স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন
রাহিব রেজার মৃত্যু: ডা. স্বপ্নীলের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে কমিটি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাহিব রেজার মৃত্যু হয়েছে। এর মূল দায় অস্ত্রোপচার দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলের।
আজ বুধবার (২৩ অক্টোবর) হাইকোর্টে দাখিল করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম কিবরিয়ার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে রোগীকে এনেস্থেশিয়া দেওয়া হয়নি। এনডোস্কোপি করা হয়েছে অদক্ষ লোক দিয়ে। এমনকি জটিলতা দেখা দিলেও রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিতে ৮৫ মিনিট সময় ক্ষেপণ করা হয়। এতে তার অবস্থা খারাপ হয় এবং এক পর্যায়ে রাহিব রেজা মারা যান।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে
অধ্যাপক মামুন আল মাহতাবের (স্বপ্নীল) নেতৃত্বে ডা. সুনান বিন ইসলাম ও ডা. মো. নাসিফ শাহরিয়ার ইসলামের অংশগ্রহণে আট ৮ সদস্যের টিম চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাহিব রেজার এন্ডোস্কোপি করেন। চারদিন পর এন্ডোস্কোপি পরবর্তী জটিলতায় ১৯ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন রোগী।
চেতনানাশক প্রয়োগ করে এন্ডোস্কোপি করার জন্য রাহিব রেজা একজন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তার ওজন বেশি ছিল (১২২ কেজি), তার অস্বাভাবিক ইসিজি এবং হৃদরোগ ছিল (ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, ডাইলেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি, লেস্ট ভেন্ট্রিকুলার ওয়াল গ্লোবাল হাইপোকাইনেসিয়া, রিডিউসড এলভি সিস্টোলিক ফাংশন ইএফ-৪৩ শতাংশ এবং পালমোনারি হাইপারটেনশন)।
রোগীর এন্ডোস্কোপি পরীক্ষার পূর্বে প্রাক-পরীক্ষা মূল্যায়ন এবং সতর্কতা পর্যাপ্ত ছিল না (এন্ডোস্কোপি এবং সিডেশনের আগে ঝুঁকি স্তরবিন্যাস কার্ডিয়াক, পালমোনারি এবং এয়ারওয়ে মূল্যায়ন)।
রোগীর নিজের বা তার আইনি অভিভাবকের কাছ থেকে একটি বৈধ সম্মতিপত্র নেওয়া প্রয়োজন ছিল। এর পরিবর্তে ল্যাবএইড এন্ডোস্কোপি টিম রোগীর বন্ধুর স্বাক্ষরিত সম্মতিপত্র গ্রহণ করেছে।
এন্ডোস্কোপি পরীক্ষার দিন তালিকায় অতিরিক্তসংখ্যক (৬৭ জন) এন্ডোস্কোপি ছিল, যা একটি সেশনে একজন এন্ডোস্কোপিস্ট দ্বারা সম্পন্ন হওয়ার জন্য অনেক বেশি। ফলশ্রুতিতে প্রতি রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত সময় অল্প হওয়ার কারণে অকার্যকর ও বিরূপ ফলাফল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
একজন ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে চেতনানাশক ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে এন্ডোস্কোপি পরীক্ষার জন্য (পরীক্ষাকালীন ও পরীক্ষা পরবর্তী মনিটরিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ) প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ চিকিৎসক (এনেস্থেসিওলজিস্ট) নিশ্চিত করা হয়নি।
জিআই এন্ডোস্কোপি স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়। পরীক্ষা পরবর্তী জটিলতায় রোগীকে আইসিইউ স্থানান্তরকরণ পর্যন্ত পুরো সময় এন্ডোস্কোপি টিম সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। বর্ণনামতে, রোগীর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পরপরই সিপিআর দেওয়া হয়েছে এবং ফেইস মাস্কে অক্সিজেন দিয়ে রোগীকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
আইসিইউতে প্রায় ২০ মিনিট পুনরুত্থান করা এবং রোগীর শিরা পথে অ্যাড্রেনালিয়ান এবং কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস সাপোর্ট দেওয়ার পর রোগীর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া ব্লাড-পেশার সঠিক পাওয়া যায়। আইসিইউ টিম রোগীর পরিস্থিতি সংকটাপন্ন বলে বর্ণনা করেন।
দীর্ঘসময় (প্রায় ৮৫ মিনিট) অনিয়মিত হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া ও শ্বাসপ্রশ্বাসের কারণে আইসিইউ রেকর্ডে রোগীর হাইপক্সিক অর্গান ডেমেজের লক্ষণ ও প্রমাণ (নিউরোলজিকেল সাইন এবং মেটাবলিক এসিডোসিস) পাওয়া যায়।
আইসিইউতে ব্যবস্থাপনা মানসম্মত ছিল। প্রফেসর মামুন আল মাহাতাবসহ (স্বপ্নীল) মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সংযুক্ত ছিলেন।
প্রাথমিক হাইপোক্সিক ইনসাল্টের পর সর্বশেষে রোগীর অ্যাসপিরেশন নিউমোনিয়া, সেপ্টিসেমিয়া এবং মাল্টিঅর্গান ফেইলিউর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
আইসিইউতে ব্যবস্থাপনার সময় রোগীর আত্মীয়দের তার অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত করা হয়।
প্রতিবেদন নিয়ে বুধবার হাইকোর্টে এক সংবাদ সম্মেলনে রাহিব রেজার পরিবারের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম জানান বলেন, গত ১১ মার্চ রুল জারি করে হাইকোর্ট। এর পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি একটি প্রতিবেদন তৈরি করে হাইকোর্টে দাখিল করে। এর সঙ্গে একটি স্পষ্টিকরণ চিঠি দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া ওই চিঠিতে তদন্তে উঠে আসা বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
‘প্রতিবেদনের সব কিছু বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, এখানে ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলের গুরুতর চিকিৎসা অবহেলা ছিল। এন্ডোস্কপি করার আগে, এন্ডোস্কপির সময় ও পরবর্তীতেও অবহেলা হয়েছে’—যোগ করেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম।
রাহিব রেজা ঝুঁকিপূর্ণ রোগী ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর হার্টে সমস্যা ছিল। তিনি স্থূলকায় ছিলেন। অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়ার আগে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, তার প্রতিবেদনে অবহেলার প্রমাণ বেরিয়ে এসেছে।
রিপোর্ট না দেখেই অ্যানেস্থেশিয়া-এন্ডোস্কোপি
রোগীর পরিবারের বরাত দিয়ে আইনজীবী জানান, দুঃখজনক হলো—রাহিবের নানা রোগ ছিল। প্রসিডিউর শুরু করার আগে রাহিব রেজার টেস্ট রিপোর্টগুলো কেউ দেখেননি। সে কারণে রোগীর ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করতে পারেননি। ঝুঁকি কমানোর আগে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, তা তারা নিতে পারেননি। এর মধ্যে এনেসথেশিয়া দেওয়া হয়। এতে তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো দক্ষ ও নিবন্ধিত অ্যানথেশিওলজিস্ট ছিলেন না জানিয়ে তিনি বলেন, এতো বড় একটি হাসপাতালে, এত বড় একজন চিকিৎসকের অস্ত্রোপচার দলে একজন দক্ষ অ্যানথেশিওলজিস্ট থাকবেন না—এটা অবিশ্বাস্য।
দায় এড়াতে পারবে না ল্যাবএইড হাসপাতাল
ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, আট সদস্য বিশিষ্ট অস্ত্রোপচার দলের সাতজনের এন্ডোসকপি সংক্রান্ত কোনো সার্টিফিকেট কিংবা অভিজ্ঞতার সনদ ছিল না। অদক্ষ লোক দিয়ে এন্ডোসকপি করানোর কারণেই রাহিব রেজার মৃত্যু হয়েছে। এখানে অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল পুরোপুরি দায়ী। কারণ তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। উনার দায় এড়ানোর কোনো উপায় নেই। হাসপাতালও দায় এড়াতে পারে না।
তিনি বলেন, ডা. স্বপ্নীল একদিনে ৬৭টি এন্ডোস্কপি-কোলনস্কপি করেছেন। রাহিব রেজার মৃত্যুর পর সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ল্যাবএইড হাসপাতাল পরিদর্শন করেছিলেন। সেদিন তিনি দেখেছেন, ৭১টি এন্ডোস্কপি করেছেন। এসব প্র্যাকটিস চিহ্নিত না হলে হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের অকাল মৃত্যু ঘটবে।
তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের এন্ডোস্কপি সেটআপে ত্রুটি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এন্ডোস্কপি শেষে পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে নেওয়ার পর রাহিব রেজার জটিলতা দেখা দেয়। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়নি। ৮৫ মিনিট তাকে এভাবে রেখে দেওয়া হয়।
পদক্ষেপ নেয়নি বিএমডিসি ও বিএসএমএমইউ
আইনজীবী জানান, এ ঘটনায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিঠি পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিএমডিসিতে পাঠানো চিঠিতে মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও বিএমডিসি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ব্যারিস্টার রাশনা জানান, এ ব্যাপারে আদালতে বিএমডিসিকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হবে।
‘এ ছাড়া বিএসএমএমইউতে পাঠানো চিঠিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়। তবে বিএসএমএমইউও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি’—যোগ করেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী।
অধ্যাপক স্বপ্নীলের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণিত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের চাওয়া ছিল, দোষী প্রমাণিত হওয়ায় তার নিবন্ধন বাতিল চাইবো। ইতিমধ্যে রাহিব রেজার সন্তান, স্ত্রী ও বাবার জন্য ল্যাবএইড হাসপাতাল থেকে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে—যারা তার উপর নির্ভরশীল। কারণ এটাই ল্যাবএইডের প্রথম চিকিৎসা অবহেলা না। অবহেলা প্রমাণিত হওয়ায় আমাদের ক্ষতিপূরণ দাবিটা আরও জোরালো হয়েছে।
এই মামলায় অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলের শাস্তি নিশ্চিত হলে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে বলে মনে করেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম।
এমইউ/