০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৪৯ পিএম
মেডিভয়েস নিউজ রুম অনুষ্ঠানে পেশাজীবী নেতাদের মত

চিকিৎসকের নিরাপত্তায় নিহিত কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা

চিকিৎসকের নিরাপত্তায় নিহিত কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা
অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল ও অধ্যাপক ডা. শাদরুল আলম। (ছবিতে বাম দিক থেকে)।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: চিকিৎসকের ওপর হামলা শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, সরাসরি এর প্রভাব পড়ে রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার ও পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর। কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা, রোগী-চিকিৎসকের পারস্পরিক আস্থার সংকট, ‘ভুল চিকিৎসা’ নিয়ে ভুল ধারণা ক্রমেই দেশের স্বাস্থ্যখাতকে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি করছে।

চিকিৎসক নেতাদের মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে চিকিৎসকরা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগী নিতে নিরুৎসাহিত হবেন, বাড়বে অপ্রয়োজনীয় রেফারেল। এতে বড় বিপর্যয় দেখা দেবে চিকিৎসাসেবায়। তাই চিকিৎসকের নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই চিকিৎসকদের একক দাবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ চিকিৎসকদের নিরাপত্তার মধ্যে রোগীদের চিকিৎসা নিহিত।

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনের কারণ ও উত্তরণের উপায় নিয়ে মেডিভয়েসের  সঙ্গে কথা বলেছেন স্বাস্থ্যখাতের তিনজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তাদের মতে, চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে এবং দিনশেষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ রোগীরা।

চিকিৎসকের নিরাপত্তা মানেই রোগীর নিরাপত্তা

বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বাস্থ্যখাতের জন্য চরম উদ্বেগজনক আখ্যায়িত করে ন্যাশনাল হেলথ এলায়েন্সের (এনএইচএ) আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. শাদরুল আলম বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের ওপর অব্যাহত হামলা এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তার অভাব চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর কারণে বিভিন্ন জায়গায় পরিকল্পিত সহিংসতা হচ্ছে এবং চিকিৎসা সেবার মান হ্রাস পাচ্ছে।

এই সমস্যার মূলে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে আস্থার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করে তিনি বলেন, গণমাধ্যমে সমস্যাগুলো উঠে আসলেও পরবর্তীতে এর তেমন কোনো বিচার হচ্ছে না।

এই সংকট উত্তরণে একটি কার্যকর ‘সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন খুব জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা মানেই রোগীর নিরাপত্তা—এটি জনসাধারণকে বুঝতে হবে। কর্মপরিবেশের অবনতির কারণে তরুণ চিকিৎসকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তারা এখন চিকিৎসা পেশা ছেড়ে অন্য ক্যাডারে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও চলে যাচ্ছেন। এখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবকাঠামোগত দুর্বলতাও প্রকাশ পায়।

বিষয়টিকে একটি গভীর ‘অশনি সংকেত' বলে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, এটি শুধু চিকিৎসকের ওপর হামলা নয়; এর ধারাবাহিকতা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা, চিকিৎসকদের পেশাগত মনোবল এবং স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের সক্ষমতা—এই তিনটি জায়গাতেই আঘাত করে।

'ভুল চিকিৎসা' নাকি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

‘ভুল চিকিৎসা’ পরিভাষাটি নিয়ে তার ঘোর আপত্তি জানান ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল। তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল চিকিৎসা দেন না। চিকিৎসায় অবহেলা, সময়মতো চিকিৎসা না দেওয়া বা পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় সিদ্ধান্তহীনতাকে প্রায়শই ‘ভুল চিকিৎসা’ বলা হয়।

‘ইনজেকশন’ বা ‘স্যালাইন’ দিয়ে রোগী মেরে ফেলার মতো প্রচলিত অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, এগুলো চিকিৎসা শাস্ত্রের স্বীকৃত পন্থা। চিকিৎসায় প্রকৃত অবহেলা বা সার্জিক্যাল কোনো ত্রুটি হয়েছে কিনা, তা নিরূপণ করার ক্ষমতা রোগীর আত্মীয়-স্বজনের নেই। এর জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং আদালত রয়েছে।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে ‘চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংস’ করার পরিকল্পিত চক্রান্ত আখ্যায়িত করে ডা. শাকিল বলেন, ‘এই আস্থাহীনতা তৈরি করা হচ্ছে যাতে রোগীরা বিদেশে বা শুধু প্রাইভেট হাসপাতালে চলে যায় এবং ঢাকার ওপর চাপ বাড়ে, যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের নেই।’

করোনা, ডেঙ্গু মহামারি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চিকিৎসকদের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং বিদ্যমান জনবল ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। স্কয়ার বা পিজির মতো বড় হাসপাতাল থেকে শুরু করে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সেও যদি চিকিৎসকদের মারা হয়, তবে তারা আর মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেবেন না। প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়েই রোগীকে ঢাকায় রেফার করে দেবেন, এতে বিনা চিকিৎসায় পথিমধ্যেই রোগীর মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়বে।

অবহেলা ও সীমাবদ্ধতার পার্থক্য এবং সমাধানের রূপরেখা

ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) লিগ্যাল অ্যাফেয়ার সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান চিকিৎসার ফলাফল এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক তার জীবনে লক্ষাধিক রোগীর জীবন বাঁচালেও একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর কারণে তাকে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। একজন রোগী যখন খারাপ অবস্থায় আসেন, তখন চিকিৎসক সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার পরও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু ফলাফল মৃত্যু হলেই চিকিৎসকের ভালো সার্ভিসের কথা আর আসে না।

তিনি চিকিৎসায় ভুল এবং অবহেলার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, জ্ঞানের স্বল্পতা বা লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে ভুল হতে পারে, কিন্তু রোগী কাতরাচ্ছে আর চিকিৎসক ক্যারম খেলছেন—সেটা হলো অবহেলা। এই দুটো বিষয়কে আলাদা করতে হবে।

এই সংকট সমাধানে তিনি সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাব দেন

ইকুইটি বেইজড ট্রায়াজ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুযায়ী জরুরি বিভাগে রোগীদের অবস্থার গুরুত্ব বুঝে রেড, ইয়েলো এবং গ্রিন ট্যাগিং করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া। এতে মুমূর্ষু রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা পাবেন এবং চিকিৎসকদের ওপর দোষারোপ আসবে না।

ভিজ্যুয়াল ডিসপ্লে: ব্যাংকের মতো ডিজিটাল সিরিয়াল ব্যবস্থা চালু করা, যাতে বাইরে অপেক্ষমাণ রোগীরা বুঝতে পারেন চিকিৎসক ভেতরে অন্য রোগী দেখছেন এবং অলস বসে নেই।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার: শুধু পুলিশ নয়, বরং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী, অ্যালার্মিং সিস্টেম এবং কঠোর ভিজিটর কন্ট্রোল (অতিরিক্ত দর্শনার্থী প্রবেশে কড়াকড়ি) নিশ্চিত করা।

রাস্তায় খুনের ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আইনে কি আছে যে কোনো অপরাধের দায়ে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে খুন করা যায়? না, তাকে আইনে সোপর্দ করা হয়। একইভাবে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিএমডিসি বা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে হবে। এরকম অব্যাহতভাবে হামলা চলতে থাকলে চিকিৎসকরা ডিফেন্সিভ হয়ে যাবেন এবং জটিল রোগী দেখা থেকে বিরত থাকবেন।

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঢালাওভাবে ‘চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু’ শিরোনাম না করে মূল কারণ (যেমন- ডেঙ্গুতে মৃত্যু), স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকের সর্বোচ্চ চেষ্টার কথা এবং কর্তৃপক্ষের তদন্তের আশ্বাস—এই বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরলে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ অনেকটাই কমে আসবে।’

জেএইচ/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত