আফিয়া আনজুম

আফিয়া আনজুম

শিক্ষার্থী, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, টাঙ্গাইল

সেশন: ২০২৩-২৪


০৫ জুন, ২০২৪ ০৪:৫৮ পিএম

‘বাবা বলেছিল, আমার কাছে তুই ডাক্তার হয়ে গেছিস মা’

‘বাবা বলেছিল, আমার কাছে তুই ডাক্তার হয়ে গেছিস মা’
প্রতীকী ছবি।

এই সফলতার মঞ্চে ওঠার জার্নিটা শুরু হয় ঠিক ২০২১ সালে, যখন এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে কলেজে উঠি, আশেপাশে দেখি তখন নতুন কলেজে ওঠার উৎসব আমেজ। ভেবেছিলাম সেই আমেজে গা ভাসিয়ে দিব, কিন্তু সেটি না করে ভিন্নভাবে আমার জার্নিটা শুরু করার চেষ্টা করি। এরপর ভাবলাম, এসময়টা গা ভাসাবার নয়, এখন কঠিন পরীক্ষার সময়।

আর আমি ডাক্তার হবো, এ কথাটা ছোটবেলায় কোনদিনই ভাবিনি, ভেবেছিলাম বাবা নৌ বাহিনীর অফিসার, আর তাই আমাকেও নৌবাহিনীর অফিসার হতে হবে। তবুও মনের মধ্যে কেন যেন টান ছিল যে, ডাক্তার হবার চেষ্টাটাও করি। আমি চেষ্টা চালিয়ে গেলাম যখন কলেজে সবাই একাডেমিক পড়াতে ব্যস্ত, আমি তখন একাডেমিকের পাশাপাশি রোজ নিয়ম করে এডমিশনের জন্য কিছু পড়া পড়ে নিতাম। ইন্টারমিটিয়েটের কিছুদিন যাবার পর ফেসবুকে দেখি, অনলাইনে প্রি-মেডিকেল এডমিশন ব্যাচ লঞ্চ হয়েছে। আমিও নির্দ্বিধায় ব্যাচটি নিয়ে নিলাম। 

তখনই বুঝলাম আমার চলার পথের যাত্রাটা সহজ হতে চলছে। আমি সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করলাম, অনলাইন লেকচারগুলোর প্রতি। এই এডমিশন জার্নিতে আমি নির্দ্বিধায় বড়দের উপদেশ শুনে এগিয়ে যেতে পারবো। তারপরে সময় চলে আসলো এইচএসসি, তারপর আসলো ফল এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি সেখানেও জিপিএ ফাইভ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম।

এইচএসসির পরীক্ষার পরের দিন থেকেই আমি সম্পূর্ণভাবে এডমিশনের প্রতি মনোনিবেশ করলাম, দেখতাম আশেপাশের বন্ধু-বান্ধবরা নানান জায়গায় বিভিন্ন কোচিং এ ভর্তি হয়ে গেছে। আবার অনেকে ঢাকায়ও চলে গিয়েছে। তখন আবার আমি ভয় পেতাম আমি কি শুধু অনলাইনে পড়ে এই এডমিশন জার্নিতে সফলতা আনতে পারব? তারপরও নানা চিন্তা ভাবনা করে আমি নিশ্চিন্ত মনে শুরু করে দিলাম আমার এডমিশন জার্নি।

আমি আমার পড়ার মধ্যে কিছু ট্রিকস ব্যবহার করতাম। যেমন- কঠিন কঠিন শব্দগুলোর নেমোনিক ব্যবহার, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সারাদিনের পড়াগুলো আবার মনে মনে আয়ত্ত করা, যেই পড়াগুলো পারতাম না সেই পড়াগুলো স্টিকি নোটস এ লিখে পড়ার টেবিলের সামনে লিখে রাখা ইত্যাদি।

তবে আমি এটা বলবো না, যে আমি খুব রাত জেগে পড়েছি, কারণ আমার রাত জেগে পড়ার অভ্যাস নেই। এডমিশন টাইমে আমি আমার দিনটাকে কাজে লাগাতাম। আমি আমার যত পড়া সেটা আমি আমার দিনে শেষ করতাম এবং রাত বারোটার মধ্যে আমি শুয়ে পড়তাম।

এভাবে চলতে চলতেই মেডিকেল পরীক্ষার যখন আর এক মাস বাকি তখন আমি খুবই ডিপ্রেশনে পড়ে গেলাম এটা ভেবে যে, বাংলাদেশে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে। আমার মত এরকম মিড-লেভেলের স্টুডেন্টের কি ডাক্তারিতে চান্স হবে? এটা ভেবে আমি যে কত বইয়ের পাতা ভিজিয়েছি তার হিসাব নেই। তারপরও কত কল্পনা-জল্পনা!

তবে আমি এটা বলবো না যে, আমার শুধু পরিশ্রমের জোরেই এটা  সম্ভব হয়েছে। আমার এই ডাক্তারিতে চান্স পাবার মূল হাতিয়ার ছিল দোয়া। আমি ভাবতাম পরিশ্রম তো সবাই করবে কিন্তু আমি পরিশ্রমের পাশাপাশি বেশি বেশি আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে সফলতার প্রার্থনা করবো। আর আমি তাই করতাম। আমি চেষ্টা করে গেছি শুধু এটাই ভেবে একদিন না একদিন আমার এই দোয়া কবুল হবেই, ইনশাআল্লাহ।

আমি আমার রেজাল্টের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করেছিলাম, যেন আমার একটি দোয়া হলেও যেন তা কবুল হয়। আর মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি আমার দোয়া কবুল করেছেন। আমি যতটা না ডাক্তারিতে চান্স পেয়ে ভাগ্যবান মনে করি, তার থেকেও বেশি আমি ভাগ্যবান মনে করি, আমার এডমিশন জার্নি আমি শিখেছি কিভাবে সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করতে হয়। এই এডমিশন জার্নির ফলে আমি আমার সৃষ্টিকর্তাকে আরো কাছ থেকে জানতে পেরেছি। তাই আমি এটাই বলব, আমার সফলতার মূল হাতিয়ার হচ্ছে আমার, আমার বাবা-মা এবং আমার আশেপাশের মানুষদের করা দোয়া। 

আমার বাবা-মা আমার প্রতিটা সময় আমার পাশে ছায়ার মতন ছিলো। আমার এখনও মনে আছে আমি যখন পড়তাম টেবিলে বসে, আমার মা আমার পাশে বসে থাকতো আর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে আর বলতো ‘মা দেখিস তোর পরিশ্রম কখনো বিফলে যাবে না, আল্লাহ তায়ালা তোকে এর প্রতিদান দিবেই’। 

বাবা তার শত ব্যস্ততা রেখে আমার কাছে চলে আসেন পরীক্ষার ৭ দিন আগেই, এসে আমার পড়া ধরা এবং পরীক্ষা নেয়াতে সাহায্য করেন। যেদিন আমার মেডিকেল এডমিশন পরীক্ষা ছিল, সেদিন আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম, যখন রাস্তা দিয়ে হেটে পরীক্ষার হলে ঢুকবো, বাবা বলেছিল, ‘আমার কাছে তুই ডাক্তার হয়ে গেছিস মা। তোর এতো পরিশ্রম দেখিস সফল হবেই। তুই নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিয়ে আয়।’ 

যখন ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বিকাল ৫টায় আমার রেজাল্ট দেখতে পারি। সেই আকাঙ্খিত হলুদ স্ক্রিনটাতে আমার এতদিনের পরিশ্রমের ফল ভেসে উঠে। পাশে আমার মা ছিল সেদিন মাকে ঝাপটে ধরে দুজনে অনেক কেঁদেছিলাম, সেই কান্নাতেও যেনো শান্তি ছিল। আমার বাবাকে আমি প্রথম আমার সফলতা দেখে খুশিতে কাঁদতে দেখি। সেই দিনগুলো সত্যিই ভোলার মতন নয়। আমি চাই, এরকম দিন আমার জীবনে আবার আসুক। এভাবেই হাজারো এডমিশন যোদ্ধারা সফলতা ছিনিয়ে আনুক শুধু একটিবার বাবা মাকে জড়িয়ে ধরার লোভে।

আমি আজও যখন এই দিনগুলোর কথা স্মরণ করি আজও চোখে পানি চলে আসে। এই বাবা - মার ঋণ হয়তো চামড়া কেটেও শোধ করতে পারবো না, কিন্তু তাদের হাসিটুকু আর দোয়াটুকু নেয়ার চেষ্টা আমি আজীবন করে যাবো, ইনশাল্লাহ। 

যাইহোক, যদি কোন অনুজ আমার এই লেখাটি পড়ে থাকেন, তবে আমি তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলবো শুধু পরিশ্রম দিয়ে সামনে আগানো যায় না। থাকতে হয় পরিবার ও আশেপাশে মানুষদের এমনকি আপনার নিজের করা সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া। তাই সবসময় চেষ্টা করে যাবেন পরিশ্রমের পাশাপাশি আপনার সৃষ্টিকর্তার কাছে আপনার সফলতার জন্য দোয়া করার। সফলতার গল্প লিখলে শেষ করা যাবে না। তাই আপাতত মূল কথাটুকুই লিখলাম, সবাই ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : এমবিবিএস
অনুপস্থিতি ও বেসরকারি হাসপাতালে মালিকানা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত