রোহিঙ্গা শিশুদের স্বাস্থ্য-শিক্ষায় জাপান ও ইউনিসেফের ১৪ লাখ ডলার সহায়তা চুক্তি
মেডিভয়েস নিউজ : বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসান চরের ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও তাদের পরিবারগুলোকে জীবন রক্ষায় ১৪ লাখ ডলার সহায়তা দেওয়ার জন্য জাপান সরকার ও ইউনিসেফের যৌথ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সোমবার (২ মার্চ) বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এবং ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
১৪ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার যৌথ এ চু্ক্তিতে ৩৬ হাজারের অধিক শিশুসহ ৫৬ হাজার ৫০০এর বেশি সংখ্যক শরণার্থীকে জরুরি সেবা দেওয়া যাবে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষায় জরুরি সেবাসমূহ; পানি, স্যানিটেশন (পয়ঃনিশকাশন) ও হাইজিন (স্বাস্থ্যবিধি)-(ওয়াশ); পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্তসেবা।
নবম বছর শুরু হতে চলা রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট এখনও বিশ্বের বৃহত্তম ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটগুলোর একটি। অতিরিক্ত জনঘনত্বপূর্ণ পরিবেশ, রোগের প্রাদুর্ভাব, অপুষ্টি এবং শিক্ষার সীমিতসুযোগ শিশুদের গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলছে। শিশুরা যতদিন না নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে, ততদিন শিবিরগুলোকে তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে রাখতে চায় জাপান সরকার ও ইউনিসেফ। স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, বিশুদ্ধ পানি এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, শুধু শিশুদের বেঁচে থাকা ও বিকাশের জন্যই নয়, বরং রোহিঙ্গা সংস্কৃতি ও পরিচয় সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি আশা প্রকাশ করেন বলেন, জাপান সরকারের এই সহায়তা রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী (হোস্ট কমিউনিটি) উভয়ের জন্য বসবাসের পরিবেশের উন্নয়ন করবে।
সাইদা শিনিচি বলেন, ‘ইউনিসেফের সঙ্গে জাপানের নতুন চুক্তির ঘোষণা দিতে পেরে আমি সন্তোষবোধ করছি, বিশেষ করে বৈশ্বিক তহবিল কমার এই সময়ে। এই সহায়তা দিয়ে জরুরি সেবা যেমন শিক্ষা, ওয়াশ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হবে। এটা ইউনিসেফের সঙ্গে জাপানের দীর্ঘ দিনের অংশীদারত্ব এবং মানবিক নিরাপত্তার প্রতি আমাদের বলিষ্ঠ অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। আমরা বিশ্বাসকরি, এই বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে তাদের অভিঘাত সহনশীলতাকে বৃদ্ধি ও মর্যাদাকে বলিষ্ঠ রাখবে এবং এই প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা প্রদানের প্রচেষ্টায় জাপান অবিচল অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রতিটি দিন রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য নতুন নতুন ঝুঁকি নিয়ে আসে-এর মধ্যে রোগ-ব্যাধি ও অপুষ্টি থেকে শুরু করে শিক্ষাগ্রহণ থেকে বাদ পড়ার মতো ঝুঁকি রয়েছে। এই শিশুরা তাদের শৈশব হারিয়ে ফেলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাপান সরকারের সহায়তা শিশুদের সুস্থ ও শিক্ষার সাথে যুক্ত রাখতে সহায়তা করবে, দক্ষতা উন্নয়নের বাস্তবমুখী পথ তৈরি করবে এবং পরিবারগুলোকে তাদের ছোট শিশুদের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উপকরণ সরবরাহে সহযোগিতা করবে। সম্পদ ও তহবিল কমে আসার এই সময়ে এবং যখন একটি পুরো সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে, তখন এই অংশীদারত্ব শিশুদের বেঁচে থাকা, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।’
এছাড়া অংশীদারত্বের আওতায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবা জোরদার করা হবে, যা কলেরা, ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আওতায় পরিবারগুলোকে সাবান ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি উপকরণ সরবরাহ করা হবে, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জেন্ডারসমতা নিশ্চিতে সহায়তা করবে। এটা জাপান ও ইউনিসেফ উভয়ের অভিন্ন অগ্রাধিকারে রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পক্ষে জাপানের জোরালো অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইউনিসেফ শিশুদের অপুষ্টি প্রতিরোধ ও এর চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ করবে এবং মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করবে। এর মধ্যে ভাসান চরে নিউবর্ন স্ট্যাবিলাইজেশন ইউনিট এবং কক্সবাজারের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সেবা প্রদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
জাপান ও বাংলাদেশে ইউনিসেফের এই অংশীদারিত্বের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা জরুরি পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে জাপান সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থী মানবিক সহায়তার জন্য জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ ও বাংলাদেশের এনজিওগুলোকে ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (২৫ কোটি ডলার) দিয়েছে এবং ইউনিসেফের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের পরিবারের সহায়তায় প্রায় ৪৭ মিলিয়ন (চার কোটি ৭০ লাখ) মার্কিন ডলার দিয়েছে। ইউনিসেফ, জাপানের এই সহায়তার যথাযথ দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা, কার্যকর ও স্বচ্ছ কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিশুদের জন্য জাপানের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ রয়েছে।
এমআই/