এনডিএফ ঢাকা দক্ষিণের সীরাত আলোচনা
ধর্ম-নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সমাজের অবক্ষয় অবধারিত: ছাত্রশিবির সভাপতি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সমাজ ও সভ্যতার সংকট, পরিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে ইসলামের জীবনব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, ব্যক্তি, পরিবার, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—জীবনের প্রতিটি স্তরেই কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি রাসূলুল্লাহ (স.)-এর জীবন ও সাহাবীদের সুন্নাহ অনুসরণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বর্তমান প্রজন্মকে ইসলামী আদর্শ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে নিজেদের জীবন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সীরাতুন্নাবীর (স.) গুরুত্ব শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, আন্তঃকোন্দল, পারিবারিক কাঠামোর ভাঙন, সামাজিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে একটি সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারে। এমন একটি সমাজব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে ইসলামের আগমনের পূর্ববর্তী আরব সমাজকে উল্লেখ করা হয়, যেখানে কুরআন, আসমানি কিতাব বা নবী-রাসুলের দিকনির্দেশনা ছিল না। বস্তুবাদনির্ভর সেই সমাজব্যবস্থায় ধর্মের কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না।
তিনি বলেন, বস্তুবাদী চিন্তাধারায় সমাজকে মূলত বস্তুগত বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে থিসিস, অ্যান্টিথিসিস ও সিন্থেসিসের মাধ্যমে সমাজের পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা হয়। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্মকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
এ সময় ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতা চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, ‘ধর্ম ও নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে গেলে সমাজে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অবাধ যৌনসম্পর্ক, লিভিং টুগেদারসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রবণতা পরিবারব্যবস্থাকে দুর্বল করছে—এমন অভিযোগ পশ্চিমা সমাজকে নিয়ে প্রায়ই করা হয়। এর ফলে পারিবারিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক আস্থা, সন্তান প্রতিপালন এবং সামাজিকীকরণের মতো বিষয়গুলোও সংকটের মুখে পড়তে পারে।’
তিনি আরও বলেন, অনেক উন্নত দেশে জন্মহার অত্যন্ত কমে গেছে এবং কিছু দেশে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পেছনে অর্থনৈতিক চাপ, বিবাহ ও পরিবার সম্পর্কে পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি, সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়া এবং জীবনযাপনের পরিবর্তনসহ নানা কারণ রয়েছে। এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন সমাজেও এসব পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবারকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, কুরআনে বলা হয়েছে, পুরুষদের নারীদের ওপর এক পর্যায়ের দায়িত্ব ও মর্যাদা রয়েছে—যার ভিত্তি হিসেবে দায়িত্ব, ভরণপোষণ ও পারিবারিক নেতৃত্বের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ইসলামী কাঠামোয় নারী-পুরুষের অধিকার ও দায়িত্বকে পরস্পর-সম্পূরক হিসেবে দেখা হয়। আধুনিক জীবনে নারী ও পুরুষ উভয়ের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের ফলে অনেক পরিবারে সন্তান প্রতিপালন, পারিবারিক সময়, বন্ধন ও সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
‘বিশেষ করে নিউক্লিয়ার পরিবারের বিস্তার ও পারিবারিক সময় কমে যাওয়ার কারণে সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং পরবর্তী প্রজন্মের সামাজিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এসব সমস্যাকে শুধু একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা না করে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।’
ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, ইসলামী দৃষ্টিতে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা ছাড়া কোনো সমাজ যতই অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হোক, তা পূর্ণাঙ্গ কল্যাণকর সমাজব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয় না। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী আরব সমাজকে কুরআন ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’র সমাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
‘কুরআন মানুষের এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের কথা বলে। আল্লাহ বলেন, রাসুলকে পাঠানো হয়েছে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনার জন্য। ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব সমাজে নৈতিকতা, পরিবার, সামাজিক দায়িত্ব, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ঘটেছিল, তা ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, ধর্ম ও নৈতিকতার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। মুসলিম সমাজও যখন কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়, তখন তাদের মধ্যেও নানা ধরনের সামাজিক ও নৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে। তাই ইসলামী দৃষ্টিতে একটি কল্যাণকর সমাজ গঠনের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর নৈতিক ও সামাজিক নির্দেশনাকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য’—বলেন তিনি।
ছাত্রশিবির সভাপতি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহর (স.) জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল আল্লাহর পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। কিন্তু আমাদের অনেকের কাছে ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’র ধারণা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতো ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে। অথচ ইসলামের শিক্ষা ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
‘পাশ্চাত্য চিন্তাবিদ স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থায় পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্গে ইসলামী সভ্যতার সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ তত্ত্বে ইসলামী সভ্যতাকে ভবিষ্যৎ সংঘাতের অন্যতম সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ইসলামের সঙ্গে পশ্চিমা সভ্যতার টানাপোড়েনের বিষয়টি অন্যান্য অনেক ধর্মের তুলনায় আলাদাভাবে আলোচিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—ব্যক্তিগত ধর্মচর্চা এবং রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় ইসলামের ভূমিকা। নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত পালনের মতো ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলন পশ্চিমা সমাজেও বিদ্যমান এবং সেগুলো নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সহনশীলতা দেখা যায়। কিন্তু ইসলাম যখন ব্যক্তি জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজ, অর্থনীতি, আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে কথা বলে, তখন তার সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দর্শনের সংঘাতের প্রশ্ন সামনে আসে।
‘এই কারণে আমাদের নিজেদের জীবনকে সুন্নতে নববীর আলোকে গড়ে তোলার জন্য সাহস, হিম্মত ও দৃঢ়তা অর্জন করতে হবে। রাসূলুল্লাহর (স.) সিরাতের ধারাবাহিক বর্ণনাগুলো অধ্যয়ন করা প্রয়োজন, যাতে তাঁর জীবন, চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য সম্পর্কে আমরা বাস্তব শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।’
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহর (স.) ইন্তেকালের পর সাহাবীরা একদিন আয়েশা (রা.)-এর কাছে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁদের কুরআন পড়তে বলেছিলেন এবং বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, রাসূলুল্লাহর (স.) চরিত্র ছিল কুরআনের বাস্তব প্রতিফলন। অতএব, সুন্নতে নববীর আলোকে জীবন গঠন মানে শুধু কিছু বাহ্যিক আমল পালন করা নয়; বরং কুরআনের শিক্ষা ও রাসূলুল্লাহর (স.) আদর্শকে চরিত্র, আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং সামগ্রিক জীবনব্যবস্থায় বাস্তবায়ন করা।’
বক্তব্যে রাসূলুল্লাহর (স.) সুন্নাহকে সাহাবীদের গভীরভাবে অনুসরণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন তিনি বলেন, একবার একটি অভিযানে হযরত উমর (রা.) কিছুদূর যাওয়ার পর একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে বসলেন। সাহাবীরা তাঁকে বললেন, ‘খলিফা, আমরা এখনো ক্লান্ত হইনি; আরও কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারি।’
উমর (রা.) বললেন, ‘না, এখানেই বিশ্রাম নিতে হবে। কারণ আমি রাসূলুল্লাহকে (স.) এই গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে দেখেছি।’
‘সাহাবীদের কাছে রাসূলুল্লাহর (স.) অনুসরণ ছিল এমনই গভীর ও আন্তরিক। তাঁর একটি কাজও তাঁদের কাছে অনুসরণীয় সুন্নাহর মর্যাদা রাখত’—বলেন তিনি।
এনডিএফ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতি ডা. মোহাম্মদ মারুফ শাহরিয়ারের সভাতিত্বে অনুষ্ঠিত সীরাত আলোচনায় বিভিন্ন স্তরের চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।
এমইউ/