০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫১ পিএম

সরবরাহ নেই রেডিওআয়োডিন ওষুধের, ধুঁকছে থাইরয়েড ক্যান্সার রোগীরা

সরবরাহ নেই রেডিওআয়োডিন ওষুধের, ধুঁকছে থাইরয়েড ক্যান্সার রোগীরা
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: গত এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ রেডিও আয়োডিন ওষুধের সরবরাহ। সরকারি নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রগুলোতে ওষুধ না থাকায় রেডিওঅ্যাবলেশন থেরাপির পর রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধটি দেওয়া যাচ্ছে না। বেসরকারিভাবেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত এসব রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও দুই মাস লাগতে পারে। ক্যান্সার রোগীদের জন্য এভাবে মাসের পর মাস অপেক্ষা উদ্বেগের বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি ওষুধের সরবরাহ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, থাইরয়েড ক্যান্সার রোগীদের রেডিওঅ্যাবলেশন থেরাপি দেওয়া হয়। এই থেরাপির জন্য যে ওষুধ প্রয়োজন, সেটি গত এক মাস ধরে বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ওষুধ না থাকার তথ্য সঠিক নয় দাবি করেছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস)। তারা বলেছে, ক্যাপসুল না থাকলেও ওষুধের লিকুইড ফর্ম রয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আয়োডিন থেরাপি প্রদান করা হয়। সরকার টেন্ডারের মাধ্যমে একটি কোম্পানিকে এই ওষুধ আমদানির দায়িত্ব দেয়। পরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও ওই কোম্পানির কাছ থেকেই ওষুধ সংগ্রহ করে রোগীদের সরবরাহ করে।

দীর্ঘদিন ধরে ওষুধটি দেশে না থাকায় অনেক রোগী প্রয়োজনীয় রেডিওঅ্যাবলেশন থেরাপি নিতে পারছেন না। এ অবস্থায় অসহায়ত্ব প্রকাশ করার পাশাপাশি এ থেকে দ্রুত উত্তরণের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে এফসিপিএস পার্ট-২ (অর্থোপেডিক্স)-এর প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসক টি. এম. আবু জাফর মেডিভয়েসকে বলেন, সম্প্রতি তার বাবার থাইরয়েড ক্যান্সার ধরা পড়েছে। অস্ত্রোপচার হয়েছে, এখন তার রেডিওঅ্যাবলেশন থেরাপি নেওয়া দরকার। কিন্তু তারা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও ওষুধটি পাচ্ছেন না। তাদের যেটুকু জানানো হয়েছে, তা হলো—বর্তমানে দেশে ওষুধটির সরবরাহ নেই। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি ওষুধ।

সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সরকার একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে এটি সরবরাহ করে। টেন্ডার না হওয়ায় এটি বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে পরিচালিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস)-এ দীর্ঘদিন ধরে রেডিওআইয়োডিনের সরবরাহ নেই।

সূত্রে জানা গেছে, থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের অস্ত্রোপচারের পর রেডিওআয়োডিনকে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বেসরকারিভাবেও এটি পাওয়া যায় না। কারণ এটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ হওয়ায় সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের জন্য বিশেষ অবকাঠামো প্রয়োজন। এ কারণে মূলত সরকারিভাবেই এটি সরবরাহ করা হয়।

চিকিৎসকরা জানান, রেডিওআয়োডিন ক্যাপসুল খাওয়ানোর আগে রোগীর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি এই চিকিৎসার উপযোগী কি-না এবং কত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে—তা নির্ধারণ করা হয়। এরপর রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তাকে বিশেষ তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়।

জানা গেছে, দেশে পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের ২২টি শাখা রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন এসব সেন্টারে থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে সব মেডিকেল কলেজে এই চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।

ব্যয়বহুল এই চিকিৎসায় একটি সাইকেলে (থেরাপি) প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। এর আওতায় রোগীকে প্রায় পাঁচ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ পুরো প্রক্রিয়াটি একটি প্যাকেজের মতো সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসা নিতে যাদের সামর্থ্য নেই, তাদেরকে সরকারিভাবে এটি সরবরাহ করা হয়।

চিকিৎসরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কয়েক হাজার। অনেক রোগী বা তাঁদের স্বজন এই সংকট সম্পর্কে জানেন না কিংবা কীভাবে এর সমাধান চাইতে হবে, তা বুঝতে পারেন না।

এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার ওষুধ দীর্ঘদিন সরবরাহ না থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ডা. জাফর বলেন, এই সংকটের বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের নজরে আসা এবং সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

‘এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নিলে সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে’—বলেন তিনি। 

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুই মাসেও রেডিওআইওডিন সরবরাহের সম্ভাবনা কম। ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে দুই মাস অপেক্ষা করা গুরুতর বিষয়। অনেক রোগী বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে চিকিৎসাধীন থাকেন; তাঁদের জন্য প্রতিটি সময় গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণ দ্রুত চিহ্নিত করে রেডিওআয়োডিন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজধানীর একটি পরমাণু কেন্দ্রে কর্মরত এক চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, এটা বাইরে থেকে আনতে হয়। তারপর এটা করতে হয়। সম্ভবত বাইরে থেকে আনার প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা হয়েছে, এজন্য আনতে পারছে না।

এই ওষুধের ওপর অনেক রোগী নির্ভরশীল এই কথা জানিয়ে তিনি বলেন, থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগীদের এই থেরাপিতে রেডিওআয়োডিনের ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। এটি থেকে রেডিয়েশন বের হয়, তাই বিশেষ ব্যবস্থায় রোগীকে ওষুধটি দিতে হয়। রেডিওআইয়োডিনের হাফ-লাইফ আট দিন। এ কারণে চিকিৎসার পর রোগীকে আলাদাভাবে থাকতে হয়।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা শহরেই যদি হিসাব করা হয়, একটি কেন্দ্রে সপ্তাহে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী এই থেরাপি নেন। সে হিসাবে মাসে ২০০ বা তারও বেশি রোগী চিকিৎসার আওতায় আসেন। ফলে সারাদেশে হাজারো রোগী এই সরবরাহ সংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন।

লিকুইড ফরম্যাটের ওষুধ থাকার দাবি নিনমাস পরিচালকের

জানতে চাইলে নিনমাস’র পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘কে বলেছে ওষুধ নেই? আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। ক্যাপসুল ফর্মটি এক-দুই সপ্তাহ পাওয়া যাবে না, তবে লিকুইড ফর্ম আছে। একই ওষুধ। রোগীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরেন। কোনো সমস্যা নেই, আমার কাছে পাঠান, আমরা ব্যবস্থা করে দেবো।’

লিকুইড ফর্মটি কি এতদিনও ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, ছিল। কোনো সমস্যা নেই।’

একাধিক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেছেন যে, কয়েক মাস ধরে ওষুধটি বাজারে নেই। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলো সঠিক তথ্য নয়। মানুষের কথায় কান দেবেন না। এগুলো মিসইনফরমেশন।’

নিনমাসের তথ্যে রোগীর স্বজনদের বিস্ময়

ডা. জাফর বলেন, ‘আমি দুইটা জায়গায় সরাসরি গেলাম। তারা আমাকে জানালেন সরবরাহ নেই। তাহলে ব্যাপারটা কেমন হলো? এতে তো আমি এখন বোকা হয়ে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপকের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, ডিরেক্টরের সঙ্গে কথা বলেছি। বিএমইউতে স্যারকে পাইনি। তারা শুধু পরীক্ষা করতে চেয়েছেন। সেখানে যে চিকিৎসক ছিলেন, তিনিও জানালেন সরবরাহ নেই। টেন্ডার হয়নি, দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। ক্যাপসুল নেই, লিকুইড ফরম্যাটটা আছে—এমন কোনো কথাই তো তারা বলেননি।’

এদিকে লিকুইড ফরম্যাটে ওষুধ থাকার কথা শোনার পর হেসে দিলেন নিনমাস আওতাধীন রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠানের একজন চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘পরিচালক স্যার যদি ওষুধ থাকার কথা বলেন, তাহলে তিনি দিতে পারছেন না কেন?’

সরবরাহ মাঝে মাঝেই বন্ধ হয়

জানা গেছে, নানাবিধ কারণে এভাবে মাঝে মাঝেই এই ওষুধ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আর এতে ভোগান্তিতে পড়েন জীবনের একেবারে দুর্বিষহ সময়ে থাকা ক্যান্সার রোগীরা।

গত বছরের মার্চের দিকে থাইরয়েড ক্যান্সার চিকিৎসার এই অত্যাবশ্যকীয় উপাদান সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে আক্রান্ত রোগীদের সার্জারির পর ছয় মাস ধরে অপেক্ষা করতে হয়। ফিরিয়ে দেয়া হয় সার্জারি করা রোগীদের। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে সংকটাপন্ন রোগীদের রেডিও আয়োডিন লিকুইডের মাধ্যমে কোনোভাবে চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের দিকে সরবরাহ শুরু হয়।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক