পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে
এইচআইভিতে এক বছরে ২৫৪ জনের মৃত্যু, ৪১ জেলায় নেই পরীক্ষার সুযোগ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আর শনাক্ত রোগীদের প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দেশে বিশেষ করে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এটি এখন রোগ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে আয়োজিত কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশনের (এএইচএফ) সহযোগিতায় কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টাস ফোরাম (বিএইচআরএফ)।
কর্মশালায় বলা হয়, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর ১০, ২০, ১০০ বা ২০০ জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯১ জনে। আক্রান্তদের বেশিরভাগ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের বাসিন্দা।
এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে প্রথম এক রোগী মারা যায় ২০০০ সালে। ২০২৫ সালে একই রোগে মৃতের সংখ্যা ২৫৪, যা আগের বছর থেকে কিছু কম।
এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল ০.৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে বলে কর্মশালায় জানানো হয়।
কর্মশালায় এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
বিএইচআরএফ সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্বে কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিড শুভ। বিশেষ অতিথি ও মূল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী।
বাংলাদেশের এইডস পরিস্থিতি সংকট ও উত্তরণ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএইচএফ’র কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী। এছাড়া এইডস রিপোর্টিং, চ্যালেজ্ঞ ও সমাধান নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কালবেলার স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি।
কর্মশালায় আকতার জাহান শিল্পী জানান, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ১৭ হাজার ৪৮০। এরমধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩ জন । সংক্রমণের হার .০১ শতাংশ। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। যা মোট শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।
তিনি জানান, আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এছাড়া প্রবাসী ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ১১ শতাংশ, শিরায় মাদকগ্রহণকারী ৬ শতাংশ, নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া ১ শতাংশ করে। এছাড়া ২২ শতাংশ অন্যান্য মানুষ।
আকতার জাহান শিল্পী বলেন, আক্রান্তদের বয়স ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষনে দেখা গেছে ৬২.৬১ শতাংশ ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১.০৫ শতাংশ। ১০-১৪ বছর বয়সী ০.৬৯ শতাংশ। ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ১. ৯৬ শতাংশ।
কালবেলার স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, দেশে এইডসের ক্ষেত্রে এক সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল শিরায় মাদকগ্রহণকারী, প্রবাসী শ্রমিক, নারী যৌনকর্মী, পুরুষ যৌনকর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ।
২০২০ সালের পর থেকে দেখা গেছে, সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের হার বাড়তে শুরু করে এখন সবচেয়ে ঝুকিপূর্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসেছি। দ্বিতীয় সবোর্চ্চ হলো প্রবাসী শ্রমিক। এইচআইভি এইডস নিয়ন্ত্রণে আমাদের বিদেশ থেকে ফেরার সময় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, 'ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে আক্রমণ বা স্টিগমা করা হলে তারা চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যায়। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
তিনি বলেন, ‘স্টিগমা ও বৈষম্য মানুষকে আন্ডারগ্রাউন্ডে ঠেলে দেয়, ফলে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পান।'
তিনি বলেন, কোনো রোগীকে তার রোগের কারণে চিহ্নিত বা 'ট্যাগিং' করা হলো স্টিগমা। কোনো ব্যক্তিকে তার অসুস্থতার (এইচআইভি বা হেপাটাইটিস বি) কারণে রাজনৈতিক অধিকার বা চাকরি থেকে বঞ্চিত করা বা ছাঁটাই করা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বৈষম্যের অন্তর্ভুক্ত।
এখন এইচআইভির পরিণতি আর নিশ্চিত মৃত্যু নয় উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ১৯৮৪ সালে শনাক্ত হওয়া রোগীও এখন সুস্থভাবে বেঁচে আছেন। সঠিক চিকিৎসায় এটি এখন ডায়াবেটিসের মতোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বর্তমানে এমন ইনজেকশনও বের হয়েছে, যা বছরে একবার নিলেই সারা বছর ভালো থাকা যায়।
এমইউ/