দুর্ঘটনা, গালমন্দ ও অপমানসূচক কথাবার্তা ট্রমার অন্যতম কারণ
আসাদুল ইসলাম দুলাল: ট্রমা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত প্রাপ্ত হওয়া। পরিবার ও সামাজিকভাবে যে কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে, একজন মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে। ট্রমার কারণে অনেকে আজীবনের জন্য শারীরিক বা মানসিক অক্ষমও হয়ে যান। সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে, এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর পৃথিবীতে ট্রমার কারণে মৃত্যুবরণ করেন প্রায় ১২ লাখ মানুষ ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রমাজনিত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে চিকিৎসার পাশাপাশি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, এবং ট্রমা প্রতিরোধে ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে গড়ে তুলতে হবে সচেতনতা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দুর্ঘটনায় নিহত হয়, এবং আহত হয় পাঁচ কোটির বেশি মানুষ। উন্নয়নশীল দেশে ৫০ শতাংশ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বাংলাদেশে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
কারণ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. মো. তৈয়বুর রহমান রয়েল মেডিভয়েসকে বলেন, ট্রমা বলতে শরীরে বা মনে সৃষ্ট কোন আঘাতকে বোঝায়। বিভিন্ন কারণে ট্রমা হতে পারে। যেমন-সড়ক দুর্ঘটনা বা চোখের সামনে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, আগুন লাগা, নারী-শিশু ও বয়স্কদের প্রতি পারিবারিক হয়রানি, যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ট্রমা হতে পারে। এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় পোস্ট ট্রমাটিক ট্রেস ডিজঅর্ডার।
এ ছাড়া আরও যেসব ট্রমা রয়েছে, তা হলো- অ্যাকিউট ট্রেস ডিজঅর্ডার, অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডার ও ডিসিওসিয়েটিভ ডিজঅর্ডার।
শারীরিক ও আচরণগত সমস্যা
ট্রমার লক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে ট্রমার লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর মধ্যে দুশ্চিন্তাজনিত সমস্যা দেখা দেয়, শরীর অনেক উত্তেজিত হয়ে পড়ে। যেমন- সাধারণত বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরানো, বুকের মধ্যে অস্বস্তিভাব, ঘেমে যাওয়া ও হাত-পা ঝিনঝিন করা। পাশাপাশি কিছু মানসিক লক্ষণ দেখা যায়। যেমন—অনেকে দুঃস্বপ্ন দেখে অর্থাৎ যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, এটা স্বপ্নের মধ্যে ফিরে আসে, বীভৎস দৃশ্যগুলো কল্পনার মধ্যে বারবার ফিরে আসা, অনাকাঙিক্ষত দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে আসে এবং ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠা।
এই ধরনের রোগীরা কিছু বিষয় সবসময় পরিহার করেন। যেমন—যেখানে দুর্ঘটনা ঘটছে, সেখানে না যাওয়া, ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো পোষাক এবং ঘটনা সম্পর্কিত কোনো কথা পুনরায় না শোনা।
তিনি আরও বলেন, তাদের মধ্যে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। বাস্তবতার বাইরের জগতে চলে যাওয়া বা ঘোর লাগানো অবস্থায় থাকে। তার মধ্যে জালাতন সৃষ্টি হতে পারে, এটার কারণে ইমোশনাল ডিজ রেগুলেশন হতে পারে। ফলে খুব খিটখিটে বা আচরণগতভাবে আগ্রাসী হতে পারে অর্থাৎ অল্প কথায় রেগে যাচ্ছে বা খুব চিৎকার চেঁচামেচি করছে। খুব বেশি আবেগী হয়ে যাওয়া, ও অনেকের আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়।
এক্ষেত্রে শারীরিক ধকল বা মানসিক ধকল কাটাতে না পেরে অনেকে নিজেকে আঘাত করেন। আবার কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। এটা হতে বের হওয়ার জন্য অনেকে মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়েন।
যত্নবান হওয়া
আচরণ কেমন হবে জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, অবশ্যই তার সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে। তাদের প্রতি যত্ন নেওয়া উচিত। তাদের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, তাদের সঙ্গে চাপাচাপি করা যাবে না। মানসিকভাবে প্রশান্তি দেওয়া, শারীরিকভাবে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া। এই ধরনের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
সচেতনতা সম্পর্কে ডা. মো. তৈয়বুর বলেন, ট্রমা প্রতিরোধে সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আইনের সক্রিয় প্রয়োগ করতে হবে, এতে সামাজিক সহিংসতা কমবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে, যেন মানুষ যথেষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। ব্যক্তি পর্যায়ে মানসিক প্রস্তুত থাকা দরকার, যাতে যে কোনো ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়।
জাতীয় অপরাধ-সংক্রান্ত রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে প্রায় চার লাখ ১৩ হাজার ৪৫৭ জন শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন। ট্রমার কারণে রোগীর হার এখন আতঙ্কজনকভাবে বাড়ছে। এতে শুধু অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার বাড়ছে তা নয়, বরং সড়ক দুর্ঘটনায় তরুণদের মৃত্যুর কারণে জাতীয় উৎপাদনে বিপর্যয় আনছে।
বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনা এবং দুর্যোগের কারণে ট্রমার ঘটনা ঘটছে। এ থেকে প্রাণহানিও বেড়েই চলেছে। তাৎক্ষনিক চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেককে পঙ্গুত্ব বরণ বা অঙ্গহানির ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সিফাত-ই-সাইদ বলেন, সাইকোলজিক্যাল ট্রমা হচ্ছে মনের উপর আঘাতজনিত ঘটনা। মেডিকেল ভাষায় সাধারণত ট্রমা মানে আঘাত। কারও সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা ভেঙ্গে গেলে, কোনো অঙ্গহানি ঘটলেও তাকে ট্রমা বলা হয়-কিন্তু মেডিকেলের ভাষায় সাইকোলজিক্যাল ট্রমা হচ্ছে মনের উপর আঘাত। সাধারণত বড় কোনো আঘাতকে ট্রমা বলা হয়।
কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. সিফাত-ই-সাইদ জানান, শারীরিকভাবে আঘাত করা, মানসিক নির্যাতন করার কারণে এটি হতে পারে। যেমন—সারাক্ষণ অমূলক কথা, শাসন, গালমন্দ করা ও অপমানসূচক কথাবার্তা বলা। এই ধরনের ঘটনা যদি কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সময়ের সম্মুখীন হয়, তাহলে তার ট্রমা হতে পারে। যৌন হয়রানি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়ক দুর্ঘটনা ও ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির কেউ সম্মুখীন হলে, সেটাও হবে ওই ব্যক্তির ট্রমার কারণ।
লক্ষণ
ট্রমার লক্ষণ সম্পর্কে এই সাইকিয়াট্রিস্ট বলেন, সাধারণত ট্রমা আক্রান্ত ব্যক্তি অস্থির থাকে, সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকে, রাতে ঘুমের ব্যঘাত ঘটে, ঘুমালে দুঃস্বপ্ন দেখেন, হঠাৎ করে চমকে উঠেন, মেজাজ খিটখিটে থাকে, আঘাতজনিত ঘটনাগুলো বারবার অনিচ্ছাকৃত মনে পড়ে। যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনাকে তারা এড়িয়ে চলেন।
এ ছাড়া ট্রমা রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হয়, অস্বাভাবিক আচরণ, শারীরিক বিভিন্ন ব্যথা বেড়ে যায়, শ্বাস কষ্ট ও খাবারে অরুচি হয়। সামগ্রিকভাবে তাদের মন থেকে শান্তি চলে যায়। অশান্তি, অস্থিরতা মনের মধ্যে সবসময় বিরাজ করে এবং কি করলে একটু শান্তি পাওয়া যাবে, এটাও তারা বুঝতে পারেন না।
এই ধরনের রোগীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ট্রমা রোগীদের তাৎক্ষণিক কিছু চিকিৎসা প্রদান করা উচিত। এই চিকিৎসার জন্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই, একজন মানুষ ভালো আচরণের মাধ্যমে এই চিকিৎসা দিতে পারেন। এটা সময়মতো দিতে হবে, তাহলে ট্রমার তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার প্রয়োজনীয় কথাগুলো আন্তরিকভাবে শুনতে হবে। তার ওই ট্রমার ঘটনা সম্পর্কে চাপাচাপি করা যাবে না। দীর্ঘ মেয়াদী ট্রমার ভিতর দিয়ে গেলে, তাকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। পাশাপাশি তাকে ওষুধ ও কাউন্সেলিং শুরু করতে হবে।
ট্রমা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ট্রমাটা যেন আর না ঘটে অর্থাৎ হওয়ার মতো পরিস্থিতি না হয়, সেজন্য সামাজিকভাবে এটার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের নয়, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।