ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও একুশে পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক।

 


২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৫:০৩ পিএম
বিশ্ব হার্ট দিবস

হার্ট সুস্থ রাখতে জরুরি ব্যক্তি সচেতনতা

হার্ট সুস্থ রাখতে জরুরি ব্যক্তি সচেতনতা
ফাইল ছবি।

১৯৯৯ সাল থেকে প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব হার্ট দিবস’ পালন করা হয়ে থাক। হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ২০২৪ সালেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ইউর হার্ট ফর একশন’। দিনটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পোস্টারিং, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

হার্ট সংক্রান্ত সমস্যা বা হৃদরোগ আজকাল খুব সাধারণ হয়ে উঠেছে। বয়স্কদের পাশাপাশি তরুণরাও এখন হার্ট অ্যাটাকের শিকার হচ্ছেন। সারা বিশ্বে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। বিশ্বের এই মরণব্যাধি কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই যেকোনো সময় কেড়ে নেয় জীবন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের মধ্যে ১৭ শতাংশই হৃদরোগের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। সারাবিশ্বে রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি লোক মৃত্যুবরণ করেন, যার মধ্যে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যাই বেশি। একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হলে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

হৃদরোগের ধারণা

মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে হার্ট বা হৃৎপিণ্ড একটি জরুরি অঙ্গ। হার্টের কর্মক্ষমতার ওপর বেঁচে থাকা, শক্তি, শারীরিক কর্মক্ষমতা, আবেগ অনুভূতি বলতে গেলে জীবনের সবকিছুই নির্ভরশীল। হার্ট, রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে পুষ্টি এবং শক্তি সঞ্চালিত করে, অক্সিজেন সরবরাহ হয় এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয়।

অন্য যেকোনো অঙ্গ অকেজো বা নষ্ট হয়ে গেলে শুধু ওই অঙ্গের কার্যকারিতার ব্যাঘাত ঘটে, কার্যক্ষমতা লোপ পায়। কিন্তু হৃৎপিণ্ড বা হার্ট নষ্ট বা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের সরাসরি মৃত্যু ঘটে। অর্থাৎ এই অঙ্গটির কার্যক্ষমতা কমে গেলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক কার্যক্ষমতা কমে যায়। তাই হার্ট ভালো থাকলে মানুষের শরীরও কার্যক্ষম থাকবে।

এ কারণে এই জরুরি অঙ্গটিকে ঠিক রাখতেই হবে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করতে হবে। এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, একবার হার্ট আক্রান্ত হয়ে ভালো হয়ে গেলেও সাবধানে নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য রোগের চিকিৎসাসহ নিয়মিত চেকআপ করতে হবে। এর মানে হচ্ছে, বাকি জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হবে। 

একটি প্রবাদ আছে, ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’। তাই এই অঙ্গটিকে ঠিক রাখার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির উন্নত চিকিৎসার ফলে তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও অসংক্রামক ব্যাধি দিনদিন বেড়েই চলেছে। তার মধ্যে হৃদরোগ অন্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে স্থানান্তর করতে পারলে হৃদরোগের অনেক আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু পূর্বে হৃদরোগ শনাক্ত করা না গেলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা দেয়ার পূর্বেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। তাই প্রতিরোধটাই সবচেয়ে জরুরি। আশার কথা হচ্ছে—হৃদরোগ নামক নীরব ঘাতক শতকরা ৭০ ভাগ প্রতিরোধ যোগ্য।

হৃদরোগের কারণ

বিভিন্ন কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যাকে বলা হয় রিস্ক ফ্যাক্টর বা ঝুঁকি। এর মধ্যে কিছু সহজেই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য, আর কিছু নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

১. অনিয়ন্ত্রণযোগ্য রিস্ক ফ্যাক্টরগুলোর কারণ হলো—বয়স, লিঙ্গ ও বংশগত বা পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাস।

২. নিয়ন্ত্রণযোগ্য রিস্ক ফ্যাক্টরের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে কলেস্টেরলের আধিক্য, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মোটা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, অলস জীবনযাত্রা ও কায়িক পরিশ্রমের অভাব, চর্বিজাতীয় খাদ্য বেশি ও আঁশজাতীয় খাদ্য কম খাওয়া, মানসিক চাপ ও  অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা, অতিরিক্ত মদপান, জন্মনিয়ন্ত্রক পিল খাওয়া ইত্যাদি।

হার্ট সুস্থ রাখার উপায়

সুস্থ, স্বাভাবিক ও আনন্দপূর্ণ জীবনের জন্য দরকার একটি সুস্থ হার্ট বা হৃদযন্ত্র। কিন্তু এ যন্ত্রটিকে সুস্থ রাখাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিক বিশ্বে জীবনযাত্রার নানামুখী পরিবর্তন, কাজের পরিবেশ সব কিছুই যেন প্রতিনিয়ত হার্টকে প্রতিকূলতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গটিকে ভালো রাখতেই হবে। আর তাই সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের কোনো বিকল্প নেই।

হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। একবার আক্রান্ত হলে সারা জীবন এই মারাত্মক ব্যাধিকে পুষতে হয় এবং অনেক ওষুধ খেতে হয়। তাই এই রোগ প্রতিরোধ করাই উত্তম। নিরাময়যোগ্য রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিলেই অনেক ক্ষেত্রে হৃদরোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

১. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস রোগীদের এ্যাথারোস্কেলরোসিস বেশি হয়। ফলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। তাই রোগীদের অবশ্যই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

২. উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। যত আগে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে, তত আগে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং জটিল রোগ বা প্রতিক্রিয়া হতে রক্ষা পাওয়া যায়।

৩. ধূমপান বর্জন : হৃদযন্ত্রের অন্যতম প্রধান শত্রু ধূমপান। ধুমপায়ীদের শরীরে তামাকের নানা রকম বিষাক্ত পদার্থের প্রতিক্রিয়ায় উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনি, শিরার নানা রকম রোগ ও হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। তাই ধূমপান অবশ্যই বর্জনীয়। ধূমপায়ীর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন। তামাক পাতা, জর্দা, গুল লাগানো ইত্যাদিও পরিহার করতে হবে।

৪. অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা হ্রাস: যথেষ্ট পরিমাণে ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীরে ওজন বেড়ে যেতে পারে। এতে হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, ফলে অধিক ওজন সম্পন্ন লোকদের উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনি, শিরার নানা রকম রোগ ও হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।

৫. ওষুধ ও খাবার গ্রহণে সতর্কতা: ওষুধ খেয়ে ওজন কমানো বিপজ্জনক। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমানোর ওষুধ না খাওয়াই ভালো। স্থূলতার কারণে হৃদরোগ থেকে শুরু করে নানা সমস্যা হতে পারে। ফলে ভারসাম্যপূর্ণ ও সঠিক ওজন বজায় রাখতে মনোযোগী হতে হবে। চর্বি জাতীয় খাবার এবং চিনি বা মিষ্টি কম খাওয়া ভালো।

৬. নিয়মিত ব্যায়াম: হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়ামের মতো কার্যকর অন্য কোনো পথ নেই। সকাল-সন্ধ্যা হাঁটা-চলা, সম্ভব হলে দৌড়ানো, হালকা ব্যায়াম, লিফটে না চড়ে সিঁড়ি ব্যবহার ইত্যাদির অভ্যাস করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করা উত্তম। তবে তা সম্ভব না হলে প্রতিদিন অবশ্যই হাঁটতে হবে।

৭. অতিরিক্ত লবণ নিয়ন্ত্রণ: খাবার লবণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তের জলীয় অংশ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের আয়তন বেড়ে যায় এবং রক্তচাপও বেড়ে যায়। এ কারণে হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। তাই তরকারিতে প্রয়োজনীয় লবণের বাইরে অতিরিক্ত লবণ পরিহার করতে হবে। অনেকেই খাবারের সঙ্গে কাঁচা লবণ খান। এটা অবশ্যই বর্জন করতে হবে। বেশি লবণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। এ থেকে হৃদযন্ত্রে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৮. চর্বিযুক্ত খাবার বর্জন: খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে বেশি আঁশযুক্ত খাবার যেমন শাকসবজি, ফলমূল বেশি বেশি খাওয়া ভালো। রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল হলে রক্তনালির দেয়াল মোটা ও শক্ত হয়ে যায়। এর ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে এবং হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার ও কম কোলেস্টেরল যুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন খাশি বা গরুর গোস্ত, কলিজা, মগজ, গিলা, গুর্দা, কম খেতে হবে। কম তেলে রান্না করা খাবার এবং ননী তোলা দুধ, অসম্পৃক্ত চর্বি যেমন সয়াবিন, ক্যানোলা, ভুট্টার তেল অথবা সূর্য্যমুখীর তেল খাওয়া যাবে।

৯. মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলাতে হবে: অতিরিক্ত রাগ, উত্তেজনা, ভীতি এবং মানসিক চাপের কারণেও রক্তচাপ ও হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য নিয়মিত বিশ্রাম, সময় মতো ঘুমানো, শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম দিতে হবে। নিজের শখের কাজ করা, নিজ ধর্মের চর্চা করা ইত্যাদির মাধ্যমে মানসিক শান্তি বেশি হবে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ঙ্কর। এজন্য খেলাধুলা, আড্ডা, বইপড়া, যোগব্যায়াম ও ধ্যান হতে পারে চাপ মুক্তির উত্তম সমাধান। এ ছাড়া প্রতি রাতে ভালো ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ভাল।

১০. মদ্যপান পরিহার: অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করতে হবে। বেশি অ্যালকোহল গ্রহণ মানে রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়া। এতে হৃদস্পন্দনেও প্রভাব পড়ে। সুস্বাস্থ্য ও সবল হৃদযন্ত্রের জন্য ধূমপানের মতো মদ্যপানও ছাড়তে হবে।

হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ

হৃদরোগ প্রতিরোধে চিকিৎসা সেবার বিস্তারেও নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তৃণমূল পর্যায়ে হৃদরোগের চিকিৎসা সহজলভ্য করে তুলতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশের চিকিৎসার খরচ প্রায় ৭০ শতাংশই রোগীকে বহন করতে হয়। তাই হৃদরোগের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেকে আরও বেশি দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। অনেকে অর্থের অভাবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সমস্যার সমাধানে সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু করা জরুরি।

সুন্দর জীবনের জন্য সুস্থতা প্রয়োজন। সুস্থতার জন্য সুস্থ হার্টের বিকল্প নেই। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধে সরকারের নানা উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ জন্য শিক্ষা ও সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হৃদরোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ব্যাপারে বেশি যত্নবান হতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সকলে নিজ নিজ অবস্থান থেকে হৃদরোগের ঝুঁকিগুলো জেনে সচেতন হলে হৃদরোগ এবং এর ঝুঁকিপূর্ণ অকাল মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

এনএএন/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত