ডা. মো. আরমান হোসেন রনি
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৫৮ এএম
হামে অন্ধত্বসহ চোখের যেসব ক্ষতি হতে পারে, সুরক্ষার উপায়
হাম (মিজলস) কেবল একটি সাধারণ জ্বর বা ত্বকের র্যাশ নয়, বরং এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ধ্বংস করে দেয় এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জটিলতা সৃষ্টি করে। হামের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর একটি হলো চোখের ক্ষতি। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে হামের কারণে একজন মানুষ চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে পারেন।
হাম যেভাবে চোখের ক্ষতি করে
হাম ভাইরাস সরাসরি চোখের টিস্যুকে আক্রমণ করতে পারে অথবা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে অন্যান্য সংক্রমণের পথ প্রশস্ত করে দেয়। মূলত তিনটি উপায়ে হাম চোখের ক্ষতি করে, যথা—
ভিটামিন-এ এর অভাব
হাম হলে শরীরে সঞ্চিত ভিটামিন-এ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। চোখের কর্নিয়ার সুস্থতার জন্য ভিটামিন-এ অপরিহার্য। এর অভাবে কর্নিয়া শুকিয়ে যায় এবং অন্ধত্ব দেখা দেয়।
সরাসরি ভাইরাল আক্রমণ
হামের ভাইরাস সরাসরি চোখের সামনের স্বচ্ছ অংশ বা কর্নিয়া এবং কনজাংটিভাতে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন
হামের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় চোখ সহজে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়, যা চোখের গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
হামের কারণে চোখের সম্ভাব্য জটিলতা
হামের কারণে চোখে সাধারণ অস্বস্তি থেকে শুরু করে স্থায়ী অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। প্রধান জটিলতাগুলো হলো—
কনজাংটিভাইটিস
হামের শুরুর দিকে প্রায় সব রোগীরই চোখ লাল হয়ে যায়, চোখ দিয়ে জল পড়ে এবং আলোতে তাকালে অস্বস্তি হয়। একে সাধারণত ‘চোখ ওঠা’ বলা হয়।
কর্নিয়াল আলসার বা ক্ষত
যদি হামের সময় চোখের সঠিক যত্ন নেওয়া না হয়, তবে কর্নিয়াতে ঘা বা আলসার হতে পারে। এটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক এবং সময় মতো চিকিৎসা না করলে কর্নিয়া ফুটো হয়ে যেতে পারে।
জেরোপথালমিয়া
ভিটামিন-এ এর তীব্র অভাবে চোখ শুকিয়ে যাওয়ার এই অবস্থাকে জেরোপথালমিয়া বলে। এর প্রাথমিক লক্ষণ হলো রাতকানা রোগ। পরবর্তীতে এটি চোখের কর্নিয়াকে গলিয়ে ফেলে (কেরাটোম্যালাসিয়া), যা থেকে স্থায়ী অন্ধত্ব ঘটে।
অন্ধত্ব
হামের পর কর্নিয়াতে যে দাগ পড়ে, তা যদি চোখের মণির ঠিক মাঝখানে হয়, তবে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যায় বা পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
হাম হলে চোখের সুরক্ষায় যা করণীয়
হাম আক্রান্ত শিশুর বা ব্যক্তির চোখের যত্ন নিতে নিচের পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত জরুরি, যথা—
ভিটামিন-এ ক্যাপসুল গ্রহণ
হাম শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, হাম আক্রান্ত শিশুদের দুই দিনে দুটি ডোজ দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটি কর্নিয়ার ক্ষতি রোধে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
চোখ পরিষ্কার রাখা
পরিষ্কার তুলা বা নরম সুতি কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে আলতো করে চোখের কোণ এবং পুঁজ পরিষ্কার করতে হবে। একই তুলা বা কাপড় দিয়ে বারবার দুই চোখ মোছা যাবে না; প্রতিবার পরিষ্কার অংশ ব্যবহার করতে হবে।
পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা
শিশুকে প্রচুর পরিমাণে বুকের দুধ (যদি শিশু ছোট হয়), ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: গাজর, মিষ্টি কুমড়া, ছোট মাছ, পালং শাক) এবং প্রচুর তরল খাবার দিতে হবে।
আলোর তীব্রতা কমানো
হামের সময় চোখ আলোর প্রতি সংবেদনশীল থাকে। তাই রোগীকে অন্ধকার বা মৃদু আলোর ঘরে রাখা ভালো। এতে চোখের ওপর চাপ কম পড়ে।
চিকিৎসকের পরামর্শে আই ড্রপ
চোখে সংক্রমণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক আই ড্রপ বা অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করতে হবে। নিজে নিজে কোনো স্টেরয়েড জাতীয় ড্রপ ব্যবহার করা যাবে না, এতে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
যা করা যাবে না (সতর্কতা)
ক. চোখ চুলকালে বা অস্বস্তি হলে হাত দিয়ে রগড়ানো যাবে না, এতে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খ. অপরিষ্কার হাতে চোখ স্পর্শ করা যাবে না এবং
গ. চোখে গোলাপ জল, দুধ, মধু বা কোনো গাছপালার রস দেওয়া যাবে না। এগুলো সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগু ণ বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ উপায়: এমআর টিকা
হাম ও হামজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধের একমাত্র স্থায়ী উপায় হলো টিকাদান। শিশুদের ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা দিতে হবে। এই টিকা হামের ঝুঁকি ৯৫% কমিয়ে দেয়।
মনে রাখবেন, হামের কারণে হওয়া অন্ধত্ব একটি ট্র্যাজেডি, কারণ এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। সামান্য সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ও টিকা গ্রহণের মাধ্যমে আমরা শিশুদের এই ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারি। যদি হাম আক্রান্ত রোগীর চোখে অতিরিক্ত লাল ভাব, অস্বস্তি বা দেখতে সমস্যা হয়, তবে দেরি না করে নিকটস্থ চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা সরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করা উচিত।
এমইউ/