২০ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:০৮ পিএম

বিশ্বজুড়ে এল নিনোর প্রভাব: বাড়ছে খরা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি

বিশ্বজুড়ে এল নিনোর প্রভাব: বাড়ছে খরা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খরা, দাবানল, প্রবালপ্রাচীরের ক্ষয় ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনার প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

এতে পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনো কী? 

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।

কোথাও খরা ও পানির সংকট দেখা দিতে পারে, আবার কোথাও বাড়তে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও।

যেভাবে সৃষ্টি হয় এল নিনো

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে বাণিজ্য বায়ু পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। এতে উষ্ণ সমুদ্রের পানি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে সরে যায় এবং পূর্বাঞ্চলে তুলনামূলক শীতল পানি গভীর সমুদ্র থেকে ওপরে উঠে আসে।

তবে এল নিনোর সময় এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ পানির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়। এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে।

হুমকির মুখে প্রবালপ্রাচীর ও বনভূমি

জাতিসংঘের প্রকৃতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান ডেভিড ওবুরা এএফপিকে বলেছেন, চলতি বছরের এল নিনো বিশ্বের প্রবালপ্রাচীরগুলোর জন্য ‘অতিরিক্ত ঝুঁকির এক ভয়াবহ মাত্রা’ তৈরি করছে। প্রবাল তাপমাত্রার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে প্রবাল বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে।

নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবালের স্বাস্থ্যবিষয়ক এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক জরিপের পর থেকে প্রবালপ্রাচীর গঠনকারী প্রজাতিগুলোর অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে।

এদিকে, গত বছর বিশ্বজুড়ে বন উজাড়ের হার কমলেও মধ্য আফ্রিকার প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে এ অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খরায় বিপর্যস্ত গবাদিপশু, বাড়ছে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা

এল নিনো-প্রভাবিত খরা মধ্য আমেরিকার মেক্সিকো থেকে পানামা পর্যন্ত বিস্তৃত শুষ্ক অঞ্চলজুড়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। এল সালভাদরের সেনসুনতেপেকের একটি গবাদিপশুর বাজারে অনাহারে কঙ্কালসার হয়ে পড়া গরুর দেখা পেয়েছে এএফপি।

৫৪ বছর বয়সী খামারি আন্তোনিও আগুইলার একটি গরুর দুরবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, ঘাসের অভাবে প্রাণীটি শুকিয়ে কঙ্কালসার হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এল নিনোর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে খরাকে তীব্র করতে পারে। পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো অঞ্চলে চরম বৃষ্টিপাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

জনস্বাস্থ্য ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি

জাতিসংঘের উন্নয়নবিষয়ক প্রধান আলেকজান্ডার ডি ক্রু এএফপিকে বলেছেন, এল নিনোর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও উচ্চ সুদের হার যুক্ত হয়ে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ধারাবাহিক সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর।

খরা ও চরম আবহাওয়ার কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিরাপদ পানির সংকট ও জীবিকার অনিশ্চয়তা মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে পারে। অঞ্চলভেদে এসব প্রভাবের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারেও শঙ্কা

শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে, এল নিনো কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত এবং আগামী বছরের শুরুর দিকে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে।

চরম আবহাওয়ার এমন পরিবর্তন কৃষি, খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর চলমান এল নিনোকে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার মতে, পর্যবেক্ষণ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়াবিদেরা এখনো একে রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করেননি।

মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী এমিলি বেকার এএফপিকে বলেন, পরিমাপের পদ্ধতি যা-ই হোক, বর্তমান এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর অবস্থান নিশ্চিতভাবে বোঝা যাবে ঘটনাটি শেষ হওয়ার পর।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ) প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব-মধ্যাঞ্চলের তাপমাত্রা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রের অন্যান্য অংশের তুলনায় কতটা বেশি বা কম, তা পর্যবেক্ষণ করে। তাপমাত্রার এই পার্থক্য বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরিসংখ্যানে এল নিনো

এএফপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এল সালভাদরে আগস্ট মাসের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এনওএএর তথ্যভান্ডারে ১৯৮২ সালের এল নিনো সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে। সংস্থাটির ধারণা, চলমান ঘটনাটি সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সর্বশেষ বৈশ্বিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রবালপ্রাচীর গঠনকারী প্রজাতির ৪৪ শতাংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক প্রবাল বিবর্ণতার ঘটনা এবং চলতি বছরের এল নিনো এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আগাম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব

এল নিনো এবং এর বিপরীত অবস্থা লা নিনা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে। লা নিনার সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে। এ দুই অবস্থাই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে এল নিনো নির্দিষ্ট কোনো আবহাওয়াগত ঘটনা ঘটার নিশ্চয়তা দেয় না; বরং কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব

এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং কিছু অঞ্চলে খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সেচের পানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং খাদ্যনিরাপত্তায় চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক ও অন্যান্য তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবে এল নিনোর প্রভাব সব বছর বা দেশের সব অঞ্চলে একরকম হয় না; এটি মৌসুমি বায়ু ও অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতির ওপরও নির্ভরশীল।

সূত্র: এএফপি

এইউ/ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও
একদিনেই অবস্থান বদল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও