প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা চর্চা চিকিৎসক-রোগীর রক্ষাকবচ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের জন্যই রক্ষা কবচ। এর মাধ্যমে রোগী মৃত্যুহার ছয় ভাগ এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা আট ভাগ কমানো সম্ভব হয়। চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে এ দেশের ৫০ লাখ রোগী দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে যায়। সে কারণে এ পদ্ধতির অনুসরণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি দরকারি।
আজ সোমবার (২০ অক্টোবর) সকালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে ‘ওয়ার্ল্ড এভিডেন্স-বেইজড হেলথকেয়ার ডে’ উদযাপন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
বিএমইউর ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার। উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর প্রো ভাইস চ্যালেন্সলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, প্রো ভাইস চ্যালেন্সলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির ডিনসহ বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাবৃন্দ।
দেশের চিকিৎসা খাতে পথপ্রদর্শক বিএমইউ
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, এভিডেন্স বেইজড চিকিৎসা পদ্ধতি কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়। এ নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিএমইউর সমন্বয় চলছে। এই বোঝাপড়া এগিয়ে নিতে পারলে এটি অনেক ফলপ্রসূ হবে।
এভিডেন্স বেইজ চিকিৎসা পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশের চিকিৎসা খাতে বিএমইউ পথপ্রদর্শক হবে বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। বলেন, শুধু তথ্যের উপর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে চিকিৎসকদের প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। এ সময় বিজ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতায় সমৃদ্ধ হওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ডা. সায়েদুর রহমান।
প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসায় মৃত্যুহার ছয় ভাগ কমে
সভাপতির বক্তব্যে বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাবিদ্যার চর্চায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এগিয়ে যাবে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও গবেষণা দ্রুত উন্নত একটি উন্নত অবস্থানে চলে যাবে।
প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনে সক্ষম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ পদ্ধতির চিকিৎসার চর্চায় দেখা গেল রোগী মৃত্যুহার ছয় ভাগ মৃত্যু কমে যায়। সুতরাং এর মাধ্যমে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। কারণ আধুনিক জ্ঞান এর মাধ্যমে চলে আসছে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে টেকসই ও মানুষের সক্ষমতার মধ্যে রাখতে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা চর্চার গুরুত্ব অনেক। সঠিক তথ্য ও গবেষণার আলোকে চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
‘প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে আট ভাগ অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমানো সম্ভব হয়। তাহলে আমাদের এই পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে। আমাদের এখানে স্বাস্থ্যসেবায় খরচের যে বিশাল বোঝা, এটি রোগীর জন্য অনেক বড় সমস্যা। চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আমাদের ৫০ লাখ রোগী দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে যায়। সে কারণে আমাদের জন্যই তো প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা চর্চা সবচেয়ে বেশি দরকারি বিষয়। এজন্য চিকিৎসকদের নিরবচ্ছিন্নভাবে সক্রিয় থাকতে হবে’—যোগ করেন বিএমইউ ভিসি।
গবেষণাগুলো প্রয়োগযোগ্য করতে হবে
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার বলেন, গবেষণা লব্ধ জ্ঞান যেন সকল চিকিৎসক, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর হাতে পৌঁছে যায়। এটি প্রয়োগযোগ্য করতে হবে। তাহলে চিকিৎসক, গবেষক ও রোগীসহ সবাই উপকৃত হবেন।
তিনি প্রতিটি বিভাগের জন্য চিকিৎসা নীতিমালা তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এটা করা গেলে রোগীদের অধিকার এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
রোগী-চিকিৎসক সম্পর্কোন্নয়নে এভিডেন্স বেইজড চিকিৎসা চমৎকার মাধ্যম
বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এভিডেন্স বেইজড চিকিৎসা সেবা রোগী ও চিকিৎসকদের সম্পর্কোন্নয়নের একটি চমৎকার মাধ্যম।
এ সময় মানসম্মত ওষুধ লেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বিএমইউর কোনো চিকিৎসক নিবন্ধনহীন কোম্পানির ওষুধ লিখলে সারাদেশে ভুল বার্তা যাবে। এই পথ ধরে চিকিৎসায় অনৈতিক চর্চার পথ উন্মুক্ত হবে।
পরিচ্ছন্ন চিন্তা থেকে এভিডেন্স বেইজড চিকিৎসা শুরু
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভাইস চ্যালেন্সলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, পরিচ্ছন্ন চিন্তা থেকে বাংলাদেশে এভিডেন্স বেইজড চিকিৎসার প্র্যাকটিস শুরু হয়েছে। এটা বিশ্বব্যাপী চলমান আছে। চিকিৎসার ওপর আস্থা কমিয়ে আনার পাশাপাাশি গবেষণা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিতে এটি চমৎকার কাজ করবে।
ভুল প্রেসক্রিপশন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অ্যান্টিবায়োটিক অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এভিডেন্স বেইজড চিকিৎসা পদ্ধতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন বিএমইউর এই প্রো ভাইস চ্যালেন্সলর।
চিকিৎসক-রোগীর রক্ষাকবচ প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা চর্চা
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক প্রো ভাইস চ্যালেন্সলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার বৈশ্বিক স্বীকৃতি আমাদের জন্য বড় একটি অর্জন।’
প্রতি বছর চিকিৎসা পদ্ধতির পরিবর্তন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসকদের সবশেষ তথ্য ও জ্ঞান অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি বিভাগের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ঠিক করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বর্জন করবো—তাই হোক আজকের দিনের প্রত্যাশা। এভিডেন্স বেইজড চিকিৎসা পদ্ধতিতে চিকিৎসার তথ্যগুলো সংরক্ষিত থাকে, এতে ভুল চিকিৎসার অপবাদ থেকে চিকিৎসকদের রক্ষা মিলবে। এদিক থেকে এ পদ্ধতি চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের জন্যই রক্ষা কবচ বলা চলে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, 'গবেষণা, চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতিটি স্তরে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা চর্চা কার্যকর করা গেলে একটি ন্যায্য ও দক্ষ স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা আরও বাড়িয়ে দেবে।'
এমইউ/