০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:১৩ পিএম

ফের রোগীর স্বজনদের সংঘবদ্ধ হামলা: শজিমেকে চিকিৎসকসহ আহত ১২

ফের রোগীর স্বজনদের সংঘবদ্ধ হামলা: শজিমেকে চিকিৎসকসহ আহত ১২
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬ ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে হাসপাতালের সপ্তমতলায় এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার প্রতিবাদে কর্মস্থলের নিরাপত্তার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে গেছেন হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।

এদিকে চিকিৎসকদের ওপর হামলার অভিযোগে স্থানীয় ছাত্রদলের চার নেতাসহ রোগীর ছয় স্বজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বগুড়া শহরের ১৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক নাফিউল ইসলাম ও যুগ্ম আহ্বায়ক প্রান্ত রয়েছেন। তারা পুলিশ হেফাজতে শজিমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে।

হাসপাতাল ও দায়িত্বরত চিকিৎসক সূত্রে জানা যায়, বগুড়া শহরের রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মানিক (৫৫) দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট বা সিওপিডি রোগে ভুগছিলেন। মঙ্গলবার রাতে তার অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে তাকে অত্যন্ত মুমূর্ষু অবস্থায় মেডিসিন ইউনিট-৪ এ আনা হয়। ভর্তির সময় রোগীর রক্তচাপ ও নাড়ির স্পন্দন (পালস) মেশিনে রেকর্ড করা যাচ্ছিল না এবং অক্সিজেনের মাত্রাও ছিল আশঙ্কাজনকভাবে কম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তার অবস্থা ছিল ‘অ্যাকিউট এক্সাসারবেশন অব সিওপিডি উইথ টাইপ-২ রেসপিরেটরি ফেইলিউর উইথ শক।’ অর্থাৎ, তার ফুসফুস প্রায় বিকল হয়ে শরীর ততক্ষণে 'শক'-এ (রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া) চলে গিয়েছিল।

দায়িত্বরত চিকিৎসকরা আরও জানান, এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীকে ‘রেড ক্যাটাগরি’ বা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের রোগী হিসেবে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ মাস্কের (এনআরবি) মাধ্যমে উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহ করেন এবং জীবন বাঁচানোর জরুরি চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু রোগীর অবস্থা আগে থেকেই অত্যন্ত খারাপ থাকায় দ্রুত চিকিৎসা ও কয়েক দফা নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরও কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

জীবন বাঁচানোর এই জরুরি চিকিৎসা চলাকালীন প্রয়োগ করা ওষুধ বা ইনজেকশনকেই রোগীর স্বজনরা ‘ভুল ইনজেকশন’ বলে অভিযোগ করেন। মূলত এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান এবং একপর্যায়ে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরা।

হামলায় গুরুতর আহত হন ইন্টার্ন চিকিৎসক আজরাফ ইসলাম অর্ক। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ‘ঘটনার সময় সপ্তমতলায় গিয়ে দেখি মৃতদেহ ঘিরে কয়েকজনের জটলা। একপর্যায়ে তারা একজন মিড-লেভেল চিকিৎসককে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমি সেই সিনিয়র চিকিৎসককে রক্ষা করতে সামনে দাঁড়ালে তারা আমার ওপর চড়াও হন এবং আমাকে বেধড়ক মারধর করেন।’

ইন্টার্ন চিকিৎসক ঋতু মণ্ডল স্নিগ্ধ বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, হামলায় প্রায় ছয়জন ইন্টার্ন চিকিৎসক গুরুতর আহত হয়েছেন এবং কয়েকজনের হাতের হাড় ভেঙে গেছে। একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক প্রতিদিন প্রায় ৫০-৬০ জন রোগীর চিকিৎসাসেবায় যুক্ত থাকেন। এই অবস্থায় চিকিৎসকদের নিরাপত্তা না থাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাচ্ছি।’

চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছেন শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মনজুর-এ-মোর্শেদ। তিনি বলেন, বহিরাগতদের হামলায় ইন্টার্ন ও মিড লেভেল মিলিয়ে ছয়জন চিকিৎসক আহত হয়েছেন।

নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দিয়ে ডা. মনজুর এ মুর্শেদ বলেন, ‘চিকিৎসকদের সেবা দিতে হলে সবার আগে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। হাসপাতালে অবকাঠামো ও জনবলের তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি। তার ওপর একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন থাকায় চিকিৎসাসেবার পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।’

এদিকে খবর পেয়ে বগুড়া সদর থানা-পুলিশ ও ডিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী গণমাধ্যমকে জানান, এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে যাঁদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, তাঁরা রোগীর স্বজন বা স্বজনদের সঙ্গে আসা ব্যক্তি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বহিরাগত বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না এমন নানা কথা শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি 

এদিকে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের হামলার প্রতিবাদে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি অব্যাহত রয়েছে। আজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টার দিকে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা ঘোষণা দেন, হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও মামলা দায়েরসহ চার দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই কর্মবিরতি চলবে। এর আগে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য এই কর্মবিরতির ডাক দেন।

এ সময় চিকিৎসকেরা হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে পর্যাপ্ত সংখ্যক আনসার সদস্য মোতায়েনের আহ্বান জানান।

এ ছাড়া হাসপাতালের মোট শয্যাসংখ্যার অনুপাতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি ওয়ার্ডে বিশৃঙ্খলা এড়াতে রোগীর সাথে একের অধিক স্বজন বা অ্যাটেনডেন্ট প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দাবিও জানান তারা। এসব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মস্থলে ফিরবেন না বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।

এর আগে গত ১৫ আগস্ট দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে।

ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শেষ ধাপের ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত এক আশঙ্কাজনক রোগীর আইসিইউ শয্যা না পাওয়া এবং পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনরা এ হামলা ও ভাঙচুর চালায়। হামলার সময় দায়িত্বরত অনারারি মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মোশাররফ হোসেন ও ওয়ার্ড বয় জাহাঙ্গীরকে টেনে-হিঁচড়ে মেঝেতে ফেলে মারধর করেন রোগীর স্বজনরা।

জেএইচ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত