১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:৩৯ পিএম

পটুয়াখালী মেডিকেলে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা: স্মৃতিতে অমলিন রক্তাক্ত ১৬ জুলাই

পটুয়াখালী মেডিকেলে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা: স্মৃতিতে অমলিন রক্তাক্ত ১৬ জুলাই
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা ও সহিংসতার ঢেউ আঁছড়ে পড়ে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজেও। ১৫ জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষার্থীরা। সেই প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর চলে বর্বরোচিত হামলা। নিরস্ত্র মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত ওই হামলা দুই বছর পরও স্মৃতিতে সমান বেদনাদায়ক। পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজে ১৬ জুলাইয়ের সেই অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানান, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনা সারাদেশের মতো পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ও সংহতি প্রকাশের লক্ষ্যে সেদিন রাতেই কলেজের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা আলোচনায় বসেন। সিদ্ধান্ত হয়, অনলাইনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন।

প্রতিবাদ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত

সংশ্লিষ্টদের বর্ণনা মতে, পরদিন ১৬ জুলাই পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রথম দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী মিছিলটি শহরের চৌরাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেও সিনিয়র শিক্ষার্থীদের পরামর্শে নিরাপত্তাজনিত কারণে কর্মসূচি কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। শিক্ষার্থীদের যুক্তি ছিল, যেহেতু নারী শিক্ষার্থীরাও কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম। এই অবস্থায় বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সকালে কয়েকজন শিক্ষার্থী নিউমার্কেটে গিয়ে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেন। সেখানে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাদের দেখা হয়। তারাও একই দিন চৌরাস্তা পর্যন্ত একটি মিছিল আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের তাতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, আপাতত তাদের কর্মসূচি ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

দিনভর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও হামলার খবর আসতে থাকে। আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা পটুয়াখালীতে প্রকাশ্য প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনকে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছিলেন। এরই মধ্যে চৌরাস্তা এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলার খবর পাওয়া যায়, যাতে কয়েকজন আহত হন। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই কর্মসূচি স্থগিত করার পরামর্শ দিলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রতিবাদ সমাবেশ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। নারী শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও অন্যদের উৎসাহিত করে।

বিকেলে আসরের নামাজের পর কলেজ মসজিদে শিক্ষার্থীরা শেষবারের মতো বৈঠক করেন। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে মিছিলের প্রস্তুতি

শিক্ষার্থীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিকেলের দিকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে তারা কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। এ সময় ক্যাম্পাসে কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তির উপস্থিতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে কয়েকজন সাংবাদিককেও দেখা যায়।

রড-হকিস্টিক নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেওয়া শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই মোটরসাইকেল বহরে একদল হামলাকারী কলেজে প্রবেশ করে। প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি মোটরসাইকেলে করে ৬০ থেকে ৭০ জন ব্যক্তি রড ও হকিস্টিক নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকে এলোপাতাড়ি হামলা চালান।

হামলার মুখে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন; কারও মাথা ফেটে যায়, কারও নাক কেটে রক্তপাত হয়। নারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগে আশ্রয় নেন। অন্যদিকে, অনেক শিক্ষার্থী একাডেমিক ভবনের ছাদ ও হোস্টেলে গিয়ে নিরাপত্তা খোঁজেন।

থমথমে ক্যাম্পাস

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কিছু শিক্ষার্থী আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন বলে জানা যায়। তবে এতে হামলাকারীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। হামলাকারীরা হোস্টেলে ঢুকে ভাঙচুর চালায় এবং কিছু সময় অবস্থান করার পর ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শান্ত পরিবেশের মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে রূপ নেয়।

শিক্ষকদের ভূমিকায় অসন্তোষ

সন্ধ্যার পর কলেজের কয়েকজন শিক্ষক হোস্টেলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেন। তবে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতারা ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন না। পরে গভীর রাতে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হোস্টেলে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা হামলার ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, এ ঘটনার সঙ্গে জেলা ছাত্রলীগ জড়িত থাকতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের অনেকেই তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি।

পরদিন কলেজ প্রশাসন শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত ক্যাম্পাস ছেড়ে নিজ নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। শিক্ষার্থীদের ভাষায়, ক্যাম্পাস ত্যাগের সেই যাত্রাও ছিল অনিশ্চয়তা ও শঙ্কায় পরিপূর্ণ।

হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও তদন্তের দাবি

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ের এই ঘটনাটি পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে রয়েছে। হামলার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তখন থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়ে আসছে।

হামলায় আহত পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী মাহথির আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের কয়েকজনকে হোস্টেলে ঢুকে আক্রমণ করে। এক সাথে ৩-৪ জন লাঠি ও হকিস্টিক দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। এপ্রোন ছিড়ে ফেলে। রক্তাক্ত অবস্থায় আমরা যে যেভাবে পারি বিভিন্ন রুমে আশ্রয় নেই। ওরা দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে এবং ভাঙচুর চালায়।’

শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি নয়

সে সময় ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থী উম্মে মুশতারী মাহফুজা আঁখি ভয়াবহতার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেদিন আমাকে সেইফ করতে গিয়ে আমার এক ব্যাচমেট মার খেয়েছিল। জীবনের এই কঠিন সময়গুলো কী করে ভুলে যাওয়া সম্ভব! আমরা যখন ছাত্রলীগ বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে কোনোভাবে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমে আশ্রয় নেই, কিছু করতে না পারার অক্ষমতায় রাগে-ক্ষোভে পুরো শরীর কাঁপছিল আমার। আমার এক জুনিয়র নারী শিক্ষার্থী তখন অনেক কান্না করছিল।’

‘আমি গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করছিলাম, তুমি কি ভয় পাচ্ছ? ভয় পেয়ো না। আল্লাহ ভরসা। ও তখন কান্না করতে করতে আমাকে বলেছিল, আপু আমরা কিছু করতে পারছি না এজন্য কাঁদছি। মনে মনে সেদিন ভাবছিলাম, আমাদের গোটা একটা জীবন কি এভাবেই কোন কিছু করতে না পারার বেদনায় শেষ হয়ে যাবে’—যোগ করেন তিনি।

চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সানোয়ার হোসেন সেই নারকীয় হামলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘দুই বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই দিনের স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনি। আমরা ছিলাম নিরস্ত্র মেডিকেল শিক্ষার্থী, তবুও হামলার শিকার হয়েছিলাম। আমার দুই ভাই আহত হয়েছিলেন, আর তুষার ভাইয়ের মাথা ফেটে রক্তাক্ত হওয়ার সেই দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।’

কিছু স্মৃতি সময় মুছে দিতে পারে না। আজও সেই দিনের কথা মনে পড়লে বুকটা ভার হয়ে আসে। আমার একটাই চাওয়া—শিক্ষাঙ্গনে আর কখনো এমন সহিংসতার পুনরাবৃত্তি না হোক। সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত