মো. আল আমিন ভূঁইয়া
মো. আল আমিন ভূঁইয়া
নিবন্ধিত নার্স (বিএনএমসি)
হেলথ সার্ভিস অফিসার
রিদম বাংলাদেশ ট্রাস্ট
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:৫৬ পিএম
ভুয়া নার্স নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ চাই
প্রতি বছর দেশে ডিপ্লোমা ও বিএসসি ইন নার্সিংয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হন। শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও লাইসেন্সিং পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে তাঁদের অনেকে নিবন্ধিত নার্স হিসেবে পেশাজীবনে প্রবেশ করেন। কিন্তু পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের পরও তাঁদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় কর্মসংস্থান। সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত নিয়োগের সুযোগ না থাকায় অনেক নিবন্ধিত নার্সকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চাকরির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। অথচ অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নার্স হিসেবে বৈধ নিবন্ধন না থাকা ব্যক্তিরাও নার্সিংয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
কর্মসংস্থানের সংকটে নিবন্ধিত নার্সরা
প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর এত শিক্ষার্থী নার্সিং শিক্ষা সম্পন্ন করে নিবন্ধিত হওয়ার পর তাঁদের কর্মক্ষেত্র কোথায়? তাঁদের ভবিষ্যৎই বা কী? নার্সিং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের পরও যদি একজন নিবন্ধিত নার্স কর্মসংস্থান না পান, অথচ অনিবন্ধিত ব্যক্তিরা নার্সিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে পুরুষ নার্সদের জন্য বেসরকারি খাতে চাকরির পরিস্থিতি আরও কঠিন বলে মনে হয়। একজন নবীন নার্সকে চাকরির আশায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে সিভি জমা দিতে হয়। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও অনেকে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান পান না।
অন্যদিকে, রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে মেট্রন পদসহ নার্সিংয়ের বিভিন্ন দায়িত্বে অনিবন্ধিত ব্যক্তি কিংবা পেশাগত যোগ্যতা ও নিবন্ধনের বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের কাজ করার অভিযোগও রয়েছে।
যোগ্যতার মূল্যায়ন কোথায়?
একজন শিক্ষার্থী তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কিংবা চার বছর মেয়াদি বেসিক বিএসসি ইন নার্সিং সম্পন্ন করেন। এরপর ইন্টার্নশিপ ও লাইসেন্সিং পরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে নিবন্ধিত নার্স হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা অর্জন করেন। অথচ কর্মক্ষেত্রে গিয়ে তাঁকে যদি এমন কারও অধীনে কাজ করতে হয়, যাঁর নার্স হিসেবে বৈধ নিবন্ধন নেই, তাহলে তা হতাশাজনক।
আরও উদ্বেগের বিষয়, যোগ্যতা ও নিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও অনেক নার্সকে তাঁদের প্রত্যাশার তুলনায় কম বেতনে কাজ করতে হয়।
এখানে প্রশ্ন ওঠে, একজন নিবন্ধিত নার্সের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে কি না। নার্সিং কেবল একটি চাকরি নয়; এটি রোগীর সেবা, চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি পেশা। ফলে যথাযথ যোগ্যতা ও নিবন্ধন ছাড়া কাউকে নার্সের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হলে তা শুধু পেশাগত মানের জন্য নয়, রোগীর নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
‘ভুয়া নার্স’ নিয়ে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব
এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা, অবহেলা কিংবা অনিয়মের ঘটনা ঘটলে সংবাদে অনেক সময় ‘ডাক্তার-নার্সের ভুল’ হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে নিবন্ধিত নার্স কি না, তাঁর বৈধ নিবন্ধন রয়েছে কি না, কিংবা তিনি নার্সিংয়ের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছেন কি না—এসব বিষয়ও অনুসন্ধানের আওতায় আসা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির অনিয়মের দায় যেন যাচাই ছাড়াই পুরো নার্সিং পেশার ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
নিবন্ধন যাচাইয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন
অনিবন্ধিত ব্যক্তিদের দিয়ে নার্সিংয়ের দায়িত্ব পালন করানো বন্ধে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। এ জন্য রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নার্সিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত সনদ ও বৈধ নিবন্ধন যাচাইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। যাঁরা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও নিবন্ধন ছাড়াই নার্সের দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের বিষয়ে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ন্যূনতম বেতন কাঠামোর দাবি
একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কর্মরত নিবন্ধিত নার্সদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ন্যূনতম বেতন কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা দরকার। এতে নার্সদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে। নার্সিং শিক্ষায় বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে নিবন্ধিত নার্সদের যথাযথ মূল্যায়ন অপরিহার্য।
‘আমরা করুণা চাই না’
একজন নবীন নিবন্ধিত নার্স হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর কাছে আমার আকুল আবেদন—দেশের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নার্সিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিবন্ধন যাচাইয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিন। অনিবন্ধিত ব্যক্তিদের দিয়ে নিবন্ধিত নার্সের দায়িত্ব পালন বন্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করুন। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে কর্মরত নিবন্ধিত নার্সদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
আমরা করুণা চাই না; আমরা চাই আমাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন ও পেশাগত দায়িত্বের যথাযথ মূল্যায়ন। একজন নিবন্ধিত নার্স যখন চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরবেন, আর একই সময়ে কোনো অনিবন্ধিত ব্যক্তি নার্সের দায়িত্ব পালন করবেন—এই বৈপরীত্যের অবসান হওয়া প্রয়োজন।
এমআর/