২৮ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৭:২৮ পিএম

আতশবাজির শব্দে আনন্দিত নয়, ভয় পায় অনেক শিশু

আতশবাজির শব্দে আনন্দিত নয়, ভয় পায় অনেক শিশু
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: নববর্ষ উদযাপনে আতশবাজি ফোটানো এবং ফানুস ওড়ানো বন্ধসহ ছয়টি সুপারিশ জানিয়েছে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) সকালে জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ক্যাপসের আয়োজনে ‘নববর্ষ উদযাপনের সময় আতশবাজি পোড়ানোর কারণে বায়ু ও শব্দ দূষণের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ এবং আতশবাজি ও ফানুশ মুক্ত নববর্ষ উদযাপনের দাবিতে’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ সুপারিশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন প্রদান করেন ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিল কিডস টিউটোরিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ওয়াজিহা জামান। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, আরন্যক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ইন্সটিটিউশন অফ ফরেস্টার্স বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হাসান মুকুল, বাংলাদেশ ইন্সটিউট অফ প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, পরিবেশবিদ, গবেষক ও লেখক আশিকুর রহমান সমী এবং সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী অ্যাড. রাশেদুজ্জামান মজুমদার।

সংবাদ সম্মেলনে কিডস টিউটোরিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ওয়াজিহা জামান নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরে বলেন, সব শিশু আতশবাজির শব্দে আনন্দিত হয় না, অনেক শিশু ভয়ও পায়। তাই সবার কাছে অনুরোধ বর্ষ উদযাপনে আতশবাজি না পুড়িয়ে অন্য কোন পরিবেশবান্ধব উপায়ে উদযাপন করার আহ্বান জানান এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসের আতশবাজি এবং ফানুস পোড়ানো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার অনুরোধ করেন।

ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে নববর্ষ উদযাপনের সময় ক্যাপস কতৃক পরিচালিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘২০২৩ সালের নববর্ষে রাত ১১-১২টার তুলনায় পরবর্তী ১ ঘন্টার বায়ু দূষনের পরিমাণ প্রায় ৩৬ ভাগ এবং শব্দদূষণ ১০২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল। অপরদিকে ২০২৪ সালের নববর্ষের রাত ১১-১২টার তুলনায় পরবর্তী ১ ঘন্টার বায়ু দূষনের পরিমাণ প্রায় ৩৫ ভাগ এবং শব্দদূষণ ৪২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল। মাত্রাতিরিক্ত শব্দ ও বায়ুদূষণ মানুষ, পশু-পাখি উদ্ভিদ সহ সার্বিক প্রাণ-প্রকৃতির উপর ব্যাপক খারাপ প্রভাব ফেলছে। আতশবাজি এবং ফানুসের পরিবর্তে আলোকসজ্জা, প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করা এবং সীমিত শব্দে দেশীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বছর উদযাপন করা যেতে পারে। আমরা কখনই চাই না উৎসব-আনন্দে আইনের কঠোরতার মধ্য দিয়ে পার করি। সুস্থ্য নির্মল পরিবেশই আমাদের কাম্য।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আতশবাজি পোড়ানোর কারণে মানুষের সাংস্কৃতিক বিপর্যয়, শারীরিক বিপর্যয় এবং জীববৈচিত্র্যের বিপর্যয় ঘটছে। তিনি নিজের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন যে, ৩১ ডিসেম্বর রাত বারোটা থেকে ২ টা পর্যন্ত তাকে নিজের ছাদে পাহারা দিতে হয় যেন কোন ফানুস এসে তার শখের  বাগানকে ধ্বংস করে না ফেলে। নতুন বছরে আমরা সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, আমাকে যেন এই বছরেও রাত ১২টায় নিজের ঘুম নষ্ট করে বাগান পাহারা দিতে না হয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, প্রকৃতিতে হস্তক্ষেপ করার পরিণতি কখনো ভালো হয় না। বায়ু দূষণের ফলে উদ্ভিদের খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। একটি এলাকার বায়ুদূষণ অথবা শব্দ দূষণের কারণে ওই এলাকার ইকো সিস্টেমে যত পোকামাকড় থাকে সেগুলো নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য অন্যত্র চলে যার কারণে উদ্ভিদের প্রজননের ক্ষেত্রেও একটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। একটি আতশবাজি ফোটানোর কারণে যে এত বড় একটা প্রভাব বিস্তার করে সেটি কল্পনারও বাইরে।

পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, নববর্ষ উদযাপনে আতশবাজি ও ফানুস পোড়ানোর প্রচলন যে সকল দেশ থেকে শুরু হয়েছিল তারাই এগুলো পোড়ানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ফানুসের সাথে প্রেমিকার তুলনা না করে এর ক্ষতিকর দিকগুলো সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। আতশবাজি না পুড়িয়ে দেশীয় সংস্কৃতি অর্থাৎ নাটক, মঞ্চ নাটক, গান, দেশীয় নাচ ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়িয়ে গিয়েই আমাদের নববর্ষকে বরণ করতে পারি।

পরিবেশবিদ, গবেষক ও লেখক আশিকুর রহমান সমী বলেন, সবুজে ভরা বাংলাদেশে আমরা যোগ করেছি পৈচাশিক উদযাপনের সংস্কৃতি। আতশবাজি পোড়ানোর কারণে অনেক পাখি আতঙ্কে আকাশে উড়ে। গবেষণায় দেখা যায়, লক্ষ্মী পেঁচা একটি কৃষকের ২৫ লক্ষ টাকার ফসল রক্ষা করতে পারে। আমাদের স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে যেন শিশুরা এবং তরুণরা বুঝতে পারে যে এই আতশবাজি ও ফানুস পোড়ানোর যে নেতিবাচক একটি দিক আছে।

সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী অ্যাড. রাশেদুজ্জামান মজুমদার বলেন, আতশবাজি আমদানি রপ্তানি করার ব্যাপারে বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই আইনের প্রচলন রয়েছে কিন্তু এর কোন সুষ্ঠু প্রয়োগ এখনো লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কয়েক বছর ধরেই সরকারিভাবে এসবকে নিষিদ্ধ করে পরিপত্র জারি করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিবছরই নববর্ষের সময়টাতে শত শত অভিযোগ কল আসে ৯৯৯-এ, কিন্তু এখন পর্যন্ত একজনকেও শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। আইন কিংবা শুধুমাত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দায় এড়ানোর প্রবণতা বন্ধ করে আমাদের আইনের প্রয়োগ করতে হবে।

ছয় সুপারিশ:

১. দূষণ সৃষ্টিকারী আতশবাজি ও ফানুসের আমদানি, উৎপাদন, বিক্রয় ও সরবরাহে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।

২. আতশবাজি এবং ফানুসের পরিবর্তে আলোকসজ্জা, প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করা এবং সীমিত শব্দে দেশীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের  মাধ্যমে করা যেতে পারে।

৩. গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশ সুরক্ষার বার্তা ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করতে হবে।

৪. শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ এবং অন্যান্য পরিবেশ সুরক্ষা আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

৫. নববর্ষ উদযাপনের সময় পশু-পাখি এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার জন্য সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

৬. দূষণ নির্ধারণ এবং তার প্রভাব কমানোর জন্য গবেষণায় আরও বেশি তহবিল বরাদ্দ করতে হবে।

এসআই/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : নববর্ষ
সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক