চিকিৎসকদের ‘কটূক্তি’ ও ‘হামলা’র প্রতিবাদে যৌথ মানববন্ধন
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসকদের ওপরে ‘হামলা’, ‘কটূক্তি’ ও স্বাস্থ্যখাতের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রের’ প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন বিভিন্ন সংগঠনের চিকিৎসকরা।
আজ বুধবার (১০ জুন) শাহবাগে দুপুর ২টায় অবসটেট্রিক্যাল এন্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি), সর্বস্তরের চিকিৎসকবৃন্দ, বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটি, বাংলাদেশ সোসাইটি অব রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিংসহ বিভিন্ন সংগঠনের চিকিৎসকেরা মানববন্ধনে অংশ নেন।
মানববন্ধনে অংশ নেন বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয় সম্পাদক ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম, বিএমইউর প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম, বিএমইউর ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম সেলিম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ডিএমসি) শিক্ষক সমিতির সদস্য সচিব সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহমেদ সামী আল হাসান ইমন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা বলেন, ‘আজকের এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় হাসপাতালের দায়িত্ব পালন শেষে আমরা রাস্তায় নামার কি কারণ? আমাদের হৃদয় আজ মর্মাহত। কারণ মানবসেবাই আমাদের ধর্ম। বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা চিকিৎসা পেশায় আসেন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য। আমরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাইনি, বরং দেশের মানুষের পাশে থেকে দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। জনগণের কল্যাণে নিজেদের জীবন, সময় ও শ্রম উৎসর্গ করছি।’
এমন অবস্থায় সাংবাদিক মাসুদ কামালের করা অবমাননাকর মন্তব্য ও অবমাননা শুধু একজন চিকিৎসককে নয়, সমগ্র চিকিৎসক সমাজকে অপমান করার শামিল। আমরা মনে করি, এই বক্তব্যের জন্য তাঁর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ দেশের মানুষ আমাদের ওপর আস্থাশীল। তারা চিকিৎসার জন্য পাশের দেশে যাচ্ছে না। এখানে চিকিৎসা নিয়ে তারা ভালো আছেন। চিকিৎসাসেবার মান উন্নত হওয়ায় অনেক মানুষ এখন দেশের মধ্যেই চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট। এই আস্থা ও সম্মান ক্ষুণ্ণ করার যেকোনো অপচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র আমরা দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করবো।’
রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে আমাদের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক সমাজের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউর) প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের চিকিৎসকরা দেশের মানুষের জীবন রক্ষায় অগণিত ত্যাগ স্বীকার করছেন। বিগত সময়ে, করোনার সময় দেশের চিকিৎসকরা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তার মাধ্যমে আমাদের মৃত্যুর হার বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্নে রাখা সম্ভব হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, সাংবাদিক মাসুদ কামালের কুরুচিপূর্ণ ও অবমাননাকর মন্তব্য সমগ্র চিকিৎসক সমাজের প্রতি আঘাত। আমরা মনে করি, এর জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা মেধাবী ও সৎ মন্তব্য করে বিএমইউর প্রো-ভিসি বলেন, ‘এ ধরনের মানহানি আমাদের পেশার মর্যাদাকে নষ্ট করতে পারে এবং আমরা কাউকে সহযোগিতা দিয়ে বিতর্কের দিকে যেতে চাই না। সাংবাদিক ভাই-বোনদের আমরা আমাদের পাশে পাই এবং আশা করি, পেশার মর্যাদা রক্ষায় তারা যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।’
সরকার এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আহ্বান, ‘চিকিৎসক সমাজের সম্মান রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। দেশের মানুষ যেন নির্ভয়ে আমাদের ওপর আস্থা রাখতে পারে, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
মানববন্ধনে বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয় সম্পাদক ও বিএমইউর ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সকল পেশায়ই বিভিন্ন ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। সেসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আছে, পার্সোনালি তাদের সাথে কথা বলতে পারেন, কিন্তু সম্মিলিতভাবে একটি সোসাইটিকে হেয়পতিপন্ন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের কাজের সাথে যারা দীর্ঘদিন যাবৎ জড়িত আছেন, তাদের উদ্দেশ্যে কি আমাদের খুজে বের করতে হবে। স্বাস্থ্যখাত নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ কি-না, সেটি যদি আপনারা দেখে থাকেন, তাহলে বুঝতে পারবেন কেন এই ধরনের কাজ করা হচ্ছে।’
রফিকুল ইসলাম পার্শ্ববর্তী একটি দেশের কথা তুলে ধরে বলেন, ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের দেশের ৭০ শতাংশ উপার্জন হতো আমাদের দেশের রোগীদের চিকিৎসার করানোর মাধ্যমে। কিন্তু ২০২৪ সালের পর তাদের এই ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির ব্যাপারে চেষ্টা করছে ও পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেগুলোর ব্যাপারে আপনারা নজর রাখবেন।
শরীয়তপুরের চিকিৎসক ডা. নাসিরের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ডাক্তারদের ওপরে যে বা যারা হামলা করছেন, এই ডাক্তাররাই কিন্তু এক সময় আপনাদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। করোনাকালীন সময় বলেন আর আজকে হাম পরিস্থিতিই বলেন। আপনাদের পাশে কিন্তু ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয়—স্বাস্থ্যসেবার সাথে সকলেই এগিয়ে আসছেন। তাই তাদের সঙ্গে বৈরিভাবাপন্ন হয়ে বেশিকিছু অর্জন করতে পারবেন না।
‘তবে কোনো ডাক্তারের মাধ্যমে অবহেলার শিকার হয়ে থাকলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) গিয়ে অভিযোগ দিয়ে দেখেন, তারা ব্যবস্থা নেয় কি-না। দেশের আইন ও আইনি প্রক্রিয়া আছে, সমস্যা থাকলে পার্সোনালি আক্রমণ না করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়’—বলেন তিনি।
মানববন্ধনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর সহযোগী অধ্যাপক ডা. লোহানী মো. তাজুল ইসলাম, সোসাইটি অব রেডিওলজির সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা মিয়া ওয়াহিদুজ্জামান, সোসাইটি অব মেডিসিনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. জাকারিয়া আল আজিজ, গাইনি ও প্রসূতি সোসাইটির (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম, ওজিএসবির সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা, ডিএমসির কাডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান নোমান, ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. তৌহিদুর রহমান আওয়াল, তরুণ চিকিৎসক প্রতিনিধি ডা. মমি আনসারী প্রমুখ।
এমআই/এমইউ/