ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের দাবি
‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের ভাতা ৫০ হাজার টাকা করা হোক’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের ভাতা ৫০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
আজ বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ন্যাশনাল ডক্টর’স ফোরামের (এনডিএফ) জাতীয় চিকিৎসক সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি।
ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসকরা ভাতা ৩৭ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। ডাক্তাররা আমার কাছে ম্যাসেজ পাঠাচ্ছে, আমরা নবম গ্রেডে সম্মত আছি। আমি বলেছি, নো। ডাক্তারদের ন্যূনতম বেতন হবে ৫০ হাজার টাকা।’
তিনি আরও বলেন, একজন এমবিবিএস ডাক্তার ঢাকা শহরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য ছয় নম্বর, সাত নম্বর, নয় নম্বর বাসে ঝুলতে থাকেন, এটি দেশের জন্য লজ্জার। ঝোলা ছাড়া উপায় নেই, কারণ সে তো সিএনজি ব্যবহারের সামর্থ্য রাখে না। আর গাড়ির তো প্রশ্নই আসে না। অথচ একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (টিএনও) অফিস ডাক্তারের একজন প্রফেসরের চেয়ে বড়। তার তিনজন পিয়ন। একটা বাসা। তার অধীনে আরও অনেক কর্মচারী।
জামায়াতের নায়েবে আমীর বলেন, ‘একজন চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজে বিদ্যুতের আলোয় লেখাপড়া করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে তো লোডশেডিং। সে প্রেসক্রিপশন লিখতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। এজন্য একজন স্বাস্থ্য ক্যাডারকে সমপরিমাণ সুবিধা দিতে হবে, যে রকম একজন টিএনওকে দেওয়া হয়। কারণ একজন ছাত্র প্রথমে ডাক্তারিতে, তার পর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চেষ্টা চালান। যারা টিএনও হচ্ছেন, তারা মেধাবী, কিন্তু তারা প্রথম বা দ্বিতীয় বাছাইয়ের না। আমি যদি বলি, ইন্টারমিডিয়েটে রেজাল্টের ভিত্তিতে বেতন পাবে। তাহলে কী হয়?’
সুবিধাবঞ্চিত হওয়ার পেছনে নিজেদের অনৈক্যকে দায়ী করেন ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘এখানে সমস্যা কোথায়? বড় সমস্যা ডাক্তার সমাজ নিজেরাই। তাদের কোনো ঐক্য নেই। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। আমি এটাকে বলি, বাংলাদেশ মরা অ্যাসোসিয়েশন। গত ১৫ বছরে তাদের কোনো আওয়াজ আপনারা শুনেছেন? সরকারের লোকেরা জোর করে ভোট দেয়। আর যে সরকারে আসে ডাক্তারেরা তার পিছু পিছু ঘুরতে থাকে।’
বক্তব্যে অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ। বিএমএ যদি আন্তরিক হয়, তাহলে অনেক দাবি পূরণ করা সম্ভব। এবার বিএমএ নির্বাচনে, এনডিএফের প্রাধান্য যেন থাকে, আপনারা ভূমিকা নেবেন। তারিখ হয়েছি কিনা, জানি না। এনডিএফ নেতৃবৃন্দকে বলবো, চিকিৎসকদের স্বার্থের জন্য আপনাদেরকে লড়াই করতে হবে। তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে যে, বিএমএ আমাদের সংগঠন। এজন্য সাহস, ত্যাগ, ভালোবাসা ও দক্ষতা লাগবে। আশা করি, এনডিএফ সেটা অর্জন করবে।’
‘আজকের এই সম্মেলন একটি মাইলফলক হবে। আমরা যখন একটি সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেই, অনেকেই বলেছেন, দুই হাজার লোক। এটাই লক্ষ্য। আমি বলেছি, নো। টার্গেট কমপক্ষে পাঁচ হাজার। ঝুঁকি নিয়েছেন, সাহস করেছেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছেন, পাঁচ হাজার লক্ষ্য ছিল, উপস্থিতি ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
এটা তাদের প্রেরণা জুগিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাঁচ হাজার লোক যদি কোনো একটি সত্য কারণের পেছনে লেগে যায়, সেটি অর্জন করা সম্ভব। আমাদের আওয়াজ তুলতে হবে। এই সম্মেলনের পর এনডিএফ নেতৃবৃন্দ অচিরেই জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেখানে দাবি উচ্চকিত করবেন এবং স্বাস্থ্যখাতে মৌলিক দাবিগুলো নিয়ে কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন। সামনে চলুন, এটাই সময়। বিগত ১৫ বছর আমরা কথা বলতে পারিনি। একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেবেন যে, মেডিকেল সেক্টরে দুর্নীতিকে আমরা বরদাশত করবো না।’
এ সময় ন্যাশনাল ডক্টর’স ফোরাম-এনডিএফের সঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার চিকিৎসক সম্পৃক্ত আছেন বলেও জানান জামায়াতের নায়েবে আমীর।
বক্তব্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পার্থক্য তুলে ধরেন ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। বলেন, বাংলাদেশে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল, দুর্নীতি পরায়ন এবং অবহেলিত। ব্রিটেনে রাষ্ট্রীয় বাজেটের ১২ শতাংশ স্বাস্থ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, আমাদের দেশে তা ৩-৪ ভাগ। এটা ৮ ভাগ হলে কিছুটা হলেও জাতীয় চাহিদার কাছাকাছি সন্তোষজনক পর্যায়ে হতো। আমাদের যে ৪ শতাংশ বরাদ্দ, এর মধ্যে ২ শতাংশ দুর্নীতি হয়ে যায়। সুতরাং জনগণের জন্য আছে মাত্র ২ শতাংশ, যা একেবারেই নগণ্য।
দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার একটি অভিজ্ঞতা আছে। আমি সংসদ সদস্য ছিলাম। তখন ১০৬ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ এসেছিল স্বাস্থ্যখাতে, যার এক টাকাও খরচ হয়নি। অথচ সব টাকাই শেষ হয়ে যায়। এ ঘটনা তদন্তে কমিটি হয়। আমি ডাক্তার হওয়ায় আমাকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছিল। মন্ত্রী থেকে শুরু করে সিভিল সার্জন পর্যন্ত, মাঝখানে যারা যারা আছেন, তারা সকলে মিলে ১০৬ কোটি টাকা খেয়ে ফেলেন। কিন্তু ভাউচার করে দিয়েছে। সুতরাং আমি যে দুই শতাংশ দুর্নীতির কথা বলেছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও বেশি হচ্ছে।’
স্বাস্থ্যখাত চরম অবহেলিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যে কয়জন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তার মাত্র দশ ভাগ চিকিৎসকদের মধ্য থেকে হয়েছে। তাহলে ডাক্তারদের মধ্যে কী এমন কোনো যোগ্য লোক নেই, যিনি মন্ত্রী হতে পারবেন? বাংলাদেশের যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদের তালিকা যদি আমরা নিই, তাহলে তাদের যোগ্যতার বিচারে আমার মনে হয়, যে কোনো ডাক্তারই মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। তাহলে তাদের মধ্য থেকে অন্তত স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবেন না কেন? আমি জোর দাবি জানাচ্ছি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ডাক্তার হবেন। আর বাকি ডিজি থেকে শুরু করে যেসব প্রশাসক আছেন, তারা তো আছেনই। এটি বৈষম্যবিরোধী স্লোগান। বাকিরা বৈষম্যের শিকার, অবিচারের শিকার এবং জনগণও বৈষম্যের শিকার। কারণ জনগণের জন্য বরাদ্দ থাকা উচিত ৮ শতাংশ। আজকে এনডিএফের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যখাতে ৮ শতাংশ বরাদ্দের জন্য দাবি জানাচ্ছি।’
এমইউ/