ডা. সাকলায়েন রাসেল

ডা. সাকলায়েন রাসেল

অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর এন্ড অ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্ট, ভাসকুলার সার্জারি, ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হসপিটাল এন্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট। 


০৫ অগাস্ট, ২০২৩ ০৩:১৯ পিএম

ওপারে ভালো থাকুক নাসরিন

ওপারে ভালো থাকুক নাসরিন
মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ পদটি এখন বিলুপ্ত। সবার পরিচয় মেডিকেল প্রমোশন অফিসার হিসেবে। অন্তত পদটা সম্মানের।

রাতেই ভিজিটে এসেছে মেয়েটা। ঘড়িতে তখন প্রায় ৯টা ছুঁই ছুঁই। ডান হাতে বেশ ভারী ব্যাগ। ব্যাগ সামলাতে হেলে গেছেন একদিকে। তিনি অনেক লম্বা। সচরাচর এমন লম্বা মেয়ে চোখে পড়ে না। হাঁটছেন মন্থর গতিতে ও হেলেদুলে। হাঁটার সময় হাপাচ্ছেন। কষ্ট হচ্ছে তার দেহের ভার বহন করতে। এই সময়টা মেয়েদের অনেক কষ্ট হয়, ওজন বাড়ে ও হাতে পায়ে পানি আসে। নিজের দেহ নিজের কাছেই ভারী লাগে, তবুও পুলক জাগে মনে। নিজের শরীরে অন্য একটা শরীরকে বহন করা। আস্তে আস্তে বেড়ে উঠে অন্য একটি প্রাণ নিজের উদরে।

কাছে এসেই সেই চেনা হাসিটা ছুড়ে দিলেন। সালাম দিয়ে কুশলাদি জানতে চাইলেন। নাসরিনের (ছদ্মনাম) কথা বলছিলাম। বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে একটি দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কর্মরত আছেন তিনি।  সবার কাছে তার পরিচয় মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ।

নিজ পেশা ও কাজের প্রতি নাসরিনের ডেডিকেশন অনেক বেশি। সকাল থেকে রাত অবধি হাসপাতালেই কাটান। সন্ধ্যার পর সাধারণত হাসপাতালে সিনিয়র খুব বেশি থাকে না। বিক্রয় প্রতিনিধিদের আনাগোনাও তাই কমে যায়। কিন্তু নাসরিনের অবসর নেই। তিনি সুযোগ পেলেই আসেন। সকল স্বাস্থ্য সেবকদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন। ছোট বড় সকল চিকিৎসকের সাথে কথা বলাটা জরুরি মনে করেন। নিজের কোম্পানির ভালো দিক তুলে ধরেন। নিজের ওষুধের গুণাগুণ বর্ণনা করেন। ঝড় বৃষ্টি সব পিছনে ফেলে নিজ দায়িত্ব পালনে অবিচল তিনি। একটু বাড়তি সময়, একটু বাড়তি ডেডিকেশন দিলে হয়ত আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ পূরণের স্বপ্ন।

মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের চাকরিটাই একটু ভিন্ন। অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং, শ্রমের ও হতাশার। সবটুকু উজাড় করে দিয়ে মাস শেষে সামান্য স্বস্তি পাওয়ার যুদ্ধ। তবে সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কোনো মূল্য নাই এখানে। মূল্য কেবল সফলতার। এই সফলতা আসে ওষুধ কতটুকু প্রমোট করতে পারলেন তার উপর। আর সফল প্রমোশনের মাপকাঠি একটাই, তা হলো ওষুধ বিক্রির হার কতটুকু বাড়ল। ঘামের মূল্য তখনই পাবেন, যখন আপনি অধিক ওষুধ বিক্রির কারণ হবেন। চাকরির নিশ্চয়তা এই সফলতার উপরেই নির্ভরশীল। নির্ভর করে নিজের প্রমোশনও। সফলতার সিড়িতে পা দিতে চাইলে তাই অনেকগুলো চরাই উৎরাই পেরিয়ে আসতে হয়। দিতে হয় অনেকগুলো প্রমাণ, অনেকগুলো পরীক্ষা।

এই পেশাটাকে আমার কাছে চ্যালেঞ্জিং মনে হওয়ার মূল কারণ মনে হয় এদের টার্গেট গ্রুপকে। টার্গেট গ্রুপ বলতে চিকিৎসক। একজন চিকিৎসক মানেই একজন বিজ্ঞানী, একজন স্বশিক্ষিত মানুষ, সমাজের সর্বোচ্চ বিদ্যা অর্জনকারীদের একজন। মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরা সফলতার মাঠে এসে প্রতিপক্ষ হিসেবে পান এই উচ্চ শিক্ষিত চিকিৎসকদেরকেই। শিক্ষা বলেন, জ্ঞান বলেন বা ব্যাক গ্রাউন্ড বলেন। সাধারণত এসবের বিচারে একজন চিকিৎসকের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকেন একজন রিপ্রেজেনটেটিভ। মাঠে খেলা হতে হয় সমানে সমানে, কিন্তু বিক্রয় প্রতিনিধিদের খেলতে হয় অসম প্রতিযোগীর সাথে। চিকিৎসককে মোটিভেট করা সহজ কোন বিষয় না। এখানে আবেগের মূল্য নেই। খেলতে হয় বিজ্ঞান দিয়ে, যুক্তি দিয়ে।

সমাজে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ একটি গালির মত। দূর দূর করে এদের গতিরোধ করা খুব সহজ। প্রতিটা কাজে বাধা। হাসপাতালে ঢুকতে গেলে বাধা, ঢোকার পর বাধা। সবচেয়ে বড় ভাবে থাকেন হাসপাতালের সিকিউরিটি কিংবা আয়া বুয়া। এদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভিতরে প্রবেশ করতেই আসে অথোরিটির বাধা। নিদিষ্ট সময়ের আগে প্রবেশ নিষেধ, নিদিষ্ট সময়ে প্রবেশ করতে পারলে শুরু হয় চ্যালেঞ্জের দ্বিতীয় স্তর। তা হলো-অপেক্ষা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। অনেক অপেক্ষার পর যখন সুযোগ ভিতরে যাওয়ার, চেম্বারে তখন ক্লান্ত চিকিৎসক। ঘরে ফেরার তাড়া তার। অথবা এখনো অনেক রোগী, দ্রুতই বের হতে হবে। নয়ত অপেক্ষমাণ রোগীদের রক্তচক্ষু অগ্নিবর্ণ ধারণ করবে। থাকে নানা সায়েন্টিফিক প্রোগ্রামে চাপ। সকল চাপ অতিক্রম করে ঘরে ফিরতেই শুরু হয় অন্য এক জীবন। সে জীবনে প্রাপ্তির খাতাটা খুলে বসা হয় না কখনো। খুললেই বিষণ্ণতা ভর করে।

এই তো কদিন আগেই কোভিড গেল। সবাই যখন গৃহবন্দী, তখন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরা নির্ভয়ে চষে বেড়িয়েছেন এই হাসপাতাল থেকে সেই হাসপাতাল। কত মুমূর্ষু কোভিড রোগীকে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। কেউ কেউ নিজেও আক্রান্ত হয়েছেন। জীবন দিয়েছেন অনেকে। কেউ রাখেনা সে খবর। এতো কিছুর বিনিময়ে সংসারে কিছু অর্থ আসে। সে অর্থে জীবন সচল থাকে। পাওয়া আর হয়ে ওঠে না প্রাপ্য সম্মান টুকু।

সাংবাদিকদের কলমে খুব একটা ধরা দেয় না তাঁদের এই চ্যালেঞ্জিং জীবনের গল্পগুলো। যা আসে, তাতে শুধু হেয় হতেই হয়। অনেকে বলেন কি দরকার চিকিৎসককে ব্র‍্যান্ড প্রমোট করতে। চিকিৎসকরা জেনেরিক নাম লিখবেন। ধরুন আজ থেকে সব চিকিৎসকই জেনেরিক নাম লেখা শুরু করলেন। তখন রোগী সেই প্রেসক্রিপশন নিয়ে যাবে ফার্মেসিতে। দোকানদার তখন ঠিক করবেন কোন কোম্পানির ওষুধ দিবেন। আচ্ছা দোকানদার কোন কোম্পানির ওষুধ দিবেন? অবশ্যই যেটাতে মুনাফা বেশি। ফলে দেখা যাবে যদুমধু কোম্পানির ওষুধ বেশি বিক্রি হবে। কারণ ভাল কোম্পানিগুলোর মুনাফা মার্জিন কম হবে এটাই স্বাভাবিক।

মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ পদটি এখন বিলুপ্ত। সবার পরিচয় মেডিকেল প্রমোশন অফিসার হিসেবে। অন্তত পদটা সম্মানের। শুনতেও ভাল লাগে, কিন্তু সর্বদা নেগেটিভ প্রচারের ভিড়ে নিজের পরিচয়ই তো ভোলার উপক্রম। তবে নাসরিনকে ভুলিনি। অনেকদিন আসেনা নাসরিন। ধরেই নিয়েছি মা হয়েছে, ছেলে হয়েছে নাসরিনের। আমি অবশ্য আগেই বলেছিলাম ছেলে হবে। শুনে লজ্জায় লাল নাসরিন। 'স্যার, ছেলে হোক মেয়ে হোক আলহামদুলিল্লাহ স্যার। দোয়া রাখবেন যেন সুস্থ সন্তান হয়।'

নাসরিনের কথাই ভাবছি। ভাবছি সন্তানের কথা ভেবে হয়ত আর এ পেশায় ফিরবে না নাসরিন। সন্তানকে সময় দিবে, সংসারকে সময় দিবে। নাসরিনের খোঁজ পেতে দেরি হল না। ওর বসের সাথে দেখা। নাসরিনের কথা জিজ্ঞেস করতেই চুপসে গেলেন তিনি। লম্মা একটা শ্বাস ফেলে বললেন, এতো ভাল ছিল মেয়েটা। কত করে বললাম ছুটি নাও, নিল না। চেয়েছিল ছুটিগুলো ডেলিভারির পর ব্যবহার করতে, কিন্তু ডেলিভারির দিনেই চিরদিনের ছুটি নিয়ে চলে গেছে।

শ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিলেন রফিক সাহেব। কিছুক্ষণের শ্বাস বিরতি দিয়ে আবার বলা শুরু করলেন। ছেলে হয়েছে নাসরিনের। শুনেছি এখন নানির কাছে বড় হচ্ছে। চোখের সামনে নাসরিনকে দেখছি। পেটে হবু সন্তান। হাতে ঝোলানো ব্যাগ। নাসরিন হাটছে ধীরে, খুব ধীরে। নাসরিনদের ত্যাগ আমরা মনে রাখিনা। তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকুও দিতে জানিনা।

অথচ প্রতিমুহূর্তে ওষুধের তথ্য সরবরাহ করে চিকিৎসককে আপডেট রেখে রোগী সেবায় সরাসরি নিয়োজিত থাকার মহান কাজটি পালন করে যাচ্ছেন নাসরিনের মতো এ পেশার হাজারো মানুষ। ওপারে ভাল থাকুক নাসরিন। যারা এপারে আছেন তারাও।

এএইচ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ
নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা সংকটে মেডিকেলে উৎসাহ হারাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা
ছাত্রশিবির মেডিকেল জোনের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে মত

নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা সংকটে মেডিকেলে উৎসাহ হারাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

ছাত্রশিবির মেডিকেল জোনের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে মত

নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা সংকটে মেডিকেলে উৎসাহ হারাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত