ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


২৩ নভেম্বর, ২০২৫ ০৬:৪৩ পিএম

পেনিসিলিন আবিষ্কারের বিস্ময়কর ইতিহাস

পেনিসিলিন আবিষ্কারের বিস্ময়কর ইতিহাস
প্রতীকী ছবি

বিজ্ঞান মাঝে মাঝে আমাদের এমনভাবে চমকে দেয়, এমনভাবে হোঁচট খাওয়ায়, যেন গল্পের বইয়ের কোনো জাদুকরি ঘটনা হঠাৎ বাস্তবে নেমে এসেছে। পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার ঠিক তেমনই এক নাটকীয় ঘটনা, যা আজ কোটি মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করছে। আশ্চর্য বিষয় হলো, পেনিসিলিনকে কেউ ‘আবিষ্কার’ করেনি। এটি প্রকৃতিতেই ছিল, আর এক অদ্ভুত দুর্ঘটনার সৌজন্যে আমরা তার পরিচয় পাই। সুবহানাল্লাহ!

পেনিসিলিনের সন্ধান

১৯২৮ সালের এক সকালে বিজ্ঞানী অ্যালেক্সান্ডার ফ্লেমিং তার ল্যাবরেটরিতে এসে দেখলেন, ব্যাকটেরিয়া ভরা কয়েকটি পেট্রি ডিশে অদ্ভুত এক ছাঁচ বা ফাঙ্গাস জন্মেছে। তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন, এটা আবার কোথা থেকে এল? আরও বিস্ময়কর হলো, ফাঙ্গাসটির চারপাশে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো অদ্ভুতভাবে মরে বিবর্ণ হয়ে আছে! যেন ফাঙ্গাসটি তাদের বিরুদ্ধে অদৃশ্য কোনো অস্ত্র ছুড়ে দিয়েছে।

কিন্তু ফ্লেমিং-এর পেট্রি ডিশে এই ছত্রাক কীভাবে এলো? জানা যায়, আগের রাতে তিনি ল্যাবের জানালা পুরোপুরি বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। সে রাতে দমকা বাতাস ওঠে, আশেপাশের ঝোপঝাড় থেকে পেনিসিলিনের স্পোর উড়ে এসে তার পেট্রি ডিশে পড়ে। আর তাতেই ঘটে যুগান্তকারী ঘটনা। যদি সে রাতে বাতাস না উঠত, কিংবা জানালা বন্ধ থাকত—হয়তো মানবজাতি আরও বহু বছর পেনিসিলিনকে জানতে পারত না। এ ধরনের দুর্ঘটনা সদৃশ আবিষ্কারকে বিজ্ঞানীরা বলেন সেরেন্ডিপিটি।

পেনিসিলিনের নামকরণ

এই ফাঙ্গাসটির নাম পেনিসিলিয়াম নোটাটাম, যার থেকেই পেনিসিলিনের জন্ম ও নামকরণ। ফ্লেমিং অবাক হয়ে অনুধাবন করলেন, প্রকৃতি তার সামনে এক মহামূল্যবান উপহার রেখে দিয়েছে। সেই উপহারই পরবর্তীতে অ্যান্টিবায়োটিক যুগের সূচনা করে। আগে যে রোগগুলোতে লাখো মানুষ মারা যেত—নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, ক্ষত সংক্রমণ, টনসিল ইনফেকশন—সেগুলো পেনিসিলিনের কাছে সহজেই হার মানতে শুরু করল।

সেরেন্ডিপিটি ও পেনিসিলিনের যুগান্তকারী অবদান

বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন সেরেন্ডিপিটির ফলে বহু যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে। কখনো এক বিষয় অনুসন্ধান করতে গিয়ে অজানাতেই আরও মূল্যবান কিছু আবিষ্কার হাতের মুঠোয় এসে পড়ে। পেনিসিলিনের ক্ষেত্রে ঠিক এমনই ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা পেনিসিলিনকে পরিশোধিত করে অসংখ্য অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ সৈনিকের জীবন বাঁচিয়েছে। আজও পেনিসিলিন মানুষের জীবন রক্ষায় অমূল্য সেবা প্রদান করছে।

পেনিসিলিনের গল্প আমাদের শেখায়—প্রকৃতির ভাণ্ডারে অসংখ্য রহস্য লুকিয়ে আছে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের চারপাশেই চিকিৎসার অগণিত উপাদান ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমাদের প্রয়োজন শুধু অনুসন্ধান, গবেষণা ও কৌতূহল ধরে রাখা।

তবে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ঠিক নয়। এর ব্যবহার অবশ্যই আইন ও চিকিৎসা নীতিমালা অনুযায়ী হতে হবে, কারণ এতে অযথা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। কিন্তু তাই বলে রেজিস্ট্যান্সের ভয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকাও সমাধান নয়। অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে গবেষককে তার গবেষণার দরজা সবসময় খোলা রাখতে হবে।

পবিত্র কোরানে আল্লাহ তায়ালা আমাদের বলেন, ‘আমি তাদের সামনে আমার নিদর্শন দেখাবো দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের ভেতরেও।’ — সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৫৩।

টিআই/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত