১৭ জুন, ২০২০ ১২:৩৯ পিএম

ভর্তি ফি কমানোর দাবি ডিপ্লোমা কোর্সে চান্সপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের 

ভর্তি ফি কমানোর দাবি ডিপ্লোমা কোর্সে চান্সপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের 

মো. মনির উদ্দিন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজ ও ইনস্টিটিউটসমূহে এমফিল, এমপিএইচ, এমমেড এবং ডিপ্লোমা জুলাই ২০২০ সেশনে বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাজপত্র চেয়ে নোটিস প্রকাশ করেছে বিএসএমএমইউ। ২০ জুন পর্যন্ত এসব কাগজ-পত্র যাচাই-বাছাই হবে। এর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কোর্স ফি পরিশোধ করার মাধ্যমে চিকিৎসকরা ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন। 

দুই বছরের ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করতে চিকিৎসকদের প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা গুণতে হয়। কোথাও কোথাও ভর্তি ফি নির্ধারণ করা আছে চার লাখ টাকা। সবেমাত্র গ্রাজুয়েট হওয়া চিকিৎসকদের পক্ষে বিশাল এ খরচ বহন করা সাধ্যাতীত। এফসিপিএস-রেসিডেন্টের মতো এ কোর্সে ভাতার ব্যবস্থা না থাকা এবং কোর্স চলাকীন চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিস নিষিদ্ধ থাকায় করোনার এই সংকটময় মুহূর্তে বিরাট অংকের ভর্তি ফি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন তরুণ চিকিৎসকরা। 

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) চান্স পাওয়া এক চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এখানে ভর্তি ফি নির্ধারণ করা আছে ৫২ হাজার টাকা, যা এককালীন পরিশোধ করতে হবে। এটি করতে গিয়ে অনিবার্যভাবেই আমাকে ঋণের মুখোমখি হতে হবে। কারণ পরিবার থেকে এখন কোনো সাপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া করোনার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ।’

ডিপ্লোমাতে এফসিপিএস ও রেসিডেন্সি কোর্সের মতো ভাতা চালুর দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই এখন গ্রাজুয়েট। ফলে পরিবারের খরচে আর পড়াশোনার সুযোগ নাই। এখানে যদি মাসিক কোনো বেতন দেওয়া না হয়, ঢাকায় ব্যয়সাপেক্ষ জীবন চালানো কঠিন। কোর্সের শর্তে বলা হয়েছে, কেউ কোথাও প্রাইভেট প্রাকটিস করতে পারবেন না। কোথাও কাজে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে বিএসএমএমইউর ব্যবস্থামূলক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। এ অবস্থায় বাড়ি থেকে টাকা এনে কিভাবে ব্যক্তিগত খরচে মেটাবো! ব্যক্তিগত খরচ মিটানোর জন্য কোথাও ছোটাছুটি করলে স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনা বিঘ্নিত হবে। এতে যোগ্যতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরিতে সরকারের উদ্দেশ্য হবে ব্যাহত।’ 

তরুণ এ চিকিৎসক বলেন, ‘আমাদের কোর্সটা দুই বছরের। এই কোর্স সম্পন্ন করেই বর্তমানে অনেক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক অধ্যাপনায় যুক্ত আছেন। এক সময় এই কোর্স সম্পন্ন করে কেউ এফসিপিএস-এমডি-এমএস করতে গেলে পূর্ণ সময়টা গণ্য হতো। কিন্তু এটি এখন জটিল করা হয়েছে। এখন এফসিপিএস করতে গেলে ডিপ্লোমার এক বছর গণ্য হয়, আর অন্য কোর্সে তা হচ্ছেই না। আমাদের দাবি, অন্য কোনো কোর্স করতে গেলে যেন এই দুই বছর গণ্য করা হয়।’   

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বারডেম হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে চান্স পাওয়া আরেক চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘করোনার এই দুর্বিসহ দিনে কোনো রকম চাকরি ছাড়াই দিন কাটাচ্ছি। এই সময়ে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য ৫০-৬০ হাজার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের মাথায় বিশাল একটি ঋণের বোঝা চাপবে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। এটি সব সময় অমানবিক। আর করোনার সময় তরুণ চিকিৎসকদের জন্য কষ্টদায়ক। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আন্তরিক বিবেচনার দাবি রাখে।’ 

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডিপ্লোমা পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল করোনাভাইরাস মহামারীর আগে। এই সময়ে আমি কিছু করতে পারবো না। এর সঙ্গে সিন্ডিকেট, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলসহ বিভিন্ন বিষয় যুক্ত। আমার একার প্রশাসনিক কোনো আদেশে এ বিষয়ে কিছু করা সম্ভব না। সিন্ডিকেটে কোনো বিষয় অনুমোদন পেয়ে গেলে এ ব্যাপারে উপাচার্যের একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয় না। মূলত সিন্ডিকেট অনুমোদন দেয় আর উপাচার্য এটি বাস্তবায়ন করেন।’ 

চিকিৎসকদের সংকট বিবেচনায় আপনারা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক প্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য এ মুহূর্তে তো সিন্ডিকেট মিটিংই ডাকা যাচ্ছে না। কিভাবে পদক্ষেপ নেবো?’ 

রেসিডেন্সি কোর্সের মতো ডিপ্লোমা কোর্সেও ভাতা চালুর বিষয়ে তরুণ চিকিৎসকদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের কোনো দাবি-দাওয়া থাকলে আমার কাছে লিখিত আকারে উপস্থাপন করুক, এগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারবো।’ 

সব প্রতিষ্ঠানে অভিন্ন ভর্তি ফি নির্ধারণের দাবি পেশাজীবী সংগঠনের

তরুণ চিকিৎসকদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে চিকিৎসকদের অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টর ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাস মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মূলত করোনা পরিস্থিতি বলে কোনো কথা না, ডিপ্লোমায় ভর্তিতে এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরেক প্রতিষ্ঠানের টাকার এতো পার্থক্য থাকবে কেন? এটা কেন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না? বিএর এ কোর্সসএমএমইউর অধীনে ভর্তি চলছে। তারা কেন সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অংক নির্ধারণ করে দিচ্ছে না?’ 

তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট কথা হচ্ছে এটা ফি কমাতে হবে। সেই সঙ্গে সকল প্রতিষ্ঠানে একই ভর্তি ফি নির্ধারণ করে দিতে হবে।’ 

ডিপ্লোমা কোর্সে ভাতার বিষয়ে বিডিএফের প্রধান সমন্বয়ক বলেন, ‘ভাতার বিষয়ে তাদের দাবিটা খুবই যৌক্তিক। রেসিডেন্সি কোর্সে চান্সপ্রাপ্তরা যদি ভাতা পান, তাহলে ডিপ্লোমা চিকিৎসকরা কেন পাবেন না। তারা প্রাক্টিস করতে পারবে না, ভাতাও পাবে না; একই অঙ্গে দুই রূপ কেন থাকবে? এ সময়ে কাজ করতে গিয়ে তারা তো ঝুঁকি ভাতাও পাবে না। ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ কাজ করে নন-কোভিড হাসপাতালে, যেখানে চিকিৎসকদের আক্রান্তের হার বেশি। কোভিডে অনেক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। সুতরাং তারা সব দিক থেকেই সংকটে পড়ছে।’ 

এ ব্যাপারে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটির (এফডিএসআর) মহাসচিব ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘কমানো হলে চিকিৎসকরা উপকৃত হতো। এটা তো নির্ধারিত। এখন কর্তৃপক্ষ এটা বিবেচনা করবে কিনা! ভর্তির টাকা এক সঙ্গে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ইনস্টলমেন্টের ব্যবস্থা করলেও তরুণ চিকিৎসকরা উপকৃত হবেন। এ দাবিটা করা যেতে পারে। ফি কমানোর জন্য তারা আবেদন করতে পারেন, এটা সম্পূর্ণভাবে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের (শিক্ষা) উপর নির্ভর করে। আবেদন করা হলে এফডিএসআর তা মঞ্জুরের জন্য কথা বলবে। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলেই পারবেন, এটা একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপার।’

ভাতা চালুর বিষয়ে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের দাবির বিষয়ে এফডিএসআর’র ভাবনা কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রেসিডেন্টরা তাদের ভাতার বিষয়ে সব সময় সোচ্চার ছিল। তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে লেখালেখি করেছে, আমরাও তাদের দাবি আদায়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছি। ডিপ্লোমা চিকিৎসকরা যদি তাদের অধিকারের বিষয়ে কথা বলে, তাহলে আমরা একইভাবে তাদের পাশেও দাঁড়াবো।’  

প্রসঙ্গত, গত ৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজ ও ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে এমফিল, এমএড, ডিপ্লোমা ও এমপিএইচ কোর্সে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। গত ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত ভর্তি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে এসব কোর্সের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা।

করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম গুলো মেনে চলুন। সর্দি কাশি জ্বর হলে হাসপাতালে না গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা দানকারী হটলাইন গুলোতে ফোন করুন। আইইডিসিআর হটলাইন- 10655, email: [email protected]