তৃতীয় দিনের মতো কর্মবিরতিতে সোহরাওয়ার্দীর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: হোস্টেল ফেরতের দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো কর্মবিরতিতে রয়েছেন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এতে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় যেমন গতিহীনতা নেমে এসেছে, তেমনি সেবায় যুক্ত হতে না পেরে একদিকে বিষন্ন অন্যদিকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নবীন চিকিৎসকরা।
আজ মঙ্গলবার (৫ মে) মিটিং হলেও সমস্যা সমাধানে অগ্রগতির কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জানা গেছে, আজ দুপুরে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আঈনুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে হলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি মিটিং হয়। অধ্যক্ষের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হাসপাতালের পরিচালক ডা. সিহাব উদ্দিনসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জানতে চাইলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সমন্বয়ক ডা. মো. ফজলে এলাহি তরুণ চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘একটি হাসপাতাল শুধু জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের দ্বারা পরিচালিত হয় না। সেখানে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, জুনিয়র কনসালটেন্ট, সিনিয়র কনসালটেন্ট, আইএমও, ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার, রেজিস্ট্রার, এফসিপিএস ট্রেইনি, ইন্টার্ন চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয় ও আয়া—সবাই সম্মিলিতভাবে সেবায় যুক্ত থাকেন।
হাসপাতালে একটা ইউনিটের অনেকগুলো কাজ থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে রোগী ভর্তি ও ভর্তি পরবর্তী প্রক্রিয়ায় এগুলোতে সবচেয়ে কষ্টসাধ্য কাজ। এগুলোতে সাধারণত ইন্টার্ন চিকিৎসকরা চিকিৎসকদের সহযোগীর ভূমিকা পালন করেন। একজন চিকিৎসক নিজের নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের পর রোগীর প্রাথমিক ব্যবস্থাপনাও তাকে করতে হয়। এতে একদিকে তার কাজের চাপ বেড়ে যায়, অন্যদিকে কাজে যথাযথ মনোযোগ দিতে পারেন না। এ কারণে তাদের প্রাপ্য থেকে রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। একই চিত্র ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি, বহির্বিভাগেও। এসব কাজে প্রতিটি বিভাগে ইন্টার্ন চিকিৎকরা প্রত্যক্ষ ও নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা রাখেন। প্রাথমিক কাজগুলো করেন। তারা না থাকলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকদের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যায়।’
সেবার বাইরে থাকা সুখকর কিছু নয়
‘এই অবস্থায় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা না থাকলে হাসপাতালের সেবা ২০-৩০ ভাগ কমে যায়। অথচ আমরা সেবায় যুক্ত থাকতে চাই। রোগীগুলো কষ্ট করছে, এটা আমাদের জন্য সুখকর না, প্রশান্তির না। আমরা মূলত ডাক্তারি পড়তে এসেছি মানুষের সেবা করতে। কাজ থেকে বিরতি দিয়ে আমরা অন্য চিকিৎসক ও রোগীর ক্ষতি করতে চাই না। মানব সেবা আমাদের ধ্যানে-জ্ঞানে, এটা নেশায় পরিণত হয়েছে। আমাদের দ্বারা কেউ উপকৃত হতে পারতো, কিন্তু তা হচ্ছে না—এটা ভাবতে গিয়ে খারাপ লাগছে। পাশাপাশি এটা আমাদের শিক্ষার জায়গা, ইন্টার্নশিপের নির্দিষ্ট মেয়াদ থেকে কিছু সময় চলে যাওয়া আমাদের জন্য বিশাল ক্ষতির’—বলেন ডা. তরুণ চৌধুরী।
প্রসঙ্গত, ইন্টার্ন হোস্টেলে আবাসন সংকট ও নারী ইন্টার্নদের নিরাপত্তার দাবিতে গত ৩ মে থেকে কর্মবিরতিতে রয়েছেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
তারা বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন হোস্টেলে সামরিক বাহিনী প্রায় দুই বছর যাবৎ অবস্থানরত। এ কারণে বর্তমানে ইন্টার্নসহ সকল শিক্ষার্থীদের জন্য তীব্র আবাসন সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা আমাদের স্বাভাবিক ও নিরাপদ বসবাসকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হয়েছে বাধাগ্রস্ত।’
তারা বলেন, ‘একাধিকবার হাসপাতাল প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্বের সাথে আলোচনার পরও অদ্যাবধি কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।’
দ্রুততম সময়ে হোস্টেল দখলমুক্ত করে শিক্ষার্থীদের অনুকূলে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
একই দাবিতে সোমবার (৪ মে) মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি দিয়েছেন তারা। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলা হয়, ‘অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে বলতে হচ্ছে আমাদের ইন্টার্ন হোস্টেল বর্তমানে সামরিক ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, ফলে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জন্য কোনো আবাসন ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই। আমরা কার্যত বাসস্থানহীন অবস্থায় পড়েছি।’
এতে আরও বলা হয়, ‘দীর্ঘদিন ধরেই আমরা আবাসন সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করে আসছি। এই অবস্থায় আমাদের পেশাগত দায়িত্ব মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিরাপদ আবাসনের অভাবে আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি, যা সরাসরি রোগীসেবার মানকে প্রভাবিত করছে। একজন ক্লান্ত ও উদ্বিগ্ন ইন্টার্ন চিকিৎসকের পক্ষে সঠিক ও মনোযোগী চিকিৎসা প্রদান করা কতটা কঠিন তা অনুধাবন করা কঠিন। ফলে এই সংকট কেবল আমাদের ব্যক্তিগত সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি হাসপাতালের সামগ্রিক সেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তার সাথেও জড়িত।’
এমইউ/