একশ' কোম্পানির ৬৪টি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে
ওষুধের মূল্য নির্ধারণসহ সংস্কার নীতিতে বিকাশের বাধা দূর করার আহ্বান
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সুলভ মূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতে উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার ও শিল্পের বিনিয়োগ সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি) নেতারা। তারা জানান, নানা চ্যালেঞ্জের কারণে অধিকাংশ কোম্পানি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে দেশের সম্ভাবনাময় এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। এসব বিষয় সামনে রেখে বিদ্যমান নীতিমালা যুগোপযোগী করে শিল্পের বিকাশের বাধাগুলো দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন ওষুধশিল্প সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে নিজেদের অবস্থানও তুলে ধরেন।
আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি) কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় তুলে ধরেন তারা। দেশের স্বাস্থ্য সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সঙ্গে ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই মতবিনিময়ের আয়োজন করে বাপি।
দেশের ওষুধশিল্পের বাজার প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার
হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি) মহাসচিব মো. হালিমুজ্জামান বলেন, দেশে ওষুধের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা আমাদের কতটা স্বস্তি দিয়ে রাখছে, সেটিও আমরা সাধারণ সময়ে অনুভব করি না। কোনো সংকট তৈরি হলেই এর গুরুত্ব উপলব্ধি হবে। বাংলাদেশ ওষুধ উৎপাদনে যে সক্ষমতা অর্জন করেছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সক্ষমতাকে আরও এগিয়ে নিতে হবে; কোনোভাবেই পিছিয়ে যাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, ভুল কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে দেশের যেন ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে ওষুধের উৎপাদন কমে গেলে প্রাপ্যতাও কমে যেতে পারে এবং তখন বাংলাদেশকে বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে।
বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া জানিয়ে হালিমুজ্জামান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধের বাজার প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের। এটি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়লে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে—যা ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। তাই দেশের ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রাপ্যতা ধরে রাখা শুধু শিল্পের স্বার্থে নয়, বরং জনগণ ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতের অনেক সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো ওষুধশিল্পের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়া। গত তিন বছরে দেশের ওষুধশিল্পে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়নি। অথচ এ সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তিত হয়েছে এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ওষুধশিল্পের বিকাশ ঘটেনি।
ডিজেল নির্ভরতায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
গ্যাস সংকটে ডিজেলের ওপর নির্ভরতার কথা জানিয়ে হালিমুজ্জামান বলেন, এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের সরকারি রেট ১৫ টাকা থাকলেও তার ফ্যাক্টরির হিসাবে এখন আসছে ৪২ টাকা। তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় কত বেড়েছে, তার কোনো হিসাব করেনি বাপি।
বাপি মহাসচিব বলেন, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা মুনাফা থেকে বহন করা কঠিন হবে। তখন উৎপাদন ব্যয় সমন্বয়ের জন্য ওষুধের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে ওষুধ কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমন পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বলে জানান তিনি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শতভাগ জেনারেটর ব্যাকআপ রয়েছে। তবে ডিজেল ফুয়েল ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকট চলমান আছে, এর পর কোনো কারণে ডিজেল অপ্রতুল হলে ওষুধ কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
একশ’ কোম্পানির ৬৪টি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে
বাপি মহাসচিব বলেন, আমাদের দেশে যে ওষুধ কোম্পানিগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ১০০টি কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৬৪টিরই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। স্বাস্থ্য ও ওষুধশিল্পের বাজার-তথ্য ও বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের (আইকিউআইএ) প্রতিবেদনে আমরা এ তথ্য দেখতে পাচ্ছি। একটি সময় যেটি ছিল ক্রমবর্ধমান একটি খাত, সেখানে এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।’
‘অন্যদিকে প্রতিনিয়ত সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে যে ওষুধের দাম বেড়ে যাচ্ছে বা আরও বাড়বে। কিন্তু বাংলাদেশের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর ওষুধের দাম নিয়ে আমরা যে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেছি, সেখানে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ৩৯টি ওষুধের মধ্যে ৩০টির দাম ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে কম। বাকি ৯টি ওষুধের দাম বাংলাদেশে ভারতের তুলনায় কিছুটা বেশি। এর পেছনেও নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। ভারতের কিছু প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল নিজেরাই উৎপাদন করে এবং তা থেকে ফিনিশড প্রোডাক্ট তৈরি করে। ফলে তাদের উৎপাদনব্যয় তুলনামূলকভাবে কম।’
তিনি বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত ওষুধগুলোর তথ্য সংগ্রহের পর বিশ্লেষণ করে মনে হয়েছে, পর্যাপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকার কারণে অনেক সময় সংবাদ অসম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়। ফলে কোনো কোনো শিরোনাম সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। এ বিষয়টি আরও তথ্যনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
পোশাকের পর সম্ভাবনাময় খাত ওষুধশিল্প
বাপি মহাসচিব বলেন, একই সঙ্গে দেশের ওষুধশিল্পের প্রতি আস্থা রাখা জরুরি। এটি বাংলাদেশের গর্বের একটি খাত। এটি পুরোপুরি বেসরকারি খাত, যা দেশের ওষুধের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করার পাশাপাশি বিদেশেও ওষুধ রপ্তানি করছে। তৈরি পোশাকশিল্পের পর বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে ওষুধশিল্পকে বিবেচনা করা যায়।
‘আমরা আশা করছি, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করবে। এ খাতে সেই সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন নীতি সংস্কারের জন্য যেসব কমিটি কাজ করছে, তারা যদি বিদ্যমান নীতিগুলোকে যুগোপযোগী করে এবং শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশের পথে থাকা বাধাগুলো দূর করতে পারে, তাহলে এ খাত আরও এগিয়ে যাবে।’
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের বিরোধী নয় বলে জানান সমিতির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘বিরোধিতা নয়, বরং আমরা চাই, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হোক এবং তা হোক যোগ্য ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করে। একই সঙ্গে ওষুধের মূল্য নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত প্রক্রিয়া থাকা জরুরি।
সরকারেরও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা করদাতা জনগণ হিসেবে মনে করি, সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পখাতকেও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
ডা. জাকির হোসেন বলেন, সরকারি ব্যবস্থায় ইডিসিএল থেকে ওষুধ কেনার জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও বরাদ্দ রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানের বাজেটের একটি অংশ ইডিসিএল থেকে ওষুধ কেনার জন্য ব্যয় করা হয়। এর ফলে ইডিসিএল’র জন্য একটি নির্ধারিত বাজার ও ক্রেতা নিশ্চিত থাকে। তাদের ওষুধ সরবরাহের জন্য আলাদা করে বাজার তৈরি বা বিপণন ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না এবং বিল পরিশোধের ব্যবস্থাও সরকারি কাঠামোর মধ্যেই নিশ্চিত থাকে।
‘অন্যদিকে, বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোকে বাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়। তাদের উৎপাদন, বিপণন, বিনিয়োগ ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হয় এবং একই সঙ্গে বাজারে বিক্রির অনিশ্চয়তাও থাকে। ফলে সরকারি সুবিধা ও নির্ধারিত বাজার থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সরাসরি তুলনা করা বাস্তবসম্মত নয়’—যোগ করেন তিনি।
এক্ষেত্রে তিনি ১৯৯৪ সালের নীতির আলোকে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখায় গুরুত্বারোপ করেন। বলেন, বর্তমানে যে বেঞ্চমার্ক প্রাইস অনুসরণ করা হচ্ছে, সেটি ২০০৬ সালের। ১৯৯৪ থেকে ২০২৬—এই ৩২ বছরে যদি মাত্র দুবার মূল্য সমন্বয় করা হয়, তাহলে বিষয়টি বাস্তবসম্মত হয় না। ১৯৯৪ সালে ডলারের মূল্য, চালের দাম এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় কত ছিল, আর বর্তমানে তা কত—এসব বিষয়ও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
যেখানে প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ এবং কর্মীদের বেতনও প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হয়, সেখানে ওষুধের মূল্য দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত রাখলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই এমন একটি টেকসই মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে উৎপাদন ব্যয় ও বাজারের বাস্তবতা অনুযায়ী নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।
কেবল ওষুধের মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগে প্রশ্ন
খাদ্য-শিক্ষাসহ অন্যান্য বিষয় না করে সরকার শুধু ওষুধের মূল্য নির্ধারণে উদ্যোগী হওয়ায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। বলেন, খাদ্যের মূল্য কি সরকার নির্ধারণ করে দেয়? বস্ত্র? বাসস্থান? শিক্ষার খরচ কি সরকার নির্ধারণ করে দেয়? তাহলে স্বাস্থ্যের এত উপাদানের ভেতরে শুধু ওষুধেরটা কেন নির্ধারণ করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কি কেউ দিতে পারবে?
এটা করাতে আপনারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই এতে দেশীয় কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে চাই দেশের জন্য একটি স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ নীতি থাকুক, যা অন্যান্য পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গেও নিয়মিত সমন্বয় করা হবে। এই সমন্বয় দুই বছর পরপর হলেও সমস্যা নেই; তবে প্রক্রিয়াটি নিয়মিত ও পূর্বনির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওষুধের দাম যেন জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, সে বিষয়টিও আমরা বিবেচনা করছি।’
‘আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে মূল্য সমন্বয়ে একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অর্থাৎ প্রতি বছর কোনো কোম্পানি যেন নির্ধারিত সীমার বেশি দাম বাড়াতে না পারে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে হঠাৎ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিও ঠেকানো যাবে।
কারণ বাস্তবতা হলো, কর্মীদের বেতন বাড়াতে হয়, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ডলারের বিনিময়মূল্যে ওঠানামা হয়, বিনিয়োগ ব্যয় বাড়ে এবং ওষুধের নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করতেও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়। এসব কারণে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন। তবে সেই সমন্বয় যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়, সে জন্য মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি সহনীয় সর্বোচ্চ সীমা থাকা প্রয়োজন। জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা এ প্রস্তাব করছি।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। আমাদের সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর সামনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন, তা হলো—বিদ্যমান ওষুধের ক্ষেত্রে বর্তমানে যে পণ্যগুলোর দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর দাম ২০২৬ সালের মধ্যে আর বাড়ানো হবে না। মূল্য নির্ধারণ কমিটি গঠিত হোক বা নতুন মূল্যনীতি প্রণয়ন করা হোক, ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাজারে বিদ্যমান পণ্যের সর্বোচ্চ মূল্য আর বাড়ানো হবে না।
তবে যেসব কোম্পানির পণ্যের দাম তুলনামূলক কম, তারা মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ পেতে পারে। আমরা আগামী বছরের জন্য মূল্য সমন্বয়ের একটি প্রস্তাবনা দেব। এগুলো আমাদের প্রস্তাব মাত্র; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তৃত্ব আমাদের নেই।
জনগণ যেন সুলভ মূল্যে ওষুধ পায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ
বাপির জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, এসেনশিয়াল ড্রাগসের বিষয়ে আমরা অনেক সময় বিষয়টি মিশিয়ে ফেলি। ‘এসেনশিয়াল ড্রাগ লিস্টকে যদি সরাসরি মূল্য নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়, তখনই হিতে বিপরীত হতে পারে। বরং বহুল প্রচলিত ও বহুল ব্যবহৃত ওষুধ কীভাবে সহজলভ্য করা যায়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখা উচিত।
আমাদের তালিকায় দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওষুধগুলো থাকা এবং জনগণ সেগুলো কী দামে পাচ্ছে, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে জনগণ যেন সুলভ মূল্যে ওষুধ পায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ওষুধের প্রাপ্যতা ও সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড যদি জনগণের, বিশেষ করে সরকারি খাতের বর্তমান ওষুধের চাহিদা নিরূপণ করে সে অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপকৃত হবে। বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের জন্য ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। যেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র ৫০ থেকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে, সেসব কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে বা অত্যন্ত ভর্তুকিমূল্যে সরবরাহ করা গেলে এর সুফল আরও বিস্তৃত হবে।
দশ হাজার কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ
বাপির জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি বলেন, আমার বিশ্বাস, সবাই মিলে কাজ করলে আমরা এ লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। আমরা সরকারকেও বলেছি, তারা বড় পরিসরে—ধরা যাক ১০ হাজার কোটি টাকার—ওষুধ কিনে জনগণের মধ্যে বিতরণ করতে পারে। যার যতটুকু সক্ষমতা, সে অনুযায়ী জনগণ মূল্য পরিশোধ করবে। আর এসব ওষুধ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতামূলক ভিত্তিতে সরবরাহ করতে পারে।
অন্যদিকে, নতুন ওষুধ, বিশেষ করে বায়োলজিক্যাল ও বায়োসিমিলার পণ্যের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কিছু নীতিগত সুবিধার কারণে বাংলাদেশে অনেক বায়োসিমিলার পণ্য দ্রুত ফিল-ফিনিশ পর্যায়ে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠান আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিম গবেষণার মাধ্যমে নিজস্ব পণ্যও তৈরি করছে।
উদ্ভাবনী পণ্যে কঠোর মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ কমার শঙ্কা
মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, এ ধরনের উদ্ভাবনী পণ্যের ওপর কঠোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করলে নতুন বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের সুযোগ কমে যেতে পারে। বর্তমান সময়ে অনেক বায়োলজিক্যাল পণ্য মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি প্রয়োজনীয়ও। তবে সেগুলোকে এসেনশিয়াল ড্রাগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সরাসরি মূল্য নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমতে পারে। তাই উদ্ভাবনী পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যনীতি নির্ধারণের সময় এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
১৯৯৪ সালের নীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের একটি ছিল নির্দিষ্ট কিছু ‘লিস্টেড প্রোডাক্ট’র পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। এগুলোকে ‘এসেনশিয়াল ড্রাগ’ হয়নি, বরং ‘লিস্টেড প্রোডাক্ট’ বলা হয়েছিল। ১১৭টি লিস্টেড প্রোডাক্ট যাতে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়, সে জন্য প্রতিটি কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ উৎপাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে তালিকার বাইরে থাকা পণ্যগুলোর মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে তুলনামূলক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নতুন পণ্যগুলো দ্রুত বাজারে আসার সুযোগ পেয়েছে এবং একই সঙ্গে দেশের ওষুধশিল্পও বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এটি শিল্পখাতে উদ্ভাবনের জন্য একটি বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৯৪ সালের সেই নীতির ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে এসে আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প একটি পরিণত শিল্পখাতে পরিণত হয়েছে।
সুলভ মূল্যের সঙ্গে মানও বজায় থাকুক
মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, সুতরাং ১৯৯৪ সালের নীতিকে শিল্পখাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বর্তমানে বিষয়টি আমাদের দুই দিক থেকেই দেখতে হবে—জনগণ যেন সুলভ মূল্যে ওষুধ পায় এবং একই সঙ্গে ওষুধের মানও যেন বজায় থাকে। কারণ ওষুধের মান নিয়ে মানুষের আস্থা একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক মূল্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে ওষুধশিল্পে এ ধরনের প্রতিযোগিতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে যেসব লিস্টেড প্রোডাক্টের মূল্য নিয়ন্ত্রিত, সেগুলোর বাইরে অনেক পণ্যের দাম বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। বাজারে কোনো কোম্পানির অবস্থান দুর্বল হলে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে দাম কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তাই জনগণের জন্য সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতা, ওষুধের মান, পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের সুযোগ—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন’—বলেন তিনি।
ফোরামের সেক্রেটারি মুজাহিদ শুভ বলেন, ‘আপনাদের পক্ষ থেকে বারবার আমাদের দায়িত্বশীলভাবে রিপোর্ট করার, ভুল তথ্য না দেওয়ার এবং সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মোটা দাগে আমাদের সামনে তিনটি পক্ষ রয়েছে—সরকার, ওষুধ শিল্প এবং জনগণ। আর গণমাধ্যম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সব পক্ষের বিষয়ই তুলে ধরা।’
‘এ কথা সত্য যে, আপনাদের সঙ্গে আমাদের পর্দার সামনে যে আলোচনা হয়, এর বাইরে সাধারণভাবে কোনো পূর্বনির্ধারিত আলোচনা থাকে না। আমরা স্বাধীনভাবেই সংবাদ ও প্রতিবেদন তৈরি করি। তবে এটাও সত্য, এখানে উপস্থিত আমরা কয়েকজন ছাড়াও দেশে অনেক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী রয়েছেন। সবার কাছে একইভাবে এসব বার্তা পৌঁছে দেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না।’
অনুষ্ঠানে বাপির চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার মেজর জেনারেলর (অব.) মো. মুস্তাফিজুর রমান, এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাইফুল ইসলাম, মিডিয়া কনসালটেন্ট মো. জাহিদুর রহমান এবং ফোরামের সাবেক সভাপতি রাশেদ রাব্বিসহ সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এমইউ/