ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১২:০৫ পিএম

অশরীরী আত্মার ভর, নাকি মস্তিষ্কের সমস্যা?

অশরীরী আত্মার ভর, নাকি মস্তিষ্কের সমস্যা?
প্রতীকী ছবি

শোভা (ছদ্মনাম) চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। এক সময় পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তার ফলাফল খারাপ হতে শুরু করল। শিক্ষকরা খেয়াল করলেন, শোভা ক্লাস করছে, তবে হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। চোখ স্থির হয়ে যায়, যেন গভীর চিন্তায় ডুবে গেছে। আবার কিছু সেকেন্ড পর স্বাভাবিক হয়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই মুহূর্তে আশপাশে কি হচ্ছিল বা ক্লাসে কি পড়ানো হচ্ছিল—কিছুই মনে থাকে না।

এটা শুধু ক্লাসেই নয়। খেলতে খেলতে, মোবাইল গেমে মগ্ন অবস্থায় বা গল্প করার সময়ও হঠাৎ ৩-৫ সেকেন্ডের জন্য কোথাও হারিয়ে যায় শোভা। সবার কাছে বিষয়টা রহস্যময় লাগতে শুরু করল।

শোভার মা-বাবা প্রথমে এটাকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তারা ভেবেছেন, হয়তো সাধারণ কোনো সমস্যা, তাই তাবিজ ও পানি পড়া দিয়েছেন। কিন্তু এতে কোনো লাভ হলো না। অবশেষে স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক শোভার বাবাকে ডেকে বললেন, ‘এটা ভৌতিক কিছু নয়। ভানও নয়। আপনাদের উচিত একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো।’

সাইকিয়াট্রিস্ট যখন শোভাকে পরীক্ষা করলেন, তিনি চেম্বারে সিসি ক্যামেরা দিয়ে শোভাকে পর্যবেক্ষণ করলেন। এক ঘণ্টার মধ্যে শোভা দশবার এমন অবস্থায় চলে গেল। বাইরের চোখে এটা সত্যিই অদ্ভুত, অনেকেই বলতেন, শোভার গায়ে অশরীরী আত্মা ভর করেছে। কিন্তু আসলে তা নয়।

শোভা এবসেন্স সিজার (Absence Seizure) নামের এক ধরনের মস্তিষ্কজনিত রোগে ভুগছে। এ রোগে শিশুরা হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের জন্য পারিপার্শ্বিক থেকে ‘এবসেন্ট’ হয়ে যায়। তাই নাম এবসেন্স সিজার। এটি মৃগী বা এপিলেপ্সির একটি ধরন। তবে সাধারণ খিঁচুনির মতো এখানে হাত-পা নড়াচড়া হয় না। সাধারণত ৪-১৪ বছর বয়সে ধরা পড়ে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে শিশুরা আবার পড়াশোনায় স্বাভাবিক হতে পারে।

এবসেন্স সিজার কী?

এবসেন্স সিজার হলো এক ধরনের মৃগী রোগ (Epilepsy), যেখানে শিশু কয়েক সেকেন্ডের জন্য হঠাৎ স্থির হয়ে যায় বা শূন্যে তাকিয়ে থাকে। এ সময় শিশুটি বাইরের জগতের প্রতি সাড়া দিতে পারে না। অনেক সময় এটা এত কম সময়ের জন্য হয় যে, বাবা-মা বা শিক্ষক প্রথমে খেয়ালই করতে পারেন না।

শিশুদের মধ্যে হার

গবেষণা অনুযায়ী, শিশুদের মধ্যে প্রায় ২-৮ ভাগে এবসেন্স সিজার দেখা যায় (Wirrell, 2003, Epilepsia). সাধারণত ৪ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এটি বেশি শুরু হয়। মোট মৃগী রোগে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ১০-১৭% ক্ষেত্রে এবসেন্স সিজার পাওয়া যায় (Panayiotopoulos, 2008, The Epilepsies).

এবসেন্স সিজারের কারণ 

এবসেন্স সিজারের সঠিক কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেতের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে এটি হয়। অনেক ক্ষেত্রে জিনগত কারণও থাকতে পারে। এ ছাড়া ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ বা ঝলমলে আলো কিছু ক্ষেত্রে খিঁচুনি বাড়িয়ে দিতে পারে।

লক্ষণ

শিশুদের এবসেন্স সিজারের প্রধান ৫টি লক্ষণ হলো:

১. কয়েক সেকেন্ড শূন্যে তাকিয়ে থাকা, ২. কথা বলা বা কাজ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া, ৩. চোখ পিটপিট করা বা ঠোঁট নড়ানো, ৪. বারবার দিনে ঘটতে থাকা ও ৫. ঘটনার পর শিশু কিছুই মনে না রাখতে পারা।

চিকিৎসা

এবসেন্স সিজার সাধারণত ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সবচেয়ে ব্যবহৃত ওষুধ হলো Ethosuximide, Valproic acid বা Lamotrigine (Glauser et al., 2010, New England Journal of Medicine). চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। সময় মতো চিকিৎসা পেলে বেশিরভাগ শিশুই সুস্থভাবে পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যেতে পারে।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত