আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণা
নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে মায়েদের দুধে বেশি পরিমাণে রোগপ্রতিরোধী অ্যান্টিবডি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: মায়ের দুধ শুধু শিশুর পুষ্টির উৎস নয়, এটি রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মায়েদের স্তন্যদুগ্ধে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় বেশি ধরনের এবং বেশি মাত্রার অ্যান্টিবডি রয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব অ্যান্টিবডি শিশুদের জীবনের প্রথম কয়েক মাসে বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সুরক্ষা দিতে পারে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার, অ্যান্টিজেন ডিসকভারি ইনকরপোরেটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা। এতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, পেরু, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিনল্যান্ডের মায়েদের স্তন্যদুগ্ধ বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও পেরুর মায়েদের দুধেই কোলাই, সালমোনেলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এবং নিউমোকক্কাসসহ ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ সৃষ্টিকারী বিভিন্ন জীবাণুর বিরুদ্ধে বেশি সংখ্যক অ্যান্টিবডি রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, এসব দেশে রোগজীবাণুর সংস্পর্শে বেশি আসা এবং জীবাণুর বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এমন ফলাফল পাওয়া গেছে।
গবেষণায় বিশেষভাবে দুটি অ্যান্টিবডি আইজিএ ও আইজিজি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আইজিএ মূলত অন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের মতো শ্লৈষ্মিক আবরণে কাজ করে, আর আইজিজি রক্তের মাধ্যমে শরীরজুড়ে রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
শিগেলা সংক্রমণের ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মায়েদের দুধে আইজিএ ও আইজিজি—উভয় ধরনের অ্যান্টিবডির শক্তিশালী উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিপরীতে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর নমুনায় প্রধানত আইজিএ অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ক্রিপ্টোস্পোরিডিয়াম সংক্রমণের ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মায়েদের দুধে আইজিএ-এর মাত্রা বেশি হলেও আইজিজির উপস্থিতি উভয় দেশগোষ্ঠীতেই কম ছিল।
বাংলাদেশি শিশুদের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, রোটাভাইরাসের বিরুদ্ধে বেশি আইজিএ অ্যান্টিবডি থাকলে ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে। শিগেলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুরক্ষামূলক প্রবণতা দেখা গেছে। তবে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার ও ক্রিপ্টোস্পোরিডিয়ামের ক্ষেত্রে বেশি আইজিএ অ্যান্টিবডি থাকা সত্ত্বেও সংক্রমণের হার বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডিগুলো সংক্রমণের কারণ নয়; বরং মা ও শিশুর ওই জীবাণুর সঙ্গে পূর্ববর্তী সংস্পর্শের নির্দেশক হতে পারে।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। যেসব মায়ের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) বেশি, তাদের স্তন্যদুগ্ধে আইজিএ অ্যান্টিবডির মাত্রা তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে অতিরিক্ত ওজনের মায়েদের দুধ শিশুদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারে না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে স্তন্যপানকে আরও বেশি উৎসাহিত করা জরুরি। কারণ, মায়ের দুধে থাকা অ্যান্টিবডি শিশুর নিজের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে।
গবেষকেরা বলেন, যে দেশে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতির কারণে শিশুদের রোগজীবাণুর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেশি, সেখানে এই সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্তন্যপান—নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি, টিকাদান বা সময়মতো চিকিৎসার বিকল্প নয়। বরং এটি শিশুদের জীবনের শুরুতে অতিরিক্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে।
তারা আরও বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণা মাতৃ টিকাদান, পুষ্টি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মসূচি উন্নয়নে সহায়তা করবে, যা মায়ের মাধ্যমে শিশুদের আরও কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এমআর/