানি ও গ্লুকোমা নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে।
বয়স এক বা দুই বছর বয়সে এক ধরনের গ্লুকোমা হয় আবার দশ থেকে ২০ বছর বয়সে আরেকটি গ্লুকোমা হতে পারে। এ ধরনের আরও বেশ কিছু গ্লুকোমা আছে তাবে এর হার খুবই কম। বেশিরভাগ সময় ৩৫ বছরের অধিক বয়সীরাই আক্রান্ত হন। এছাড়া এ বয়সে দ্বিতীয় পর্যায়ের গ্লুকোমা হতে পারে। যেমন: আঘাতজনিত, দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চোখে স্ট্রেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার ইত্যাদি কারণে। কখনও কখনও টিউমার, চোখের প্রদাহজনিত কারণেও গ্লুকোমা হতে পারে। এক্ষেত্রে বয়স বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যেকোনো বয়সী মানুষ দ্বিতীয় পর্যায়ের গ্লুকোমায় আক্রান্ত হতে পারে। চোখের ছানি সমস্যা গ্লুকোমার অন্যতম কারণ। চোখের ছানিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে অপরেশন করতে হবে, নয়তো তা গ্লুকোমার অন্যতম কারণ হয়ে উঠে। ছানি অপারেশনে অবহেলার কারণেও অনেকে গ্লুকোমায় আক্রান্ত হয়।
এছাড়া ডায়াবেটিস থেকেও গ্লুকোমা হতে পারে। ডায়াবেটিসের কারণে চোখে রক্তক্ষরণ হয়ে চোখের প্রেশার বেড়ে যেতে পারে। এ ধরনের গ্লুকোমার চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। আমাদের উচিত হবে ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত পরীক্ষা করানো এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। চোখে রক্তপাত হলে তার জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। এ ধরণের সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
কী ধরণের পরীক্ষা করানো হয়?
প্রথমত ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা। অর্থাৎ রোগীর চোখের প্রেশার মাপা হয়, বেশি বা কম থাকলে আমরা তার নার্ভের অবস্থাটা দেখি, তার অপটিক নার্ভটি কাপিং হয়েছে কিনা। যদি সন্দেহ হয় তাহলে গ্লুকোমা অ্যাঙ্গেল, ভিজ্যুয়াল ফিল্ড এনালাইসিস করি। ওসিটি নামে একটি সিটিস্ক্যান পরীক্ষা আছে, সেখানে চোখের লেয়ারগুলো দেখা যায়। গ্লুকোমা হলে লেয়ারগুলো পাতলা হয়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থাতেই গ্লুকোমা শনাক্ত করতে হলে এই পরীক্ষাগুলো করাতে হবে।
চোখের প্রেশার ও গ্লুকোমা
ব্লাড প্রেশার, যেমন: শরীরের নিউট্রিশন ছড়িয়ে দিচ্ছে, চোখের প্রেশারও সেই কাজ করে। চোখে রক্তনালী নেই, অ্যাকুয়াস হিউমারের সাহায্যে নিউট্রিশন চোখের প্রত্যেকটা কোষে পৌঁছায়, আবার চোখের কোণ দিয়ে বের হয়ে যায়। তাখনই প্রেশার ও সার্কুলেশনটি তৈরি হয়। এখানে স্বাভাবিক প্রেশার ১০ থেকে ২০ মারকিউরি। এই প্রেশার থাকলে চোখ ঠিক থাকে কিন্তু প্রেশার যদি কম বা বেশি হয় সেক্ষেত্রে নার্ভগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তখনই গ্লুকোমা রোগের উৎপত্তি হয়। চোখের প্রেশার গোল্ড মার্ক এপ্লাইনেশন টনোমেট্রি বা প্রিজমের মাধ্যমে টাচ করে প্রেসার মাপা। এছাড়াও আরও অনেক পদ্ধতি আছে, তবে এটি সবচেয়ে সঠিক ফলাফল দেয়।
চোখে কম দেখা মানেই গ্লুকোমা নয়। কম দেখার অনেকগুলো কারণ আছে। কেউ চুখে কম দেখলে তিনি চিকিৎসকের কাছে যাবেন। চিকিৎসক কম দেখার কারণ শনাক্ত করবেন। এটি ছানি, গ্লুকোমা, কর্নিয়া ও রেটিনার সমস্যাসহ নানা করণে হতে পারে।
ক্যাটারাইড ব্লাইন্ডনেস অন্ধত্বের প্রধান কারণ। তবে যথাসময়ে অপরেশন করলে তা শতভাগ ভালো হয়। আজকে যে রোগী সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে আমার কাছে এসেছেন, অপরেশনের পর তিনি সম্পূর্ণ ৬/৬ দেখতে পারছেন। কিন্তু গ্লুকোমায় কেউ যদি ৯০ ভাগ ড্যামেজ নিয়ে আসে তবে তার সেই অংশ কখনোই সুস্থ করা সম্ভব না। ক্যাটারাইড থেকে গ্লুকোমা মারাত্মক। যত দ্রুত সম্ভব এটি ডায়াগোনসিস করতে হবে এবং চিকিৎসা করতে হবে।
শেষ পর্যায়ে আসে অধিকাংশ রোগী
আমি খুবই দুঃখের সাথে বলবো আমাদের দেশে গ্লুকোমো রোগীরা আসে শেষ পর্যায়ে। যখন তাঁর চোখের নার্ভ ৯০ থেকে ৯৯ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। এ ধরনের রোগীদের চিকিৎসা করা কঠিন। কারণ তখন তাঁর চোখ প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এই রোগীটাই যদি আমার কাছে ২০ ভাগ ড্যামেজ নিয়ে আসতো তাহলে তাঁকে সুস্থ করা যেতো তিনি সারাজীবন ভালো দেখতে পারতেন।
কিন্তু আমরা বেশিরভাগ রোগী পাই অ্যাডভান্সড লেভেলের। এদের অপারেশন করাটা বিপজ্জনক। তাঁর হয়তো শতকার একভাগ দৃষ্টিশক্তি আছে। অপারেশন করলে হয়তো তাও চলে যেতে পারে। সেই রোগীই যদি অন্তত ২০ ভাগ নিয়েও আমার কাছে আসে তাহলেও অপারেশন করা যেতো। অপারেশনে তাঁর একভাগ ক্ষতি হলেও বাকি ১৯ ভাগ তো ঠিকঠাকই থাকতো। অনেকেই গ্লুকোমা রোগীকে অপারেশন করতে ভয় পান। তবে একজন ভালো গ্লুকোমা সার্জনের সাহায্যে অপারেশন করলে গ্লুকোমা রোগী সুস্থ হয়ে যেতে পারেন।
চিকিৎসা
চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক মানের। সিঙ্গাপুর, ভারতে যে চিকিৎসা ও অপারেশন হচ্ছে আমাদের দেশেও সেই একই চিকিৎসা হচ্ছে। আমি তাদের আশ্বস্থ করবো আপনারা দেশেই চিকিৎসা গ্রহণ করুণ। আমাদের দেশে উন্নত প্রযুক্তি, ওষুধ ও চিকিৎসক সব রয়েছে। যে ওষুধের দাম যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০ ডলার বা ১২/১৩ হাজার টাকা। বাংলাদেশে সে ওষুধের দাম মাত্র ৫০০ টাকা। অর্থাৎ শুধুমাত্র যদি সচেতনতা বাড়ানো যায় তাহলে বাংলাদেশের মানুষ গ্লুকোমায় আর অন্ধ হবেন না। আমাদের ঘাটতি সচেতনায়।
রোগীর করণীয়
প্রথমত রোগীদের বলবো আপনার রুটিন মাফিক ওষুধ খান। একবেলা খাবার খাওয়া ভুলে গেলেও ওষুধ খেতে ভুলবেন না। ডায়াবেটিস ও ব্লাড প্রেসারের মতো গ্লুকোমার ক্ষেত্রেও নিয়মিত ওষুধ সেবন ও চোখে ড্রপ দিলে পরিপূর্ণ সুস্থ থাকা সম্ভব। ড্রপে কাজ না করলে লেজার, তাতেও না হলে সার্জারি করে প্রেসার কমিয়ে গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এছাড়াও রোগীদের কিছু সামাজিক দায়িত্ব আছে। যেমন গ্লুকোমা একটি জিনগত রোগ। কোনো ব্যক্তির হলে তার ছেলে মেয়ের হতে পারে, তার ভাই-বোনের থাকতে পারে। তাঁর উচিত পরিবারের সদস্য এবং তাঁর সাথে রক্তের সম্পর্ক এমন সকলকে পরীক্ষা করানো। তাদের বন্ধু-বান্ধবদেরও পরীক্ষা করার বিষয়ে সচেতন করা উচিত। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শেয়ার করা উচিত। এবং তাঁদেরকে বুঝানো যে, আমরা গ্লুকোমা হয়েছিল, আমি চিকিৎসা নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছি।
সরকার ও সংগঠনগুলোর ভূমিকা
বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ চলছে। বিশ্ব গ্লুকোমা সমিতি এবং বিশ্ব গ্লুকোমা রোগী সমিতি যৌথভাবে এ সপ্তাহ পালন করছে। সংগঠনগুলো গ্লুকোমার বিষয়ে সকলকে সচেতন করতে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন: বাংলাদেশ আই হসপিটালসহ দেশের বিভিন্ন বিনামূল্যে ফ্রি গ্লুকোমা স্ক্রিনিং চলছে, পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য গ্লুকোমার বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো। মানুষ সচেতন হলেও কেবল গ্লুকোমা প্রিভেনশন করা সম্ভব।
সরকার এবং সংগঠনগুলো নানা ধরনের সচেতনতামূলক কাজ করেছে। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন সচেতনতামূলক সেমিনার ও সভা আয়োজন করে। সংগঠনগুলো চিকিৎসকদের সহযোগিতা করে আবার সংগঠনগুলোকেও চিকিৎসকরা সহযোগিতা করে। অর্থাৎ সবাই সম্মিলিতভাবেই আমরা কাজ করছি। আমরা বিদেশেও কাজ করি। আমি সাত মার্চ এশিয়া-স্পেসেফিক গ্লুকোমা সমিতির ডাইরেক্টর এবং পাবলিক রিলেশন চেয়ারম্যান হিসেবে এক ওয়েবিনারিতে সংগঠনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেছি। সেখানে প্রায় ৩০টি দেশের ৫৫ জন প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আমরা সবাই মিলে কাজ করছি এবং ইতিমধ্যে আমরা ভালো ফল দেখতে পাচ্ছি।