১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৫:২২ পিএম

নিয়মিত ‘একটিভিটি লগ’ অনুসরণে ঢাবির তৃতীয় প্রফে সেরা অনন্যা

নিয়মিত ‘একটিভিটি লগ’ অনুসরণে ঢাবির তৃতীয় প্রফে সেরা অনন্যা
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ২০তম স্থান অর্জন করা অনন্যা প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্রথম ও দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলোর মে-২০২২ এর তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী জিনিয়া জান্নাত অনন্যা।

তিনি জয়পুরহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে জয়পুরহাট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। 

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ২০তম স্থান অর্জন করা অনন্যা প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্রথম ও দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। তবে প্রবল নিয়মানুবার্তিতা ও সময়ানুবার্তিতার কল্যাণে তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় হৃত প্রথম অবস্থান ফিরে পান তিনি। 

ধারাবাহিক সাফল্যের রহস্য জানাতে শুক্রবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মেডিভয়েস স্টুডিওতে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন জয়পুরহাটের মেয়ে অনন্যা। তুলে ধরেন লক্ষ্য অর্জনে নিজের পরিশ্রমপ্রিয়তা ও নিয়মিত অধ্যাবসায়ের কথা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু নাঈম মনির। অনুলিখন: সাহেদুজ্জামান সাকিব।    

চমৎকার ফলাফলে অভিভূত

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা জানান, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন পড়াশোনা, আইটেম কার্ড, টার্ম, প্রফ—এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় হচ্ছে পরীক্ষার ফলাফল। আর এ ফলাফল যদি চমৎকার আনন্দের হয়, তাহলে তো আর কিছুই বলার থাকে না। আমি রেজাল্ট পাওয়ার পর খুবই অভিভূত হয়েছি এবং এর জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।

যে কৌশলে স্বপ্ন ছোঁয়া

তিনি বলেন, আমি সব সময় বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার ক্ষেত্রে নিয়মানুবার্তিতা ও সময়ানুবার্তিতা মেনে চলা খুবই জরুরি। আমি খুবই সুশৃঙ্খল উপায়ে পড়াশোনার চেষ্টা করি। প্রতিদিন লেকচার ক্লাসে যোগ দিই, ল্যাবে যাই, ওয়ার্ডে যাই এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। আমি নিয়মানুবার্তিতা বজায় রাখতে একটা ‘একটিভিটি লগ’ অনুসরণ করি, যেখানে আমার সারাদিনের কাজগুলো লেখা থাকে। এভাবে রুটিন অনুযায়ী, পড়াশোনা করার ফলে পরীক্ষার আগে থেকেই আমার মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।

প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলাফল

ঢামেক ১৭-১৮ সেশনের এ শিক্ষার্থী বলেন, আমি সব সময়ই চেষ্টা করি, নিজের তরফ থেকে সর্বোচ্চটা দেওয়ার এবং ফলাফল যাই হোক তাতেই সন্তষ্ট থাকি। এবারের প্রস্তুতি নিয়ে আমি সন্তষ্ট ছিলাম এবং আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল। তবে ফলাফল প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভালো হওয়ায় অভিভূত হয়েছি।

সাফল্যের নেপথ্যে যারা 

অনন্যা বলেন, আমার এ সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান পরিবারের। আমার বাবা-মা, ছোট ভাই, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী এবং বিশেষ করে আমার স্বামী আহনাফ সাদিক হোসেন, যিনি আমাকে সবসময়ই অনেক অনুপ্রাণিত করেন। সফলতার ব্যাপারে আমি যখন দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে যাই, তখন তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেন। এ ছাড়া আমার বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক-শিক্ষিকা সবার অনেক বেশি অবদান রয়েছে। আরেকজনের কথা বিশেষভাবে বলবো, তিনি হচ্ছেন আমার মেডিকেলের রুমমেট জাকিয়া জান্নাত জেবা। আমার পড়াশোনার ব্যাপারে সবসময় সে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে এবং সাহায্য করে।

সাফল্যের পথে ধারাবাহিক 

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা বলেন, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমি জাতীয় মেধায় ২০তম হয়েছিলাম এবং প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় ১ম ও দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় ২য় হয়েছিলাম। দুই প্রফের আলোকে তৃতীয় প্রফের ভাইভাসহ বিভিন্ন জায়গায় পরিচিতি বলতেন, ‘তাহলে কি তৃতীয় প্রফে তৃতীয় হচ্ছো, তুমি?’ 

অকৃতকার্যদের প্রতি পরামর্শ 

অনন্যা বলেন, মেডিকেল কলেজের প্রত্যেক শিক্ষার্থীই অনেক বেশি পরিশ্রম করে এবং পরীক্ষার সময় তারা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়। আমার সহপাঠীদের মধ্যে যারা কোননা কোন কারণে খারাপ করেছে, তাদের আসলে মন খারাপ করার কিছু নেই। তারা হয়তো আমার মতোই কিংবা আমার চেয়েও বেশি পড়াশোনা করেছে। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, ফাইনাল ইয়ারে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি পড়ার জন্য প্যাথলজি, ফার্মাকোলজি, মাইক্রোবায়োলজি—এই সাবজেক্টগুলো প্রতিদিন একবার করে রিভিশন করতেই হয়। তো তারা যদি এই সময়টাতে ধৈর্য্য ধরে সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে পড়াশোনা চালিয়ে যায় তাহলে এই পড়াশোনার মধ্য দিয়ে আগের পড়াশোনাগুলো কাভার করতে পারবে এবং আসন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ডাক্তার হওয়ার পথচলা অব্যাহত রাখতে পারবে।

ভর্তি পরীক্ষার সাফল্য যে কারণে হোঁচট খায় 

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা বলেন, ভর্তি পরীক্ষার সাফল্য প্রফগুলোতে ধরে রাখতে না পারার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, মেধাবী হওয়ার দরুণ তারা জানেন, যে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সিলেবাস সম্পন্ন করতে পারবেন। ফলে তারা অনেক সময় একটু কম কম পড়ে অন্যান্য কাজে সময় একটু বেশি ব্যয় করেন এবং পরীক্ষার আগে টানা পড়াশোনা করে পাস করে যান। অনেক বেশি মেধাবী হওয়ায় তারা হয়তো পাস করে যান, কিন্তু কাঙিক্ষত চমকপ্রদ ফলাফল করতে পারে না। আমার মনে হয়, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য নিয়মিত হওয়া খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে প্রতিটি এক্সাম, প্রতিটি টার্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

সোশাল মিডিয়ার প্রভাব

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা বলেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীরা যে বয়সে আছে, আমার মনে হয় না তাদেরকে কেউ বারণ করে কিংবা বুঝিয়ে শুনিয়ে সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখতে পারবেন। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিজেদের আরও আত্মসংযমী হতে হবে। মনে রাখতে হবে, সবার আগে আমার পড়াশোনা, তারপর অন্যকিছু। আমার বড় পরিচয় আমি একজন শিক্ষার্থী। সুতরাং আমার প্রধান কাজ হবে পড়াশোনা করা। গ্রুপ স্টাডি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভালোলাগার বিষয় সার্জারি 

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা আরও বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই নিজেকে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) সার্জন হিসেবে কল্পণা করি। আর এ কারণে সার্জারির প্রতি আমার অনেক ঝোঁক। তবে ইন্টার্নশিপের সময় ক্লিনিক্যাল ওয়ার্ডগুলোতে হাতে-কলমে কাজ করে অন্য বিষয়ের প্রতি ভালোলাগা তৈরি হলে বিবেচনা করতে পারি। তবে দিনশেষে সার্জারিই আমার ভালোলাগার সাবজেক্ট।

যে কারণে সার্জারিতে ঝোঁক 

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা বলেন, আমার মনে হয় একটা মানুষ তখনই সার্জারি করে, যখন তার সামনে অন্য কোনো উপায় থাকে না। হয়তো সার্জারিটা করলেই রোগী বাঁচবে না হলে বাঁচবে না—জীবন-মৃত্যুর এমন সন্ধিস্থলে কাজ করাটা আসলে চ্যালেঞ্জিং, আর আমি চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি।

ক্যারিঅন বাতিল হলে মেধাবীদের প্রতি অবিচার হবে 

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা বলেন, সিজিপিএ পদ্ধতি বাংলাদেশে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু আছে। সুতরাং এ পদ্ধতি মেডিকেলে চালুর যে চিন্তা-ভাবনা চলছে, এটা আসলে অবাক করার মতো কিছু না। তবে আমার মনে হয়, মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আলাদা এবং আমাদের দেশের মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা বহির্বিশ্বের মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থার সমানুপাতিক বা সামঞ্জস্যপূর্ণও না। এক্ষেত্রে সিজিপিএ পদ্ধতি চালু করা কতটুকু যৌক্তিক, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরেকটু ভেবে দেখার অনুরোধ করবো। আর ক্যারিঅন পদ্ধতি নিয়ে যদি বলি, একজন শিক্ষার্থী সবসময় এক রকম শারীরিক ও মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাবে না। একজন শিক্ষার্থী অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি পরীক্ষা দিতে না পারে, তাহলে সে যেন পরবর্তীতে তার ব্যাচের সাথেই পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে পারে, এর জন্য ক্যারিঅন পদ্ধতি থাকা খুবই জরুরি। তা না হলে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর প্রতি অবিচার করা হবে। 

নবীন মেডিকেল শিক্ষার্থী ও ভর্তিচ্ছুদের প্রতি 

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা বলেন, যারা মেডিকেলে পড়তে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে বলবো, তোমরা যদি সত্যিই মেডিকেলে পড়তে চাও এবং এই পেশার প্রতি যদি তোমার ভালোলাগা-ভালোবাসা থাকে তাহলেই তুমি মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নাও এবং মেডিকেলে ভর্তি হও। কারণ মেডিকেলে নিয়মানুবার্তিতা, অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং একই সাথে সহনশীলতা থাকতে হবে। এ পেশার প্রতি যদি কারও ভালবাসা না থাকে, তাহলে এই পর্যন্ত এসে সে হতাশ হয়ে যেতে পারে। 
আর নবীন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বলবো, যেহেতু এটা একটা অনেক লম্বা পথ সুতরাং ধৈর্য নিয়ে এগোতে হবে, নিয়মিত ক্লাস করতে হবে। শুধুমাত্র মেডিকেলে চান্স পাওয়ার জন্য যেহেতু অনেক পরিশ্রম করেছো, তাহলে এ সুযোগ কেন নষ্ট করবে।

সহপাঠ্যক্রম নিয়ে পরামর্শ 

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই বিতর্ক, কুইজ, অভিনয়সহ বিভিন্ন কো-কারিকুলাম এক্টিভিটিসে অংশগ্রহণ করতাম। ঢাকা মেডিকেলে এসেও করেছি। তবে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বেলায় দেখা যায়, আশেপাশে কি হচ্ছে এসব বিষয়ে তারা একটু কম খোঁজ-খবর রাখেন। তারা পড়াশোনায় এতটাই মগ্ন থাকেন যে, নিজের একটা সিভি বানানোর ক্ষেত্রেও খুব একটা গুরুত্ব দেন না। আমি মনে করি, বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশ নেওয়া উচিত। আমি নিজেও সন্ধানীর একজন নিয়মিত সদস্য ছিলাম এবং বর্তমানে টেস্টবডি নামে একটি স্টার্টআপের কো-ফাউন্ডার হিসেবে কাজ করছি। তাই আমি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বলবো তারা যদি পড়াশোনার পাশাপাশি কো-কারিকুলাম এক্টিভিটিসগুলো নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করে, তাহলে এই কম্পিটিশনের যুগে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো তারাও এগিয়ে থাকবে। 

মেডিভয়েস: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

জিনিয়া জান্নাত অনন্যা: আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত