২৮ জুন, ২০২০ ০২:০২ পিএম

চাকরি স্থায়ীকরণসহ পাঁচ দফা দাবিতে বারডেমে চিকিৎসকদের কর্মবিরতি

চাকরি স্থায়ীকরণসহ পাঁচ দফা দাবিতে বারডেমে চিকিৎসকদের কর্মবিরতি

মেডিভয়েস রিপোর্ট: করোনা চিকিৎসায় পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান, আক্রান্ত হলে চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যায়ভার বহন, আর্থিক প্রণোদনা ও চাকরি স্থায়ীকরণসহ ৫ দফা দাবিতে চিকিৎসক কর্মবিরতিসহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে কর্মরত আরএমও, এমও (অস্থায়ী), সহকারি রেজিস্ট্রারসহ একদল চিকিৎসক।

রোববার (২৮ জুন) সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ২টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালন করা হয়। দাবি আদায় না পর্যন্ত প্রতিদিন একই সময়ে এ আন্দোলন চলবে বলেও জানিয়েছেন তারা। এর আগে সকালে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. এমকেআই কাইয়ূম চৌধুরীর কাছে ৫ দফা দাবি সম্বলিত প্রস্তাবনা তুলে দেয়া হয়।

তাদের ৫ দফা প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- অস্থায়ীভাবে নিয়োগকৃত চিকিৎসকদের চাকরি স্থায়ীকরণ, করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ, করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে কেউ আক্রান্ত হলে সেই চিকিৎসক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বারডেমে চিকিৎসার সুযোগ, রোগীদের করোনা পরীক্ষার জন্য বারডেমে ল্যাব চালু এবং করণায় আক্রান্ত হয়ে কোন চিকিৎসকের মৃত্যু হলে ১০ লাখ টাকা প্রণোদনার দাবি জানানো হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালটিতে ১৭৯ জন চিকিৎসক রয়েছেন। এর মধ্যে অস্থায়ী চিকিৎসক রয়েছে ১০৭ জন। বাকি ৭২ জন সিনিয়র ও স্থায়ী চিকিৎসক। করোনাকালীন সময়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে ও অসুস্থতার কথা বলে অনেক স্থায়ী চিকিৎসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এই সংকটের সময়ও দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন অস্থায়ী চিকিৎসকরা। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালটিতে কাজ করলেও তারা পাচ্ছেন না তাদের প্রাপ্যটুকু।

আন্দোলনরত চিকিৎসকরা জানান, করোনাভাইরাসের এই ক্রান্তিলগ্নে হাসপাতালে পিপিই এবং অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রীর অপ্রতুলতা স্বত্বেও আমরা এই মহামারীতে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও নিষ্ঠার সাথে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের এই সময়ে উপসর্গবিহীণ রোগীদের সেবাদানকালে আমাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে চিকিৎসা দিতে গিয়ে কিছু সংখ্যক আরএমও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অথচ বারডেম কর্তৃপক্ষ তাদের চিকিৎসার কোন উদ্যোগ নেননি। উপরন্তু তাদের হাসপাতালে করোনা পরীক্ষাসহ চিকিৎসার কোন সুযোগ দেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, আরএমওবৃন্দের সাথে কোনরূপ আলোচনা না করেই তাদের বেতন, ঈদ বোনাস কর্তন করা হয়েছে এবং বৈশাখী ভাতা দেয়া হয়নি।

নামপ্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক বলেন, গত তিন মাস ধরে আমাদের বেতনের একটি বড় অংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেটে রাখছে। আমরা বেতন পাই ত্রিশ হাজার টাকা। এর মধ্যে কারো দশ হাজার টাকা, কারো কাছে আট হাজার টাকা করে কেটে রাখছে। ঈদের বোনাস দিয়েছে অর্ধেক। বৈশাখী বোনাস দেয়নি। তাছাড়া আমাদের নিজেদের পিপিই কিনে পরতে হয়। হাসপাতাল থেকে আমরা কোনো ধরনের সহযোগিতা পাই না। এসব দাবি-দাওয়া নিয়ে গত ২০শে জুন আমরা একটি স্মারকলিপি দিয়েছি ডিরেক্টর স্যারের বরাবর। আগামী ২৭ তারিখ পর্যন্ত আমরা তাদের সময় দিয়েছি। দেখি কী করে? আমাদের তো বাঁচতে হবে।

ওই স্মারকলিপি থেকে জানা যায়, মহামারির সময় দিনে দিনে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এমন অবস্থায় হাসপাতালটিতে করোনা আক্রান্ত, ডায়াবেটিকস ও নানা জটিল রোগী আসার কারণে করোনা সংক্রমণ হাসপাতালেও বাড়তে থাকে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায়, দায়িত্বহীনতার কারণে, হাসপাতালে পিসিআর মেশিন থাকা সত্ত্বেও তারা করোনা টেস্ট চালু করেননি। ফলে হাসপাতালে আসা রোগী এবং চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। এদিকে কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের জন্য আলাদা প্রটোকল না থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রমে তীব্র বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। অথচ হাসপাতালে আসা রোগীদের করোনা টেস্ট করতে বাইরের ল্যাবের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর সেই রিপোর্ট আসতে সময় লাগে দুই থেকে তিনদিন। ফলে অনেক চিকিৎসক রোগীদের সংস্পর্শে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছেন করোনা আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীরা বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কারণে রোগীদের  সেবায় আন্তর্জাতিক ভাবে যে রোস্টার পদ্ধতি করা হয়েছে হাসপাতাল তা মানছে না। ফলে চিকিৎসকরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু হাসপাতালটিতে চিকিৎসকরা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত হলেও তাদের চিকিৎসা দিচ্ছে না নিজেদের কর্মক্ষেত্র বারডেম হাসপাতাল। ফলে চিকিৎসকদের মাঝে এক ধরনের ক্ষোভ কাজ করছে।

তাদের অভিযোগ সারা বিশ্বে যখন চিকিৎসকদের চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছেন, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন ঠিক তখনই উল্টো পথে হাঁটছেন বারডেম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান, তাদের পদগুলো স্থায়ী করার জন্য। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো আশ্বাস দেয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক চিকিৎসক বলেন, আমরা বিগত তিন মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করেছি। প্রথমে মৌখিক পরে লিখিতভাবে দাবি জানিয়েছি। অথচ মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্টরা আমাদের এই দাবি-দাওয়াকে অবহেলা করেছে। এখন যে সময় দিয়েছি এই সময়ের মধ্যে আমাদের দাবি-দাওয়া না মানলে অন্যপথ অবলম্বন করতে হবে। আমরাও তো মানুষ। আমাদের পরিবার আছে। এভাবে তো চলতে পারে না। অর্থ সংকট আর নিশ্চয়তা না থাকলে মনোযোগ দিয়ে কাজ করা যায় না। দিন শেষে পরিবারের কাছে যেতে হয়। অথচ পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে তাদের চিকিৎসা পর্যন্ত দিতে রাজি না বারডেম কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. এম কে আই কাইয়ূম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত