১২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৫৩ এএম

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অধিক হারে আত্মহত্যার প্রবণতায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্বেগ

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অধিক হারে আত্মহত্যার প্রবণতায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্বেগ
বিপিএমসিএর বার্ষিক সাধারণ সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অধিক হারে আত্মহত্যা প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সরকার স্বাস্থ্য শিক্ষার আধুনিকায়নের উপায় খুঁজছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন চাপমুক্ত থেকে ভালো শিক্ষা পায় সেটা নিশ্চিত করা হবে।

শনিবার (১১ এপ্রিল) রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন ক্রাউন প্লাজা হোটেলে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোশিয়েশনের (বিপিএমসিএ) বার্ষিক সাধারণ সভা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য শিক্ষার আধুনিকায়নের উপায় খুঁজছি। শিক্ষার্থীরা যেন ভালো শিক্ষা পায়, কিন্তু অতিরিক্ত চাপ অনুভব না করে সেটাও নিশ্চিত করা হবে।’ একই সঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সেবার বিকাশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবদানের স্বীকার করে চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এ সময় শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারির অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের প্রত্যাশা আপনারা আপনাদের দায়িত্ব মানবিকতা ও সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার সাথে পালন করবেন। রোগীরা ডাক্তারকে সৃষ্টিকর্তার পরে সবচেয়ে বেশি আস্থার স্থানে থাকেন। তাই মেডিকেল এথিকসকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

বক্তব্যে সিলেটে এক চিকিৎসকের ‘অবহেলার’ উদাহরণ তুলে ধরে সেই ঘটনার দ্রুত তদন্তের কথা জনান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় মঞ্চের পাশ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলা হলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কতজনকে শাস্তি দেবো? আমাদের তো চিকিৎসক প্রয়োজন।’

করোনা মহামারীতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত ও পরবর্তীতে মেয়াদ শেষ হওয়া ১০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ইউনিটগুলো আগামী সপ্তাহ থেকে পুনরায় চালু করার কথা জানান সরদার সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, ‘করোনাকালে বেশকিছু জেলায় ১০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ইউনিট চালু করা হয়েছিল। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা বন্ধ হয়ে যায়। আমরা আগামী সপ্তাহ থেকে এটি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

স্বাস্থ্যশিক্ষায় লোনের দাবি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের নানা দেশে এই ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা এ বিষয়ে ইতিবাচক, কিন্তু আমাদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। একইসঙ্গে রিকোভারির বিষয়টিও ভাবতে হবে। আমি এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলবো।’

এদিকে সম্প্রতি মানবিক চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলামের সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস (সিকেডি) হাসপাতালে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কিছু জানেন না বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে অপরাধী যে দলেরই হোক শাস্তি দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আপনারা বি-মাতাসুলভ আচরণের কথা বলেছেন। অতীতে হয়তো তা হতে পারে। তবে বর্তমান সময়ে তা হচ্ছে না বলে আমি আশ্বস্ত করছি। আপনাদের বড় অভিযোগ যে শিক্ষার্থী পাচ্ছেন না, সিট খালি থাকছে। আমরা একাধিক রাউন্ডের মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করেছি। এরপরেও যদি কোনো মেডিকেলে সিট খালি থাকে তাহলে তা সিস্টেম নয়, ওই প্রতিষ্ঠানের সমস্যা।’

অধ্যাপক নাজমুল হোসেন বলেন, অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগী নেই, যা দিয়ে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতে পারে। রোগী না দেখে কেউ ডাক্তার হলে সেটা সরকারি কিংবা বেসরকারি যাই হোক, এটা সবার জন্য বিপজ্জনক।

তিনি বলেন, গ্রামীণ জনপদে চিকিৎসা দেওয়ার অভিজ্ঞতা তৈরির জন্য সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচটি সেন্টার স্থাপিত হবে, যেখানে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা আরএফএসটি ট্রেনিং এবং ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের ১৫ দিনের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ গ্রামীণ অবকাঠামোতে নিতে পারবে। এ সুযোগ সরকারি-বেসরকারি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

স্বাস্থ্য শিক্ষার মহাপরিচালক বলেন, ‘পিপিপির আওতায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে রোগীর সংকট সমাধানে কাজ করছি। আমরা চাই, কোনো শিক্ষার্থী যেন রোগী না দেখে পাস না করে।’

এ সময় তিনি ভালো চিকিৎসক তৈরিতে নেওয়া নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘বিদেশি শিক্ষার্থীরা যেন আসে, সেজন্য আমরা মালয়েশিয়া গিয়েছি। এ ছাড়া অন্য দেশগুলো থেকে যেন শিক্ষার্থী পান সেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

অনুষ্ঠানের আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘এটা সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হলেও অভিযোগের কথাই বেশি শুনছি। আমি বলবো আপনাদের নতুন কমিটি হয়েছে, আজকে উদযাপন করুন।’

অনুষ্ঠানে দেশের স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর নানা অবদান তুলে ধরা হয়। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোশিয়েশনের নেতারা বলেন, ১৯৮৫ সালে ঢাকার ধানমণ্ডিতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ দিয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয়। তখন সরকারি খাতে মেডিকেল কলেজ ছিল ৮টি। বর্তমানে দেশে ১১৪টি মেডিকেল কলেজে আসন সংখ্যা ১১ হাজার ৮৮৩। এর মাঝে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন ৫ হাজার ১০০টি; আর ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন সংখ্যা ৬ হাজার ৩০৮টি এবং সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত ৮টি মেডিকেল কলেজে আসন ৪৭৫টি। মেডিকেল কলেজের সংখ্যায় বেসরকারি খাত ৬১ শতাংশ হলে আসন বিচারে ৫৩ শতাংশ।

বিপিএমসিএর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ৫ শতাংশ আসন মেধাবী-অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। সে হিসাবে প্রতি বছর বেসরকারিতে ৩১৫ জন শিক্ষার্থী সরকারি মেডিকেল কলেজের মতো খরচে ডাক্তার হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারেন ৪৫ শতাংশ। সে হিসাবে দুই হাজার ৮৩৯ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন। প্রত্যেক বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনায় গড়ে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় করলে প্রতি বছর এখাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ১১ কোটি ৩৫ লক্ষ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। মার্কিন ডলার ১২৩ টাকার সমান ধরলে টাকার অংকে প্রতি বছর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এক হাজার ৩৯৬ কোটি ৭৮ লক্ষ ৮০ হাজার। এর বাইরে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর ৬ বছর বাংলাদেশে অবস্থানকালে যে খরচ তা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন ২০২২ অনুযায়ী বেসরকারি মেডিকেলসমূহে দরিদ্র জনগণের জন্য সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় ন্যূনতম ১০ শতাংশ শয্যা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ ও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসায় ব্যবস্থা রয়েছে। একই আইন অনুযায়ী প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য ন্যূনতম ৫টি হাসপাতাল শয্যা আবশ্যক। সে হিসাবে ছয় হাজার ৩০৮ আসনের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে শয্যা রয়েছে ৩১ হাজার ৫৪০টি। এর মাঝে তিন হাজার ১৫৪টি শয্যায় সম্পূর্ণ বিনা খরচে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো প্রত্যাশিত সরকারি সহযোগিতা পাচ্ছে না, বরং নানামুখী বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

স্বাগত বক্তব্যে বিপিএমসিএর সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেন, অটোমেশনের নামে প্রতি পদক্ষেপে বেসরকারি মেডিকেলে প্রশাসনযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ চলছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা গত বছরের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলেও ৪ মাসেও ভর্তি শেষ হয়নি। কবে ক্লাস শুরু হবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই! শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন নষ্টের এমন উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে আগে ভর্তি করা হয়, পাশাপাশি চলে সশস্ত্র বাহিনীর মেডিকেল কলেজসমূহে ভর্তি। সব শেষে যারা রয়ে যায় তাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ভর্তির দ্বার। সেটিও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ করে। উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমানের পাস করা শিক্ষার্থীদের সামনে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষিসহ মেডিকেলে ভর্তির নানাবিধ সুযোগ। তাই মেডিকেলে ভর্তিতে সময়ক্ষেপণ করলে পরে মেডিকেলের জন্য শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।

আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজসমূহের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুহাম্মাদ আব্দুস সবুর বলেন, শুধুমাত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণীত আইন বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বেসরকারি মেডিকেলের মালিকরা বলছেন, ভর্তি প্রক্রিয়ায় অটোমেশন ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে, ফলে ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কয়েক মাস পরও শিক্ষার্থীদের ভর্তি শেষ হয় না এবং ক্লাস শুরুর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সরকারি ও সশস্ত্র বাহিনীর মেডিকেলে আগে ভর্তি সম্পন্ন করে শেষে বেসরকারি কলেজে সুযোগ দেওয়ায় অনেক আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা অন্যখাতে চলে যাচ্ছে এবং প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন খালি থাকছে, যা ভবিষ্যৎ চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ।

বিপিএমসিএর সভাপতি ডা. শেখ মহিউদ্দিনের সভাপতি অনুষ্ঠিনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এই সভার সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাবেক সভাপতি এম এম মবিন খান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. হুমায়ুন কবির তালুকদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. নাদিম আহম্মদ, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী প্রমুখ।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত