২০ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৪৪ পিএম
এনডিএফের বৈজ্ঞানিক সেমিনারে বক্তারা

ডেঙ্গু এখন মৌসুমি রোগ নয়, নিয়ন্ত্রণে জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ

ডেঙ্গু এখন মৌসুমি রোগ নয়, নিয়ন্ত্রণে জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের আয়োজনে ডেঙ্গু জ্বর বিষয়ক সচেতনতামূলক সায়েন্টিফিক সেমিনার। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি রোগ নয়, এটি দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, গুজব ও অপচিকিৎসা পরিহার করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি এটি নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। সর্বোপরি সময়মতো চিকিৎসা, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং সমন্বিত সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গুর বিস্তার ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

আজ সোমবার (২০ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনের আব্দুস সালাম হলে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) আয়োজিত ‘ডেঙ্গু জ্বর বিষয়ক সচেতনতামূলক সায়েন্টিফিক সেমিনারে’ বক্তারা এসব কথা বলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, প্রতিবছর ডেঙ্গুর কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। 

বিষয়টি ব্যাখা করে তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু এবং এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও সরকারি এই পরিসংখ্যান প্রকৃত চিত্রের সামান্য অংশ মাত্র। দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ এখনো অনিবন্ধিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন, যাদের তথ্য সরকারি রেকর্ডে যুক্ত হয় না।

ডেঙ্গুর ক্ষয়ক্ষতি শুধু চিকিৎসার খরচেই সীমাবদ্ধ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন। এর ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার ক্ষতি হয় এবং কর্মক্ষম মানুষ দীর্ঘ সময় কাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্যে যোগ দিতে পারেন না, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তিনি আরও বলেন, ‘ম্যালেরিয়ার বাহক এনোফিলিস মশা রাতে কামড়ায়, তাই মশারি কার্যকর প্রতিরোধ হতে পারে। কিন্তু ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। ফলে শুধু মশারির ওপর নির্ভর করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং লার্ভা নিধনেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’

স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গে ডা. ফরিদ উল্লেখ করেন, গত বছর স্বাস্থ্য খাতের ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকাই ফেরত গেছে। সমস্যাটি মূলত সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের। এই সমন্বয়হীনতা দূর করতে তিনি অবিলম্বে সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটি কার্যকর করার ওপর জোর দেন, যাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও জোরালো ভূমিকা রাখা যায়।

এডিস মশার লার্ভা অত্যন্ত সহনশীল জানিয়ে ডা. ফরিদ সতর্ক করে বলেন, এটি শুষ্ক অবস্থায় প্রায় এক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। যখনই এটি পানি পায়, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মশায় রূপান্তরিত হয়। তাই মাঝে মাঝে মশা মারার স্প্রে করা বা ছোটখাটো প্রকল্প নেওয়া যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গু নির্মূল করতে হলে এই প্রজনন চক্র বা ‘চেইন অব সাইকেল’ ভাঙতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে তিনি সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটিকে সক্রিয় করার ওপর জোর দেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগম গুজব ও অপচিকিৎসা থেকে বিরত থেকে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। 

তিনি বলেন, ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

একই সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তৎপরতা এবং পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত চিকিৎসা প্রস্তুতিও গ্রহণেরও আহ্বান জানান।

সেমিনারে কি-নোট স্পিকার হিসেবে ডেঙ্গু রোগের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং জটিলতা প্রতিরোধ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর-উল আলম (সোহেল)।

এ ছাড়াও ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি, এডিস মশার জীবনচক্র, রোগের লক্ষণ, সতর্ক সংকেত ও রোগ নির্ণয়সহ বিভিন্ন তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, জ্বর দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা বিলম্বিত চিকিৎসা রোগীর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অনুষ্ঠানে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল ইসলাম মজুমদার বলেন, পিসিআরের মাধ্যমে ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ব্যবহৃত আরটি-পিসিআর মেশিনগুলো বর্তমানে দেশের প্রায় সব সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব মেশিন ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় বা গবেষণায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না।

‘এসব মেশিন ব্যবহার করলে দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের কোন স্ট্রেইন বা সেরোটাইপ বেশি ছড়াচ্ছে, তা সহজেই জানা যেত। বর্তমানে সীমিত পরিসরে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, টাইপ-২ সবচেয়ে বেশি এবং এরপর টাইপ-৩ সেরোটাইপের সংক্রমণ হচ্ছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরীক্ষা হলে প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব হতো’—যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, জটিল বা অস্বাভাবিক উপসর্গের রোগীদের ক্ষেত্রে পিসিআর পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা থেকে আসা কোনো রোগীর জ্বরের পর হঠাৎ স্ট্রোকের মতো অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিলে পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।

কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে অব্যবহৃত পিসিআর মেশিনগুলোকে পুনঃব্যবহারের উপযোগী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু কোভিড নয়, ডেঙ্গুসহ আরও অনেক সংক্রামক রোগ নির্ণয়ে এ প্রযুক্তি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে রোগ নির্ণয় আরও নির্ভুল হবে এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হবে।

এনডিএফের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বিসিএস হেলথ ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মাহবুব ইসলাম মজুমদার এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল্লাহ সাঈদ খান।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তিনি হাসপাতালের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দেন। একই সাথে চিকিৎসকদের সর্বদা জনগণের পাশে থেকে নিরলসভাবে সেবা প্রদানের আহ্বান জানান।

সেমিনারে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষক, স্বাস্থ্য পেশাজীবী, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এমইউ/
মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত