ভিসা পেয়েছেন কাজল, রাতে নেওয়া হচ্ছে থাইল্যান্ড
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাইয়ের গণবিপ্লবে যাত্রাবাড়িতে পুলিশের গুলিতে আহত কাজল মিঞা (২৭) থাইল্যান্ডের ভিসা পেয়েছেন। আজ রোববার (১৭ নভেম্বর) রাতে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক নেওয়া হচ্ছে।
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু দুপুরে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আজ শনিবার (১৬ নভেম্বর) উন্নত চিকিৎসার জন্য কাজলকে থাইল্যান্ড নেওয়া হচ্ছে। রাত ১১.১০ এ তাকে নিয়ে এয়ার এম্বুলেন্সের একটি ফ্লাইট থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়ে যাবে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম উপস্থিত থেকে তাকে বিদায় জানাবেন।’
গত তিন মাস ধরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (নিন্স) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আন্দোলনে আহত কাজল।
ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু জানান, ধীরে ধীরে তার উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু গত দুদিন আগে হঠাৎ ইনফেকশন হয়। বেশ কয়েকবার তার ডায়রিয়া হয়। এতে রক্তচাপ কমে শকে চলে যান তিনি। পরে নিন্সে বোর্ড করে চিকিৎসা দেওয়া হতে থাকে। আজকে সকাল থেকে অবস্থা খারাপ হতে থাকলে আজও বোর্ড মিটিং বসে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কাজলের সর্বশেষ অবস্থা স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে জানানো হলে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে শনিবার (১৬ নভেম্বর) নিন্সে পাঠান। নাহিদ এসে চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেন। তাকে দ্রুত থাইল্যান্ডের বেজথানি হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
তবে শনিবার হওয়ায় ভিসা পাওয়া যায়নি। তথ্য উপদেষ্টা তার ভিসা ও খরচের ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন। দুই মন্ত্রণালয় থেকেই সবুজ সংকেত পান তিনি। পরে কাজলকে এয়ার এম্বুলেন্সে থাইল্যান্ড পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এর আগে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) থেকে গণবিপ্লবে আহত মুসাকে এয়ার এম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সে অভিজ্ঞতা থেকেই স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সাথে সাথে সিএমএইচে যোগাযোগ করেন। পরে তিনি এয়ার এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দেন।
যেভাবে আন্দোলনে কাজল মিয়া
জানা গেছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ বিভাগের ছাত্র কাজল মিয়া জুলাইয়ের শুরু থেকেই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। পুরো জুলাই মাস ও আগস্টের শুরুতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনে অংশ নেন।
কাজলের বড় ভাই রুবেলের বাসা যাত্রাবাড়ীতে। ৪ আগস্ট ভাইয়ের বিয়ের বর্ষপূর্তিতে অংশগ্রহণের জন্য বড়ভাই রুবেলের বাসায় আসেন। পরের দিন ডাক আসে 'লংমার্চ ফর ঢাকা'। ৫ আগস্ট ভোরেই আন্দোলনে যোগদানের জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন কাজল। যাত্রাবাড়ীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেন। সেখানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলির মুখে সবাই রাস্তা ছেড়ে দিলেও সাহসিকতার সাথে দাঁড়িয়ে থাকেন কাজল। রংপুরের আবু সাঈদের মতো দু'হাত প্রসারিত করে বুক পেতে তিনি। পুলিশ তার মাথায় গুলি চালালে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি।
পরে লোকজন উদ্ধার করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (নিন্স) হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে তার মাথায় অপারেশন হয়। গত প্রায় তিন মাস হাসপাতালের হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে তার উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু বাম হাত-পা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়। তার জন্য প্রয়োজন রোবটিক ফিজিওথেরাপি। কিন্তু দেশে সে ব্যবস্থা নেই। সেজন্য মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয় তাকে বিদেশে পাঠানোর।
এর পর থেকে কাজলকে বিদেশে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু এর আগেই স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। গত দুদিন আগে হঠাৎ করে ইনফেকশন হয়। বেশ কয়েকবার তার ডায়রিয়া হয়। এতে রক্তচাপ কমে শকে চলে যান তিনি। পরে নিন্সে বোর্ড করে চিকিৎসা দেয়া হতে থাকে। আজ সকাল থেকে অবস্থা খারাপ হতে থাকে। আজও বোর্ড মিটিং বসে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, তার অবস্থা স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে জানানো হয়। কাজলের অবস্থা জানার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেন তিনি। তাকে থাইল্যান্ডের বেজথানি হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। শনিবার (১৯ নভেম্বর) ছুটির দিন হলেও কাজলকে বিদেশে নেওয়ার সব ব্যবস্থা করেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে থাই এম্বেসিতে যোগাযোগ করা হয়। আজকে রোববার দুপুরের মধ্যে ভিসার ব্যবস্থা করা হয়। এয়ার এম্বুলেন্সের জন্য ৩১ হাজার ডলারের ব্যবস্থা করেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা। আজ দুপুরের মধ্যে সে টাকা সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে এয়ার এম্বুলেন্স নিশ্চিত করেন।
জানা গেছে, সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করবে এয়ার এম্বুলেন্স। পরে কাজলকে নিয়ে রাত ১২টার দিকে থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। কাজলের সাথে যাবে তার স্ত্রী সিনথিয়া।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেন, ‘আমি স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে যোগদানের পর আমার প্রধান কাজ হলো আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এজন্য আহতদের সুচিকিৎসার জন্য বিদেশি চিকিৎসক দল আনার ব্যবস্থা করেছি। আহতদের চিকিৎসার জন্য চায়না নেপাল, ফ্রান্স থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এসেছে। থাইল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এসেছে। ৫০ জনের চোখের কর্নিয়া নেপাল রেডি করে রেখেছে, যাদের কর্নিয়া স্থাপন প্রয়োজন হবে তাদের জন্য। ইতোমধ্যে দুইজনের চোখে সফলভাবে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় যুক্তরাজ্য থেকে চিকিৎসকদের একটি টিম বাংলাদেশে এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, গত ৫ নভেম্বর থেকে দুইজনের একটা মেডিকেল টিম ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) আন্দোলনে আহত ভর্তি রোগীদের পর্যবেক্ষণ করেন। তারা ১৮ তারিখ পর্যন্ত ২৫ টির বেশি আপারেশন করেন।
‘আমরা ৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাহিরে পাঠিয়েছি। আর আজকে কাজলকে পাঠানো হচ্ছে। আরোও ১০-১২ জনকে দেশের বাহিরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে’—যোগ করেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, জাতীয় নাগরিক কমিটির ডা. আহাদসহ আরোও অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কাজলকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন।
এমইউ/