মো. ইশতিয়াক আহাম্মেদ 

মো. ইশতিয়াক আহাম্মেদ 

ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজ (বারডেম), ঢাকা।
এমবিবিএস (শেষ বর্ষ)


১২ নভেম্বর, ২০২৩ ১২:২৬ পিএম

ওয়ার্ডে রোগী-মেডিকেল শিক্ষার্থীর সম্পর্কের চিত্র

ওয়ার্ডে রোগী-মেডিকেল শিক্ষার্থীর সম্পর্কের চিত্র
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জীবন আসলে একটা যুদ্ধক্ষেত্র। পড়াশোনা নিয়ে যুদ্ধ, নিয়মিত ক্লাসে যাওয়া নিয়ে যুদ্ধ, সকালে ঘুম থেকে উঠা নিয়ে যুদ্ধ, ওয়ার্ডে যেয়ে রোগীর সাথে যুদ্ধ—তার মানে আবার এই না যে মারামারি করতে হয় কিংবা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হয়।

‘রোগী তুমি ঘুমিয়ে থাকো, আমরা আছি তোমার সাথে’—কথাটি শুনতে স্লোগানের মতো মনে হলেও এটাই সত্যি। আর এটাই মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জীবনের বাস্তবতা। আইটেম, কার্ড, টার্ম ও প্রফেশনাল পরীক্ষাসহ প্রত্যেকটি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের ঠিক এমন চিত্রই দেখা যায় ওয়ার্ডগুলোতে। রোগীর হাতে-পায়ে ধরে তার রোগের বিবরণ নেওয়া, একটার পর একটা প্রশ্ন করা। কখনো রোগী যান রেগে, কখনো আবার  সব কিছু বলতেও চান না। 

রোগীরা এখন বুঝে কোনটা ডাক্তার আর কোনটা শিক্ষার্থী। যতই গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে ভাব নেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু ভাব আর আসে না। কারণ একটু পরই স্যার ম্যাডামরা এসে এমন সব ভুল খুঁজে বের করেন, যা শুনে আসলে তখন নিজেরও হাসি পায় আর রোগীরাও তখন হাসতে থাকে। যদিও স্যারদের সামনে হাসতে পারি না, কিন্তু পরে বন্ধুমহলে এসে সেই হাসিটা শেষ না করা পর্যন্ত যেন আর স্বস্তি পাই না। 

তবে আবেগের বশে যেমনটাই বলি, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জীবন আসলে একটা যুদ্ধক্ষেত্র। পড়াশোনা নিয়ে যুদ্ধ, নিয়মিত ক্লাসে যাওয়া নিয়ে যুদ্ধ, সকালে ঘুম থেকে উঠা নিয়ে যুদ্ধ, ওয়ার্ডে গিয়ে রোগীর সঙ্গে যুদ্ধ—তার মানে আবার এই না যে মারামারি করতে হয় কিংবা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হয়। এখানে যুদ্ধ বলতে রোগীকে অনেক জোর করে তার সব তথ্য বের করে আনতে হয়।

আবার এমন অনেক রোগী পাওয়া যায়, যারা তাদের জীবন বৃত্তান্ত বলতে শুরু করে। কার পরিবারে কি হলো, কার ছেলে-মেয়ে দেখতে পারে না, কার জমি কে দখল করে নিয়ে গেল—এসব ইতিহাস শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে ভুলেই যায় যে আমি রোগের বিবরণ নিতে এসেছিলাম।

বন্ধুমহলে আবার অতি আবেগী কেউ কেউ আছেন, যারা রোগীর জ্বলন্ত আগুনে আরও একটু ঘি ঢেলে দেন। যাই হোক, অনেক কষ্টে ছলে-বলে-কৌশলে তাদের কথার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে, সহজ ভাষায় বলতে গেলে রোগীর স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার হনন করে রোগের সাথে সম্পর্কিত তথ্য বের করে আনতে হয়।

এক্ষেত্রে যারা একটু চাপা স্বভাবের তাদের জন্য এই প্রক্রিয়াটা অনেক বড় রকমের একটা যুদ্ধ। প্রথমে শয্যার কাছে যাওয়ার পর অনেক বড় চিকিৎসক মনে করে রোগী শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসতে চান। তখন তাকে অভয় দিয়ে বলতে হয় আপনি শুয়ে থাকেন।

পরিচয় পর্ব সেরে নিতে নিতে আসলে অনেক কিছুই সম্পন্ন হয়ে যায়। কথা বলতে বলতে রোগী ঠিক বুঝে যান, কর্তব্যরত নবীন চিকিৎসক কত বড় বিশেষজ্ঞর। তখন আর গলায় ঝুলানো বিএসএমআই বা লিটম্যান স্টেথোস্কোপে কাজ হয় না।

ভাবনার বিষয় হলো, এই সেই রোগী যাকে কিছুক্ষণ আগে অভয় দিয়ে বলা হয়েছিল আপনি শুয়ে থাকেন, সে এখন শুয়ে আছে ঠিকই, তবে উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে। চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ। তবে সেই বিরক্তিকে ভালোবাসার চাঁদরে মুড়িয়ে খুব কাকুতি মিনতি করে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘মা,আপনার বিয়ে হয়েছে কত বছর হলো?’

এবার তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন, ‘বিয়া হইছে কত বছরে এটাও লাগবো আপনাদের?’ হিস্ট্রি লিখা বাদ দিয়ে শুরু করতে হয় কাউন্সিলিং। কেন লাগবে কি জন্য লাগবে বুঝিয়ে না বলা পর্যন্ত তার মুখ দিয়ে একটি কথাও আর বের করা যায় না। এরই মাঝে আবার আত্মীয়-স্বজনের ফোনের অভাব নেই। একের পর এক পর ফোন-ভিডিও কল।

এ পরিস্থিতিতে অপেক্ষার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হয়, কখন শেষ হবে কল, কখন শুনবো তার পরিবারে কারো ডায়াবেটিস কিংবা প্রেসারের সমস্যা আছে কিনা। তবে এত কিছুর পরও রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার পর ওয়ার্ডে গিয়ে যখন জিজ্ঞেস করি,  কি অবস্থা এখন? বিরক্তির সেই কালোমেঘে ঢাকা মুখ থেকে বেরিয়ে আসে এক নির্মল হাসি। সেই শেষ হাসিটা দেখার জন্যই হয়তো প্রতিদিন ওয়ার্ডে আসি।

এএনএম/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক