জুলাই আন্দোলনে চিকিৎসকদের অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই আন্দোলনে চিকিৎসকদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসক, শিক্ষক ও রাজনৈতিক নেতারা। তারা বলেন, জুলাইয়ের গণআন্দোলনে আহতদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে অনেক চিকিৎসক জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছেন, কেউ কেউ হয়েছেন নির্যাতনের শিকার। আহতদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের অবদান, আত্মত্যাগ এবং শহীদ চিকিৎসকদের স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও মূল্যায়নের আহ্বান জানান তারা।
রোববার (৯ আগস্ট) ‘অগ্নিঝরা জুলাইয়ে চিকিৎসকদের অবদান’ শীর্ষক এক আলোচনাসভায় বক্তারা এ দাবি জানান। ‘প্ল্যাটফর্ম অব মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটি’র সহযোগিতায় এর আয়োজন করে ‘ডকটরস রেজিস্ট্যান্স ডে বাস্তবায়ন কমিটি।
আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, ‘জুলাই আসলে ৩৬ দিনের নয়, জুলাই ১৭ বছরের। যেদিন দেশে গণতন্ত্র হরণ করা হয়েছে, সেদিনই জুলাইয়ের সূচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের কৃতিত্ব দেশের ১৮ কোটি মানুষের। এই দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তিনি আরো বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ ও অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে ‘জুলাই অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং বাদ পড়া জুলাই যোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার কাজ করছে।’
এখনও অনেক জুলাই যোদ্ধা স্বীকৃতির আওতায় আসেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। একইসঙ্গে গত ১৭ বছরের আন্দোলনে গুম ও হত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও যথাযথ মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অপশক্তির বিরুদ্ধে সবাই এক থাকতে পারলে কেউ ষড়যন্ত্র করতে পারবে না।’
প্রধান বক্তার বক্তব্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, ‘জুলাইয়ে অনেক হাসপাতালে আহত রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হলেও বহু চিকিৎসক নিজেদের জীবন ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। যারা চিকিৎসকের শপথ ভঙ্গ করে আহতদের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করেছেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।’
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ে আমি আহত হয়েছিলাম। আমাকে সেখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল, পরে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তখন আমি দেখেছি, চিকিৎসকরা নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন। এটাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের আদর্শ হওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ে কোনো একটি শ্রেণি বা পেশার মানুষ নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।’
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ে চিকিৎসকদের অবদান এখনও যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এ বিষয়ে সরকার নিশ্চয়ই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনসহ এমন কোনো গণআন্দোলন নেই, যেখানে চিকিৎসকদের অবদান ছিল না।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের ইতিহাস নিয়ে ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি বা দখলদারিত্বের কোনো সুযোগ যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য চিকিৎসকসহ সকল গণতন্ত্রকামী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বিএনপির সহ-পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রফিকুল কবির লাবু বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনাকে কেউ বিক্রি করার চেষ্টা করবেন না। একাত্তরের চেতনা বিক্রি করতে গিয়ে দেশকে বিভক্ত করা হয়েছে। তাই কোনো চেতনা বিক্রি না করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, জুলাই একদিনে আসেনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার নতুন দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। গত ১৭ বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে এবং জুলাইয়ে এসে তা পূর্ণতা পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাজ ছিল শিক্ষার্থীদের পড়ানো, কিন্তু বিবেকের তাড়নায় আমরা রাস্তায় নেমে এসেছি।’
অনুষ্ঠানে শহীদ ডা. সজীব সরকারের পিতা হালিম সরকার বকুল আবেগঘন বক্তব্যে নরসিংদী মেডিক্যাল কলেজটি শহীদ ডা. সজীব সরকারের নামে নামকরণের দাবি জানান। অনুষ্ঠানে শহীদ ডা. মো. কবিরুল ইসলামের সহধর্মিণী শামসুন নাহার শেলীও উপস্থিত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি নেতা অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলনে চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও তারা আজও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হননি। বিগত দিনে নির্যাতিত ও বঞ্চিত চিকিৎসকদের দ্রুত ন্যায়সঙ্গত পদায়ন ও পদোন্নতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক যাকারিয়া আল আজিজ, অধ্যাপক মাযহার শাহীন, বিএমইউর প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাহেদ আলম।
বক্তারা জুলাইয়ের আন্দোলনে চিকিৎসকদের ভূমিকা ইতিহাসে সংরক্ষণ ও শহীদদের উপযুক্ত মর্যাদায় মূল্যায়নের আহ্বান জানান।
এমইউ/