১৬ জুন, ২০২৬ ০৭:৪৪ পিএম

এইচআইভি নিরাময়: বৈশ্বিক গবেষণা দলে বাংলাদেশি তরুণ চিকিৎসক সাকিব

এইচআইভি নিরাময়: বৈশ্বিক গবেষণা দলে বাংলাদেশি তরুণ চিকিৎসক সাকিব
এমোরি ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ গবেষণা দলের সদস্য ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিব। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: মেডিকেলে অধ্যয়নের সময়েই স্বপ্ন দেখতেন এইচআইভি নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের জন্য মানবিক ও বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার। সেই স্বপ্নই আজ তাঁকে নিয়ে গেছে বৈশ্বিক গবেষণার ঈর্ষণীয় পর্যায়ে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সাবেক এই ইন্টার্ন চিকিৎসক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ গবেষণা দলের গর্বিত সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি এইচআইভি নিরাময় ও করোনায় আক্রান্ত রোগীদের পরবর্তী জটিলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় সম্পৃক্ত ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিবের গল্প যেন বাংলাদেশি তরুণদের নেতৃত্ব ও গবেষণা সক্ষমতারই প্রতিনিধিত্ব করে।

মাত্র কয়েক মাস আগেও তিনি ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক। আজ তিনি এমোরি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের সংক্রামক রোগ বিভাগে ক্লিনিক্যাল রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর। কাজ করছেন এইচআইভি নিরাময়, চিকিৎসা বৈষম্য এবং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য নিয়ে।

মেডিকেলে পড়ার মাঝেই ২০২৩ সাল থেকে তিনি স্বপ্ন দেখতেন এইচআইভি নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর জন্য বৈষম্যহীন, মানবিক ও বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং এইচআইভি রোগীদের সেবার জন্য দেশে একটি বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। ২০২৬ সালে ধরা দেয় সেই কাঙিক্ষত সুযোগ। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ইন্টার্নশিপের শেষ দিনেই তাঁর হাতে পৌঁছায় আমেরিকা থেকে এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপত্র।

যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিবকে এইচআইভি নিয়ে পরিচালিত বারি-কিউর এবং বারি-সিএনএস বিষয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার নেতৃত্বে দেওয়া হয়।

এসব সাফল্যের বিষয় তুলে ধরে তরুণ গবেষক-সংগঠন ডা. সাকিব মেডিভয়েসকে বলেন, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ এইচআইভিকে দমন করতে পারলেও ভাইরাস সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারে না, কারণ এইচআইভি শরীরের কিছু কোষে লুকিয়ে থেকে যায়। ফলে ওষুধ বন্ধ করলে ভাইরাস আবার সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এইচআইভি শরীরে কোথায় লুকিয়ে থাকে, কীভাবে বছরের পর বছর টিকে থাকে এবং কীভাবে একদিন এটিকে সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হতে পারে—এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন তরুণ চিকিৎসক।

বারিসিটিনিব নামের একটি ওষুধ দিয়ে এই লুকিয়ে থাকা ভাইরাসকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করে এইচআইভির পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন ডা. সাকিব। তাঁর গবেষণার লক্ষ্য হলো, এইচআইভির বিরুদ্ধে এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতির পথ খুঁজে বের করা, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হয়তো আজীবন ওষুধের ওপর নির্ভরশীল না থেকেও ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন। গবেষণাটি সফল হলে এটি এইচআইভির একটি কার্যকর নিরাময়ের দিকে বড় পদক্ষেপ হতে পারে।

গবেষকরা বিশ্বাস করেন, বারি-কিউরের মতো গবেষণাগুলো শুধু এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের জীবনমান উন্নত করবে না, বরং মানবজাতিকে এইচআইভিমুক্ত ভবিষ্যতের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে। একজন বাংলাদেশি তরুণ চিকিৎসক হিসেবে ডা. সাকিব বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এই গবেষণায় কাজ করছেন।

রিকভার স্টাডির লিড কো-অর্ডিনেটর ডা. সাকিব

এইচআইভি গবেষণার পাশাপাশি ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিব বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ কোভিড-১৯ গবেষণা উদ্যোগ রিকভার স্টাডির একজন লিড কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) অর্থায়নে পরিচালিত রিকভার (রিসার্চিং কোভিড টু এনহ্যান্স রিকভারি) প্রকল্পের লক্ষ্য হলো কোভিড-১৯ সংক্রমণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বা ‘লং কোভিড’ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং সংক্রমণের অনেক মাস বা বছর পরও কিছু মানুষের বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভোগার কারণ বের করা। ডা. সাকিব লং কোভিডের ঝুঁকির কারণ, রোগের জৈবিক প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।

সেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা

ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিব বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস’ সোসাইটির (বিএমএসএস) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সংগঠনটিকে দেশের ইতিহাসে অন্যতম সক্রিয় ও প্রভাবশালী মেডিকেল শিক্ষার্থী সংগঠনে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেই লক্ষ্য নিয়ে তিনি ডব্লিউএইচও, ইউএনএফপিএ, ইউনিসেফ, ইউএনএইডস, ইউএনডিপি, ডিজিএইচএস, ডিজিএমই, ডিজিএফপি এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন।

একদিকে কঠোর মেডিকেল পড়াশোনা, ওয়ার্ড, আইটেম, প্রফেশনাল পরীক্ষা এবং ইন্টার্নশিপ; অন্যদিকে প্রতিদিনের মিটিং, প্রকল্প, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি পুরো মেডিকেল জীবন অতিবাহিত করেছেন।

তিনি ইউনেস্কোর ইন্ডিভিজুয়াল স্পেশালিস্ট হিসেবে মাতৃ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জাতীয় গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন, জাতিসংঘের ইয়ুথ অ্যাডভাইজরি গ্রুপের সদস্য ছিলেন এবং জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসেন্ড ফেলো হিসেবে আছেন।

মেডিকেলের পড়াশোনার বাইরে সময় দিলে ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্বেচ্ছাসেবামূলক এসব কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে প্রচলিত এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন সাকিব। 

সংক্রামক রোগ নিয়ে তাঁর কাজ তাই যুক্তরাষ্ট্রে এসে শুরু হয়নি। বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি এইচআইভি, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, মাইগ্রান্ট জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গা শরণার্থী, যৌনকর্মী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করেছেন। এইচআইভি-সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের এআরটি সেন্টার ও ড্রপ-ইন সেন্টার পরিদর্শন, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের মূলধারার মেডিকেল শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

বর্তমানে এইচআইভি কিউর রিসার্চ, লং কোভিড রিসার্চ এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগবিষয়ক গবেষণায় তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে বাংলাদেশের একজন তরুণ চিকিৎসক কীভাবে স্থানীয় পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম থেকে বৈশ্বিক গবেষণার অগ্রভাগে পৌঁছে যেতে পারেন।

বর্তমানে তিনি এমোরি ইউনিভার্সিটি, আটলান্টা ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স মেডিকেল সেন্টার, এমোরি হসপিটাল এবং গ্রেডি হসপিটালের গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। মাত্র ২৫ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ গবেষণা দলে যুক্ত হতে পারা ডা. সাকিবের কাছে এখনও স্বপ্নের মতো। কারণ এইচআইভি গবেষণার ক্ষেত্রে এমোরি ইউনিভার্সিটি বিশ্বব্যাপী অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। গত চার দশকে এইচআইভি চিকিৎসা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি এবং এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ক্ষেত্রে যেসব বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হয়েছে, তার নব্বই শতাংশে এমোরির গবেষকদের প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে।

আটলান্টার গ্রেডি হসপিটাল যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম এইচআইভি সেবা কেন্দ্রগুলোর একটি, যেখানে হাজার হাজার এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির গবেষণা পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে আটলান্টা ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স মেডিকেল সেন্টার যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল, যেখানে দেশের সাবেক সামরিক সদস্যদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা পরিচালিত হয়।

ডা. ইফতেখার আহমেদ সাকিব প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ইয়াং রিসার্চার্স অন ইনফেকশাস ডিজিজেস’ প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে দেশের প্রায় ২০০ মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গবেষণার হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং বাস্তব গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘একসময় এইচআইভি মানেই ছিল ভয়। আমি স্বপ্ন দেখি আগামী ৩০ বছরে এইচআইভি হয়তো গুটিবসন্তের মতো অতীতের একটি আতঙ্ক হয়ে যাবে।’

আজ যখন তিনি আটলান্টার গবেষণাগারে বসে এইচআইভি নিয়ে কাজ করেন, তখনও তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ রয়ে গেছে বাংলাদেশ। তাঁর বিশ্বাস—‘হিউম্যানিটি শুড প্রিভেইল, অ্যান্ড রিসার্চ ইজ দ্য অনলি ওয়ে টু সেভ হিউম্যানিটি।’ হয়তো এ কারণেই একজন তরুণ বাংলাদেশি চিকিৎসকের গল্প আজ হাজারো শিক্ষার্থীকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলনে আহ্বান

হাসপাতালে শয্যার সঙ্গে জনবল, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে

হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলনে আহ্বান

হাসপাতালে শয্যার সঙ্গে জনবল, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নম্বরের কথা চিন্তা করে পড়াশোনা করিনি: ডা. জেসি হক
এমআরসিপিতে বিশ্বসেরা বাংলাদেশি চিকিৎসক

নম্বরের কথা চিন্তা করে পড়াশোনা করিনি: ডা. জেসি হক