০২ অগাস্ট, ২০২৬ ১০:০২ এএম

চুরি ও বহিরাগতদের অবাধ বিচরণে নিরাপত্তাহীন শেবাচিম ছাত্রাবাস, উদ্বেগে শিক্ষার্থীরা

চুরি ও বহিরাগতদের অবাধ বিচরণে নিরাপত্তাহীন শেবাচিম ছাত্রাবাস, উদ্বেগে শিক্ষার্থীরা
বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) যেন দিন দিন শিক্ষার্থীদের জন্য অনিরাপদ ক্যাম্পাসে পরিণত হচ্ছে। একদিকে ছাত্রাবাসের খোদ দারোয়ানদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক চুরি, মাদকাসক্তির অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ ও তাদের সহযোগিতায় নিরাপত্তাকর্মীদের অপরাধ সংঘটন, নারী শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত এবং আবাসিক হলের নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার অব্যবস্থাপনা চরম আকার ধারণ করেছে। এসব কারণে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, বারবার অভিযোগ করা হলেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।

জানা গেছে, শনিবার (১ আগস্ট) শেবাচিমের মঈনুল হায়দার ছাত্রাবাসের (৩ নং ছাত্রাবাস) দারোয়ান অলক ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর সিলিন্ডার ও ক্যাম্পাসের সিমেন্ট চুরি করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সিমেন্ট নিজে চুরি করলেও সিলিন্ডার চুরির জন্য রিকশাচালকের সহযোগিতা নেয় সে। সিলিন্ডার বাজারে বিক্রি করে ফিরে এলে ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীরা তাকে বেঁধে রাখে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে হলের সিলিন্ডার থেকে জুতা পর্যন্ত—সবকিছু চুরির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদকসেবী এই দারোয়ান। 

শেবাচিমে নিরাপত্তা সংকটের কথা জানিয়ে একাধিক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে নিশ্চিত হওয়ার পর তারা অলককে বেঁধে রাখে এবং প্রশাসনকে অবহিত করে।

তারা আরও জানান, গত কয়েক মাস আগে গভীর রাতে মেডিকেলের জামিলুর রহমান পাপ্পু (১ নং) ছাত্রাবাসের রুমে ঢুকে শিক্ষার্থীদের টাকা চুরি করে আরেক দারোয়ান আল আমিন। পরে শিক্ষার্থীরা হাতেনাতে ধরে তাকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে।

জানা গেছে, আল আমিনের পরিবারের তিন সহোদর শেবাচিমের বিভিন্ন হলে দারোয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সহোদর আল মামুন ৩ নং হলে চুরির ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ করেছে শনিবার (১ আগস্ট) শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা পড়া অলক।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলগুলোতে তিন শিফটে তিনজন করে দারোয়ান থাকলেও যেকোনো সময় কুকুর উপরে উঠে পরিবেশ নোংরা করে। 

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শেবাচিমের নতুন ছাত্রাবাসের কাজ শুরু হয়। তবে শিক্ষার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন শিক্ষার্থীরা। বারবার বলার পরও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা নিজ উদ্যোগে তা সমাধান করেন।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাসে চুরি বাড়তি উদ্বেগের

চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রাবাসের সহকারী সুপার ডা. আব্দুল জব্বাব মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের মেডিকেল কলেজ, হোস্টেল, হাসপাতাল, কলেজ, একাডেমিক—সব মিলিয়ে জনবলের একটি কাঠামো ঠিক করা আছে। কোন জায়গায় কতজন সিকিউরিটি গার্ড, নাইট গার্ড থাকবে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের একটি উদাসীনতা আছে মেডিকেল কলেজের প্রতি, মেডিকেল শিক্ষার প্রতি। সে কারণে তারা এই কাঠামো অনুযায়ী লোকবল দেয় না। স্থায়ী লোকবল না থাকায় আমাদের স্থানীয়ভাবে ডেইলি বেসিসে লোক নিয়োগ দিতে হয়। এ কারণে সামাল দেওয়া যায় না। এই পদগুলো শূন্য থাকার কারণেই মূলত এই সমস্যা হচ্ছে। মেডিকেল কলেজের মূল অভিভাবক হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য বিভাগ। ৯ম গ্রেডের পরবর্তী ধাপগুলোর নিয়োগ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর। এখানে তাদের পদক্ষেপ না থাকায় এই অঘটন ঘটছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেবাচিমের তিন নম্বর ছাত্রাবাসের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এখানে আমাদের সব বিদেশি শিক্ষার্থী থাকে। নেপাল, ভুটান, ইন্ডিয়া, কাশ্মীর, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন—এই সব দেশের শিক্ষার্থীর অবস্থান এই ছাত্রাবাসে। তাই ওদের নিরাপত্তা একটা বড় একটা বিষয়। এটা রাষ্ট্রীয় একটা ইস্যুও বটে। খুবই স্পর্শকাতর ব্যাপার।’

ডেইলি বেসিসের কর্মীরা নিরাপত্তা নিশ্চিতের বদলে নিজেরা চুরি করা শুরু করে দিয়েছে, এটা সমাধান কীভাবে করবেন? তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছেন কিনা?

এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সেটা আসলে প্রশাসনিক বিষয়, আমি তো প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। অধ্যক্ষ স্যার এটার দায়িত্বে। তিনি এই মুহূর্তে দেশের বাইরে আছেন। ফিরে এলে তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানাবো এবং আইনি যে ব্যবস্থা নেওয়ার সেটা আমরা নিবো।’

নারী শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা

অন্যদিকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো শোচনীয় বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

শেবাচিম শিক্ষার্থীদের ফেসবুক গ্রুপে একজন ভুক্তভোগী নারী শিক্ষার্থী জানান, রাত ৯:২০ এর দিকে তাঁর ৩ নারী ব্যাচমেট খাবার কিনতে কলেজ ক্যান্টিনে যাওয়ার সময় প্রশাসনিক ভবনের সামনে রিক্সা থেকে তাদের থুথু মারা হয়। পরবর্তীতে ছাত্রীরা চিৎকার করলে উত্ত্যক্তকারীরা দ্রুত রিক্সা নিয়ে পালিয়ে যায়। ওই শিক্ষার্থী তার পোস্টে ক্যাম্পাস এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানান।

হলে বহিরাগতদের আনাগুনা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে আরেক শিক্ষার্থী গ্রুপে পোস্ট করেছেন।

নারী শিক্ষার্থীদের এই নিরাপত্তাহীনতার সমাধান নিয়ে কী ভাবছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্রী হোস্টেলের সাথে জড়িত না থাকায় এ বিষয়ে আমি অবগত না।’

পুকুর থেকে বহিরাগতদের মাছ ধরা

এ ছাড়া বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের পুকুর থেকে বহিরাগতদের মাছ ধরার বিষয়ে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, এটা মেডিকেলে কলেজের সম্পদ। এর লাভ ও লোকসান সবটাই কলেজের নিজস্ব বিষয়। অথচ এখানে বহিরাগতরা এসে দেদারসে মাছ ধরে নিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে প্রশাসন থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি অভিযোগ করে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

পুকুর থেকে বহিরাগতদের মাছ ধরতে আসার বিষয়ে হল প্রভোস্ট বলেন, ‘এটি প্রতিরোধে স্থানীয়ভাবে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব না। কলেজ প্রশাসন এটা পারে না। অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয় এবং তাদের মাধ্যমেই এই জিনিসগুলো স্থায়ী করতে হয়। এ রকমও আছে যে, লোকবলের অভাবে আমরা পকেটের পয়সা দিয়েও স্টাফ নিয়োগ দিয়েছি। অথচ এটা সরকারের দেওয়ার কথা। বারবার বলা হয়, সরকার সব জানে। প্রতি মাসে রিপোর্ট পাঠানো হয়। এখানে নির্ধারিত কর্মী না থাকায় বহিরাগতরা কলেজের পুকুর থেকে মাছ ধরার সুযোগ পায়।

হলের পানিতে পোকা

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলগুলোর পানিতে সবসময় পোকা পাওয়া যায়। তাদের খেদোক্তি, সবমিলিয়ে শেবাচিমে এখন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকাই যেন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পানিতে পোকা পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সহকারী হল প্রভোস্ট বলেন, ‘আমি যখন গত বছর দায়িত্বে আসি, তখন আমরা সব পাইপ পরিবর্তন করে ট্যাংকি সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওপর থেকে ট্যাংকিতে পাতা পড়ে। কারণ ওখানে যে ঢাকনা দেওয়া হয়, সেগুলো চুরি হয়ে যায়। ঘুরেফিরে ওই নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গই সব কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত। একজন স্থায়ী স্টাফ যেভাবে দায়িত্ব পালন করবে, একজন ডেইলি বেসিসের স্টাফ ওইভাবে দায়িত্ব পালন করবে না।‘

‘শুধু শেবাচিম ক্যাম্পাস না, সব মেডিকেলের ক্যাম্পাসে এই অবস্থা। কোনো নিরাপত্তা নেই, বহিরাগতরা সবসময় আসে এখানে, হলের ভিতরে আড্ডা দেয়। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থাকে, ক্লাস থাকে, সবসময় খেয়াল রাখতে পারে না। এ রকম গেট যদি সবসময় খোলা থাকে, গেটম্যান ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে এই ধরনের আরও অনেক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মারাত্মক কিছু ঘটতে পারে’—আশঙ্কা সহকারী হল প্রভোস্টের।

শেবাচিম অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন বাবলু ও উপাধ্যক্ষ ডা. মুজিবুর রহমান দেশের বাইরে থাকায় ক্যাম্পাসের সমস্যা ও সমাধান বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত