ডা. রেজওয়ানুল ইসলাম মাকসুদ

ডা. রেজওয়ানুল ইসলাম মাকসুদ

মেডিকেল অফিসার (ইনডোর), 
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বোরহানউদ্দিন, ভোলা


১০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ পিএম

অসহায়ত্বে মোড়ানো জীবন: একজন চিকিৎসকের অনুক্ত লড়াইয়ের গল্প

অসহায়ত্বে মোড়ানো জীবন: একজন চিকিৎসকের অনুক্ত লড়াইয়ের গল্প
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ রোগী। ছবি: মেডিভয়েস

শীতকাল চলে এসেছে, ফলে গত শীতের বার্ডের স্মৃতিগুলা বারবার ফিরে আসবে—এটাই স্বাভাবিক।

তো একদিন একটা ক্লাসে এক ম‍্যাডাম জানতে চাইলেন, আপনাদের জব সেটিসফেকশন কেমন? বিভিন্ন ক‍্যাটাগরি করলেন। একটা ছিল একদমই সেটিসফাইড না। ৫০ জনের ব‍্যাচে আমিসহ জনা পাঁচেক এই ক‍্যাটাগরিতে হাত তুললাম।

বলে রাখা ভালো, ওই ব‍্যাচে বিসিএস ব‍্যাচ হিসেবে আমিই সিনিয়র মোস্ট ছিলাম। আমার যেমন চাকরির ১২ বছর চলছিল, আবার এক বছরও হয়নি এমন পার্টিসিপেন্টও ছিল! আমার ধারণা মিনিমাম পাঁ বছর চাকরিকাল পার হওয়ার আগে এই ভোট আসলে দেওয়ার যোগ্যতা আসে না।

আমাকে মাঝে মাঝে কলিগ, বিশেষ করে জুনিয়ররা জিজ্ঞেস করে ভাই আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? মূলত জব নিয়ে কি প্লান। আমি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, কেননা কাউকে মনোবল ভেঙে (ডিমোরালাইজড) দিতে চাই না। তবে বাস্তবতা হলো আমার ফিউচার প্ল‍্যান চাকরি ছেড়ে দেওয়া। এটা আজ বলছি, তা না কিন্তু! আরো বছর পাঁচেক আগ থেকেই বলি। কলিগরা ভাবতো মজা করছি। আসলে কিন্তু মজা করি না। আমি দশ-পনেরো বছর পর হলেও সরকারি চাকরিটা ছেড়ে স্বাধীন হয়ে যাবো এটা আমার লক্ষ‍্য।

কেন চাকরি ছাড়তে চাই? উত্তর জব সেটিসফেকশন নেই। একটু উদাহরণ দেই। কাল থেকে আমার হাসপাতালে আমরা ডাক্তার থাকবো তিনজন। এখন যদি আমরা তিনজন প্রতিদিনও ডিউটি করি তারপরও প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টায় ইনডোর, আউটডোর, ইমার্জেন্সি মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক রোগীর একটা অংশ আমরা দেখতে পারবো না, স‍্যাকমো/ব্রাদার দেখতে হবে (এখনো দেখে)।

এই রোগীগুলার অনেকেই তো নিজেদের প্রতারিত ভাববে/ভাবে। মাস শেষে ডিউটির ভারে জর্জরিত হয়ে আমরাও থাকবো বিরক্ত, অন‍্যদিকে নিজেদের সর্বোচ্চ দেওয়ার পরও সার্ভিস নিতে আসা রোগীদের একটা বড় অংশও থাকবে বিরক্ত, হতাশ।

মনে আছে, ট্রেনিং লাইফে একদিন এডমিশন ইভেনিং শেষ করে বাসায় ফিরে একটা স্ট্যাটাস লিখেছিলাম যে, কীভাবে হাসপাতালে আশা রোগী ও চিকিৎসার সাথে জড়িত প্রতিটি মানুষ ভিন্ন ভিন্ন কারণে চরম পরিশ্রমের পরেও হতাশ হয়ে ফিরে। রোগী হতাশ ট্রলিতে টাকা, গেইটে টাকা, বেড পান না, নার্স পান না; ট্রলিম‍্যান হতাশ তিনি আউটসোর্সিং বেতন পান না ঠিকমত, তার উপর চাকরির জন‍্য দিতে হয় চাঁদা; নার্স হতাশ কাজের চাপে পরিবারকে সময় দিতে পারেন না, ইন্টার্ন হতাশ এত এত কাজের পরও মিডলেভেল বকা দেয়—এইভাবে একটা চক্র। অতৃপ্তি আর হতাশার চক্র, অথচ সবাই কর্মক্লান্ত! মনে আছে হাজার খানেক শেয়ার হইছিল লেখাটা।

আমাকে প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেট দিতে হয়। এর বড় অংশই থাকে ফেইক বা ক্রাইটেরিয়ায় পড়ে না। না দিলেই শুরু করে—স‍্যার গরিব মানুষ, বাপ-মা নেই, নদী ভাঙা এলাকার লোক—দিয়ে দেন স‍্যার। দয়া করেন। এরা হয়তো আসলেই গরিব, কিন্তু আমি তো নিরুপায়। না দিলে তারা ভাবেন স‍্যার কত পাষাণ! গরিব মানুষ একটা সাইন দিলে কয়টা টাকা পাইতাম, দিলো না। জিনিসটা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি চাই সৎভাবে চলতে, কিন্তু আমার পোস্ট সে সুযোগ দেয় না। এই ডাইলেমা প্রতিনিয়ত ভোগায়।

যে চাকরিতে নিজের সর্বোচ্চ দেওয়ার পরও সার্ভিস গ্রহীতা সন্তুষ্ট হয় না, সে চাকরিতে জব সেটিসফেকশন থাকে কি করে? এদেশের হেলথ সেক্টরে চাকরি করে আসলেই কি জব সেটিসফেকশনে থাকা সম্ভব! আমি জানি না। আমার ধারণা সম্ভব না।

আমার এও ধারণা আমি সঠিক জিনিস বুঝতে পারি, কিন্তু সেটা দেরিতে। জিনিয়াসরা শুরুতেই বুঝে ফেলেন। তাই তো অনেককে দেখেছি এক বছর বুয়েটে/মেডিকেলে পড়ে ছেড়ে দিয়েছে, এমবিবিএস শেষ করে হয়েছে উদ্যোক্তা, কিংবা চলে গেছে প্রশাসনে, আগেই বুঝেছে এ পেশায় সরকারি চাকরিতে জব সেটিসফেকশন হবে না।

আমি একদম মিডেলক্লাস ফ্যামিলিতে বড় হয়েছি। ফলে ইকোনমিক্যালি ইনসিকিউর ফিলিংসটা আমার রক্তে। আমার সরকারি চাকরি হওয়াতে আমার চেয়েও বাবা বেশি খুশি হয়েছিলেন। যেন আলাদীনের চেরাগটা পাওয়া গেছে। আর খাওয়া পড়া নিয়ে টেনশন নেই! কথা সত‍্য। তবে এতদিনে এসে আমি বুঝতে পেরেছি, ডাক্তররা সরকারি চাকরি ছাড়াও অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল (economically stable) হতে পারে। স্বাধীন সুখী জীবন অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস।

তাই একদিন ছুটি হবে, সেই প্রতীক্ষায় থাকি। জীবন একটাই। মুক্তির স্বাদ তাই নিতেই হবে! এর আগে কিছু টাকা দরকার, তাই হয় তো গোলামীর জীবনটা ...।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত