ডা. মো. তাহমিদুল ইসলাম

ডা. মো. তাহমিদুল ইসলাম

সহকারী কমিশনার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, খুলনা

(৩৭তম বিসিএস প্রশাসনে মেধা তালিকায় তৃতীয়)

সাবেক সহকারী সার্জন (৩৫তম বিসিএস )

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (২০০৮-০৯)


১০ অক্টোবর, ২০২০ ০৬:৩৯ এএম

এত আনন্দহীন জীবন নিয়ে আমরা কী করিব? 

এত আনন্দহীন জীবন নিয়ে আমরা কী করিব? 
প্রতীকী ছবি

আজকালের সমাজব্যবস্থায় আমরা সচরাচর যখন জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে বলে তৃপ্ত হই তখন খাওয়া-পরা, গাড়ি-বাড়ির দিকে নজর থাকে বেশি, নজর থাকে সন্তান ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বিসিএস ক্যাডার হচ্ছে কিনা। কিন্তু মানসিক তৃপ্তির উন্নয়ন-অবনমন নিয়ে ভাববার ফুরসত আমাদের থাকে না। 

আমরা জানি না পাশের বাড়িতে কে থাকে? প্রতিবেশীদের সাথে আমরা প্রয়োজন না থাকলে কথাও বলি না আজকাল।  অবসর দিনগুলোতে আমাদের বিকেল-সন্ধ্যা কাটে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টিভির দিকে তাকিয়ে। 

বেশিরভাগ মানুষই একা একা সময় কাটায়, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে।  পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসার জন্য মানুষ আগের চেয়ে বেশি বেশি নিজের বাড়িঘর ছেড়ে অন্য শহরে বসবাস করে। অন্য শহরে বসবাস করলে মানুষ থাকে ভাড়া বাসায় যেখানে প্রত্যেকটি ফ্ল্যাট নিঃসঙ্গ এক একটা গ্রহ।  আমাদের তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত প্রাইভেসি প্রিয়। 
আজকাল কাউকে বিয়ের কথা বললে, ক্যারিয়ারের কথা বললে, উপদেশ-পরামর্শ দিলে এমনকি খোঁজখবর নিলেও তারা বিরক্ত হয়।  এত প্রাইভেসি নিতে গিয়ে আমরা আর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিশি না, মিশলেও দুরত্ব বজাই রাখি, পাড়া-প্রতিবেশীদের তো চিনিই না। 

স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের আমরা রেসের ঘোড়া বানাতে চাই, ঘোড়ার প্রস্তুতি হিসেবে আছে প্রাইভেট-কোচিং।  এসব প্রাইভেট কোচিং থাকে স্কুলের পর বিকেল বেলায়।  যেসময় খেলার মাঠে দাপাদাপির কথা সেসময় তারা বই এ মুখ গুঁজে থাকে। 

কী অদ্ভুত! স্কুল কলেজে এত পড়ার আছেটা কী যার জন্য গান গাওয়া যাবে না, হইচই করা যাবে না, বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা যাবে না, এটা আমার মাথায় ঢোকে না। 

আমার মনে হয় প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দায়িত্ব বা চাপের চেয়ে বেশি চাপ নিতে হয় স্কুল-কলেজে পড়ার সময়।  রোবটের মত আমরা স্কুল-কলেজে ইঁদুর দৌড় দৌড়াবো, যৌবনে চাকরি-ব্যবসার নামে আমরা অফিস আর নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে বন্দী জীবন কাটাবো তাহলে আমরা আনন্দটা করবো কখন? 

এত আনন্দহীন জীবন নিয়ে আমরা কী করিব? আমাদের আগের সেই একান্নবর্তী পরিবার আর নাই, এখন আছে নিউক্লিয়ার পরিবার। নিউক্লিয়ার পরিবারে প্রাইভেসির প্রাচুর্যের অভাগ নাই, কিন্তু নাই কথা বলার মানুষ। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন বিহীন জীবন যাপনের এক অদ্ভুত ট্রেন্ড্রে আমরা সমাজে নামে মাত্র একসাথে আছি ঠিকই কিন্তু সবাই নিঃসঙ্গ-একাকী। 

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদের পাড়ায় খেলার মাঠ ছিলো, আমরা বিকেল হলেই খেলতে নামতাম, নদীতে সাঁতার কাটতাম, কারেন্ট গেলে সব বাড়ির ছেলেরা খেলতে বের হয়ে পড়তাম, আমাদের মায়েরা দলবদ্ধ হয়ে আড্ডা দিতেন। 

আর এখন মফস্বল, এমনকি গ্রামেও আমরা নিজেদের গুঁটিয়ে রাখি নিজের বাড়ির বদ্ধ পরিবেশে, আমাদের সেই খেলার মাঠে এখন বড় বড় বহুতল ভবন! আমাদের সার্বজনীন উৎসবগুলোতেও কাজ, পড়াশোনা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের বাহানায় আমরা থাকি অনাগ্রহী। 

অদ্ভুত আনন্দবিহীন একটা সমাজ ব্যবস্থা আমরা তৈরি করছি দিনে দিনে, মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার কোনো ব্যবস্থা আমার চোখে পড়ে না।  আনন্দবিহীন জীবন তৈরি করে বিকৃত মানুষ, তৈরি করে অপরাধপ্রবণ মানুষ। 

আমার মনে হয় আমাদের সমাজে এত অপরাধ, এত অন্যায়, এত বিবেকহীনতা এসবের পেছনে একটু হলেও দায়ী আমাদের ক্রমাগত রোবোটিক জীবনযাপন।  যেভাবে আমাদের জীবন আগাচ্ছে তাতে আমরা আরও বেশি যান্ত্রিক হয়ে যাবো, মানসিক স্বাস্থ্য বিকল্য আরও বাড়বে।  তাই এখনই একটু ভাবা দরকার। 

জীবনে যদি একটু আনন্দ না থাকে, একটু হাসি না থাকে, একটু স্বস্তি না থাকে তাহলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বিসিএস ক্যাডার হয়ে, দশ তলা বাড়ি বানিয়ে, দামি দামি গাড়ি কিনে কি খুব বেশী লাভ আছে? 

নিজের এবং পরিবারের ভালো থাকার জন্য আর্থিকভাবে ভালো থাকার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু বস্তুগত সমৃদ্ধির পাশাপাশি একটু মানসিকভাবে ভালো থাকার বিষয়টা ভাবাও জরুরি নয় কী?

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস।  এবারের প্রতিপাদ্য 'সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য'।

  ঘটনা প্রবাহ : মানসিক স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্য প্রশাসনে অন্য ক্যাডার

কর্মসূচিতে যাওয়ার হুমকি পেশাজীবী চিকিৎসক নেতাদের

জামাই-শ্বশুর মিলে ভুয়া চিকিৎসা

তৃতীয় শ্রেণি পাস করেই ‘বিশেষজ্ঞ’ চিকিৎসক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত