জুলাইয়ে মস্তিষ্কে গুলিবিদ্ধদের দেখে নিউরোসার্জন হওয়ার স্বপ্ন রাফির
অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) চলছে জরুরি অস্ত্রোপচার। অ্যাকিউট সাবডুরাল হেমাটোমায় আক্রান্ত রোগীর জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত চিকিৎসক দল। সেই দলের সঙ্গে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কাজ করছেন তরুণ মেডিকেল শিক্ষার্থী রাকিবুল হোসাইন রাফি। প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম এগিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন ধাপে সহায়তা, জাপানের টোকিওর কেইও ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে চার সপ্তাহের অবজারভারশিপের এই সুযোগ তাঁর জন্য হয়ে ওঠে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
তবে জাপানের সেই অপারেশন থিয়েটারে পৌঁছানোর গল্পটি শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, বাংলাদেশের রাজপথে আহত মানুষের চিকিৎসার দৃশ্য থেকে। তখন রাফি উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
জুলাইয়ের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক আহত মানুষ চিকিৎসার জন্য আসছিলেন। উত্তরার পাশাপাশি টঙ্গী ও গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকেও রোগীদের ঢল নামে হাসপাতালে। জরুরি বিভাগের ভেতরে জায়গা না থাকায় হাসপাতালের ফটক ও আশপাশের সড়কেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছিল। মাথা ও মেরুদণ্ডের গুরুতর আঘাত, গুলিবিদ্ধ রোগী এবং নানা ধরনের জটিল ট্রমার চিকিৎসা খুব কাছ থেকে দেখেন রাফি। সেসব অভিজ্ঞতাই তাঁর মনে নিউরোসার্জারি নিয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি করে।
এর আগে প্রথম বর্ষে শারীরবিদ্যা পড়ার সময় থেকেই মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল তাঁর। কিন্তু জুলাইয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা সেই আগ্রহকে পেশাগত স্বপ্নে রূপ দিতে শুরু করে। এই পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আমির হামজা। তাঁর কাছ থেকে রাফি সিটি স্ক্যান ও এমআরআই দেখার পাশাপাশি রোগীর অবস্থা বিশ্লেষণ এবং নিউরোসার্জারির বিভিন্ন বিষয় হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পান।
রাফি জানান, জরুরি অস্ত্রোপচার হলে অনেক সময় রাতেও তাঁকে ডেকে নেওয়া হতো। চিকিৎসক ও জনবলের সীমাবদ্ধতার কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মাথার খুলি থেকে হাড়ের একটি অংশ অপসারণ করে মস্তিষ্কের নিচে প্রবেশ করানোর (ক্র্যানিওটমি বা ক্র্যানিয়েকটমি) মতো অস্ত্রোপচারেও সহায়তার সুযোগ পান তিনি। এরপরই নিউরোসার্জারিকে নিজের ভবিষ্যৎ পেশা হিসেবে দেখার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।
মেডিভয়েসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রাফি তাঁর জাপানযাত্রা, নিউরোসার্জারি নিয়ে আগ্রহ, সেখানে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর সেই অভিজ্ঞতার গল্পই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ রাব্বী।
বিদেশে যাওয়ার সুযোগ যেভাবে
রাফি বলেন, 'নিউরোসার্জারি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ শেখার সুযোগ কীভাবে পাওয়া যায়, তা শুরুতে জানা ছিল না। জাপানে যাওয়ার আগে থাইল্যান্ড ও স্পেনে দুটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমার সামনে নতুন দরজা খুলে দেয়।'
থাইল্যান্ডে একটি এশিয়া-প্যাসিফিক আঞ্চলিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান রাফি। সেখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হয়। পরে সেই যোগাযোগই তাঁকে স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত একটি সার্জিক্যাল সম্মেলন ও কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সুযোগ এনে দেয়। এই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মধ্যেই তিনি জানতে পারেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল শিক্ষার্থীদের জন্য অবজারভারশিপের সুযোগ দিয়ে থাকে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিনা খরচেও এ ধরনের সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশি মেডিকেল কলেজগুলোর সঙ্গে জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন সমঝোতা না থাকায় রাফিকে নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়।
চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষার প্রায় ছয়-সাত মাস আগে থেকেই শুরু করেন খোঁজ। ইউটিউব, গুগল এবং বিভিন্ন অনলাইন উৎস ঘেঁটে জাপান ও সিঙ্গাপুরের হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর সরাসরি সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ই-মেইল পাঠাতে থাকেন। একসময় কয়েকটি জাপানি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিবাচক সাড়া আসে। থাইল্যান্ডের সম্মেলন, স্পেনের কর্মশালা এবং ইউনেস্কোর একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনবৃত্তান্তকে আরও শক্তিশালী করে।
রাফির ভাষায়, সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন,'অনেক মেধাবী মেডিকেল শিক্ষার্থী আছেন, যারা কীভাবে পেশাদার ই-মেইল লিখতে হয়, কীভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় বা কোথা থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, এসব জানেন না। অনেকে আবার দ্বিধায় থাকেন। কিন্তু চেষ্টা করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।'
চূড়ান্ত পরীক্ষা, ভিসা ও জাপানের পথে
সুযোগ পাওয়ার পরও পথটি সহজ ছিল না। বাংলাদেশের চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষার সময়ই চলছিল জাপানে যাওয়ার প্রস্তুতি। ওএসপিই পরীক্ষা শেষ করে সরাসরি দূতাবাসে ছুটতে হয়েছিল তাঁকে। প্রথমবার জাপানের ভিসা পেলেও মেয়াদ ছিল মাত্র ১৫ দিন। ফলে আবার আবেদন করতে হয়। ই-মেইলে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, সুপারিশপত্র, টিকা সনদসহ বিভিন্ন নথি প্রস্তুত সবকিছুই চলেছে পরীক্ষার ব্যস্ততার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই-তিন মাসের প্রক্রিয়া শেষে হাতে আসে আমন্ত্রণপত্র এবং ভিসা। অবজারভারশিপের এক মাসের খরচের মধ্যে থাকা ও খাবারের ব্যয় তাঁকেই বহন করতে হয়েছে। জাপানে থাকা এক চাচা থাকার ব্যবস্থা করে সহায়তা করেন।
জাপানে প্রথম দিন
কেইও ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে পৌঁছে রাফি শুধু অস্ত্রোপচার দেখার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। নিজের দেশ, বাংলাদেশের চিকিৎসাশিক্ষা ব্যবস্থা এবং জাপানে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে একটি পরিচিতি পর্ব আয়োজন করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন একজন ইথিওপিয়ান নিউরোসার্জারি ফেলোও। বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে একটি নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। ভাষাগত বাধা অবশ্য ছিল। ক্লিনিক্যাল আলোচনার বড় অংশই জাপানি ভাষায় হওয়ায় শুরুতে বুঝতে সমস্যা হতো। তবে শিক্ষক, আবাসিক চিকিৎসক ও সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং অনুবাদ প্রযুক্তির সাহায্যে ধীরে ধীরে বিষয়গুলো বুঝে নিতে শুরু করেন রাফি। এর মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, জাপানের চিকিৎসাব্যবস্থার শক্তির একটি বড় জায়গা হলো পরিকল্পনা, দলগত সিদ্ধান্ত এবং রোগীর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার সমন্বয়।
একটি ভুল ও শিক্ষকের অসাধারণ শিক্ষা
রাফি জানান, 'জাপানে থাকার সময় নিয়মিত রোগীর কেস উপস্থাপন করতে হয়েছে। জাপানের রোগীদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যের বড় অংশই কম্পিউটারভিত্তিক নথিতে সংরক্ষিত থাকে। জন্মতথ্য, পূর্বের অস্ত্রোপচার, ওষুধ, পুরোনো রোগের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান সমস্যার বিস্তারিত তথ্য সবকিছু পর্যালোচনা করেই একটি কেস উপস্থাপন করতে হয়।'
একটি অ্যানিউরিজমের কেস উপস্থাপনের সময় রাফি একটি জায়গায় ভুল করে এক্সট্রাডিউরালকে ইন্ট্রাডিউরাল বলে ফেলেন। ভুলটি ধরিয়ে দেন একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক। কিন্তু ভুলের জন্য তাঁকে বিব্রত করা হয়নি। বরং ওই চিকিৎসক তাঁকে বোঝান তিনি একজন শিক্ষার্থী, সবকিছু জানা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় শেখার জন্যই তিনি সেখানে এসেছেন। এই ঘটনাটি রাফির কাছে জাপানের চিকিৎসাশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। সেখানে শেখার পরিবেশে ভুলকে অপমানের কারণ না বানিয়ে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়।
অবজারভার থেকে অস্ত্রোপচার সহায়তায়
জাপানে যাওয়ার প্রথম সপ্তাহ থেকেই রাফি নিয়মিত প্রশ্ন করতেন। হোয়াটসঅ্যাপে চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, বাড়িতে ফিরে রোগীর কেস পড়তেন এবং পরদিন অস্ত্রোপচারের আগে কেন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে, বিকল্প কী হতে পারে যা জানতে চাইতেন।
একদিন জরুরি ভিত্তিতে অ্যাকিউট সাবডুরাল হেমাটোমার অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন হয়। চিকিৎসক ও আবাসিক চিকিৎসকের সংখ্যা কম থাকায় রাফি অনুমতি নিয়ে অস্ত্রোপচারে সহায়তা করার সুযোগ পান। অস্ত্রোপচারের আগে মাথার চামড়ায় জীবাণুনাশক প্রয়োগ, চুল কাটা, স্থানীয় অবশ করার ওষুধ প্রয়োগসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিতে অংশ নেন। অস্ত্রোপচারের সময় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এগিয়ে দেওয়া, স্যালাইনের প্রবাহ ঠিক রাখা এবং বিভিন্ন ধাপে চিকিৎসকদের সহায়তা করেন। এমনকি ক্র্যানিওটমির পর হাড় পুনঃস্থাপনের জন্য সূক্ষ্ম ড্রিলিংয়ের কাজেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। অস্ত্রোপচারের শেষ পর্যায়ে ক্ষতস্থান সেলাইয়ের কাজেও অংশ নেন তিনি। এগুলো হয়তো ছোট ছোট দায়িত্ব। কিন্তু রাফির কাছে এগুলো ছিল হাতে-কলমে শেখার বিরল সুযোগ।
জটিল রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি পর্যবেক্ষণ
চার সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের জটিল নিউরোসার্জারি কাছ থেকে দেখেন তিনি। ব্রেন টিউমারের পাশাপাশি ময়াময়া রোগ, ভেস্টিবুলার শোয়ানোমা, ট্রাইজেমিনাল শোয়ানোমা, পেট্রোক্লাইভাল মেনিনজিওমা, ডান কনভেক্সিটি মেনিনজিওমাসহ বিভিন্ন জটিল কেস তাঁর বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে। এ ছাড়া ভেগাস নার্ভ স্টিমুলেশন এবং স্পাইনাল লিপোমার মতো চিকিৎসাপদ্ধতিও পর্যবেক্ষণ করেন। তবে শুধু অস্ত্রোপচার দেখাই তাঁর শেখার বিষয় ছিল না। অস্ত্রোপচারের আগে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে।
অস্ত্রোপচারের এক সপ্তাহ আগের পরিকল্পনা
রাফির সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি ছিল অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা। একটি জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে কাটা কোথায় হবে, কোন পথে প্রবেশ করা হবে, কোথায় কীভাবে কাজ করতে হবে এসব বিষয় আগে থেকেই বিস্তারিতভাবে পরিকল্পনা করা হয়। সপ্তাহে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। সোমবার কেন্দ্রীয় বৈঠক, মঙ্গলবার ও শুক্রবার অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে রোগীর কেস নিয়ে আলোচনা হতো। অধ্যাপক, আবাসিক চিকিৎসক ও অন্যান্য চিকিৎসক একসঙ্গে বসে মতামত দিতেন।
রাফি বলেন, 'আমি শিখেছি, নিউরোসার্জারি মূলত নিখুঁততা ও পরিকল্পনার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। যত ভালোভাবে পরিকল্পনা করা যাবে, অস্ত্রোপচারের ফলাফলও তত ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।'
আরেকটি বিষয় তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে, অধ্যাপকরা শুধু নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন না। আবাসিক চিকিৎসকদের মতামতও শুনতেন। কখনো কখনো তাঁরাও নতুন কিছু শিখতেন সহকর্মীদের কাছ থেকে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে রাফি দুটি বিষয় নিজের ভবিষ্যৎ পেশাজীবনে ধরে রাখতে চান—দুই পক্ষের কাছ থেকে শেখার মানসিকতা এবং পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছাড়া অস্ত্রোপচারে না যাওয়ার নীতি।
জাপানের চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে শিক্ষা
জাপানের চিকিৎসাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও কাছ থেকে দেখেছেন রাফি। দেশটির নাগরিক, বাসিন্দা ও অভিবাসীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো রয়েছে, যার মাধ্যমে চিকিৎসার অনেক ব্যয় বহন করা হয়। তিনি এমন একটি রোগীর উদাহরণ দেন, যার একটি ওষুধের দাম প্রায় এক কোটি জাপানি ইয়েন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ ইয়েন স্বাস্থ্যবিমার আওতায় ছিল। বাকি অর্থ রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী কীভাবে বহন করা হবে, তা নিয়েও চিকিৎসক আলোচনা করেছেন।
রাফির মতে, বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে শুধু জাপানের সঙ্গে তুলনা করে 'পিছিয়ে' বলা ঠিক হবে না। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, স্বাস্থ্যবিমা এবং সরকারি বিনিয়োগের কাঠামো জাপানকে আধুনিক প্রযুক্তি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও গবেষণায় বড় সুযোগ দিয়েছে।
রাফিকে বিভাগীয় পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি ওই বিভাগে কেস উপস্থাপন ও অস্ত্রোপচারে সহায়তা করা প্রথম বাংলাদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থী। চার সপ্তাহে চারটি কেস উপস্থাপন, অস্ত্রোপচারে সহায়তা এবং ক্যাডাভার কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তাঁর অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। রাফির কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান নয়, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে পারা।
'বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে পারাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় গর্বের মুহূর্ত'— বলেন রাকিবুল হাসান রাফি ।
শুধু বিদেশে যাওয়ার গল্প নয়
রাফির এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত জাপানে যাওয়া নয় বরং সুযোগ তৈরির জন্য নিজে চেষ্টা করা। তিনি মনে করেন, শুধু এমবিবিএসের পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চিকিৎসক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়। ব্যবহারিক দক্ষতা, যোগাযোগের সক্ষমতা, নিজে থেকে শেখার অভ্যাস এবং মানুষের সঙ্গে পেশাদার সম্পর্ক তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাফির বিশ্বাস, একজন মানুষের কাছ থেকে পাওয়া একটি পরামর্শও জীবনের নতুন দিক খুলে দিতে পারে। পাঁচজন মানুষের কাছে গেলে পাঁচটি ভিন্ন পথের সন্ধান মিলতে পারে। তবে তিনি অন্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চান না। তাঁর মতে, আগে নিজে চেষ্টা করতে হবে। কোথাও আটকে গেলে সাহায্য চাইতে হবে। সাহায্য চাওয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয়।
জাপানের দক্ষতা দেশের কাজে লাগানোর অঙ্গীকার
জাপানে যাওয়ার আগে সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষা ও বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি একসঙ্গে সামলানো। কিন্তু জাপানে পৌঁছানোর পর সেই চাপ অনেকটাই কেটে যায়। নতুন পরিবেশ, নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি এবং শেখার সুযোগ তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করে। এখন তাঁর লক্ষ্য শুধু একজন নিউরোসার্জন হওয়া নয়, বরং দক্ষ অস্ত্রোপচারবিদ হওয়ার পাশাপাশি গবেষণা, সহমর্মিতা ও দলগত কাজের মানসিকতাও নিজের মধ্যে গড়ে তোলা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ফিরে এসে জাপানে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগাতে চান তিনি।
জুলাই ২০২৪-এ আহত মানুষের ভিড়ের মধ্যে যে তরুণের মনে নিউরোসার্জারি নিয়ে স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল, কয়েক মাসের অধ্যবসায়, যোগাযোগ আর নিজের উদ্যোগ সেই স্বপ্নকে নিয়ে গেছে টোকিওর একটি বিশ্বমানের হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে। সেই পথচলা হয়তো কেবল একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর বিদেশযাত্রার গল্প নয়। এটি নিজের আগ্রহকে লক্ষ্য বানিয়ে, সুযোগের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই সুযোগ খুঁজে নেওয়ার গল্প—যেখানে একটি ই-মেইল, একটি পরিচয়, একটি প্রশ্ন এবং নিরন্তর চেষ্টা ধীরে ধীরে খুলে দিয়েছে নতুন এক দরজা।
এমইউ/