২৭ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৯:৫৮ পিএম

রেসিডেন্সি: সাবজেক্ট পছন্দে ভালো লাগাকে গুরুত্ব দিন

রেসিডেন্সি: সাবজেক্ট পছন্দে ভালো লাগাকে গুরুত্ব দিন
ডা. মো. আকতার উজ জামান বলেন, আসলে কোর্সে ঢোকাটাই সব না, সফলতার সাথে শেষ করাটাই মূল বিষয়। কোর্স সম্পন্ন করে, একজন নিউরোসার্জন হয়ে যেন দেশের মানুষের সেবা করতে পারি, এই স্বপ্নই দেখি আমি। আল্লাহ যেন আমার সেই স্বপ্ন পূরণ করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) এমডি-এমএস রেসিডেন্সি কোর্সে ভর্তি পরীক্ষায় নিউরোসার্জারি বিভাগে বেসরকারি প্রার্থী হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৬ জন। তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন ডা. মো. আকতার উজ জামান। গৌরবান্বিত ফলাফলের নেপথ্য কথা জানতে মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিল বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) সাবেক এ শিক্ষার্থীর। ভর্তি যুদ্ধে অংশ নিতে তাঁর প্রস্তুতি কৌশল তুলে ধরার পাশাপাশি রেসিডেন্সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণেচ্ছুদের দিয়েছেন বাস্তবভিত্তিক বেশ কিছু পরামর্শ। পাঠকদের জন্য এর চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওমর ফারুক ফাহিম।

স্বপ্নময় কোর্সে উত্তীর্ণ হওয়ার অনুভূতি 

ডা. মো. আকতার উজ জামান: আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভাল লাগছে। আমি আসলে যেই সাবজেক্টে চান্স পেতে চেয়েছি বা যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চেয়েছি, সেই যাত্রার প্রথম ধাপ উত্তীর্ণ হতে পেরে নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করছি। 

প্রস্তুতি গ্রহণের সময়সীমা

ডা. মো. আকতার উজ জামান: আমার মনে হয় প্রস্তুতির সময় একেকজনের জন্য একেকরকম। তবে যারা সদ্য ইন্টার্নিশিপ শেষ করেছেন বা দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনা থেকে দূরে ছিলেন তাদের সকলের জন্য অন্ততপক্ষে ছয় মাসের একটা প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। প্রথমবার উত্তীর্ণ না হলে পরবর্তীতে আগে গুছিয়ে রাখা পড়া রিভিশনের মাধ্যমে পূর্ব থেকে কম সময়ে শেষ করতে পারবেন। 

প্রস্তুতিতে যেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার 

ডা. মো. আকতার উজ জামান: রেসিডেন্সি পরীক্ষায় ফ্যাকাল্টি, প্যাথলজি, মাইক্রো, ফিজিওলজি, ফার্মাকোলজি বায়োকেমিস্ট্রি এবং অ্যানাটমি—এই সাবজেক্টগুলো থেকে প্রশ্ন আসে। এর মধ্যে প্রথমেই যেই সাবজেক্টে গুরুত্ব দিতে হবে সেটি হচ্ছে ফ্যাকাল্টি। যিনি মেডিসিনে দিবেন তিনি মেডিসিন ফ্যাকাল্টি, যিনি সার্জারিতে দিবেন তিনি সার্জারি ফ্যাকাল্টি; এছাড়াও বেসিক ও পিডিয়াট্রিক্স ফ্যাকাল্টি। এর পর প্যাথো এবং মাইক্রোতে টু-দ্য-পয়েন্টে উত্তর দিতে হবে, খুব ভেবে-চিন্তে করতে হবে না। এখানে একটু ভাল মতো প্রিপারেশন নিলে নম্বর তোলা খুব সহজ। এরপরে যেই সাবজেক্টে গুরুত্ব দিবেন সেটি হচ্ছে ফিজিওলজি। এখানে প্রশ্ন হয়ত একটু ঘুরিয়ে আসে, কিন্তু পরিষ্কার ধারণাসহ পড়া থাকলে আপনি উত্তর দিতে পারবেন। এই কয়টি সাবজেক্টে খুব ভাল করতে পারলে ধরে নেওয়া যায়, আপনি ভর্তির সুযোগ পাবেন, তা যেই বিষয়ই হোক। খেয়াল রাখবেন, এই কয়টি সাবজেক্টে কোনোভাবেই যেন সহজ প্রশ্ন ভুল না হয়। তবে ভালো ইনস্টিটিউটে চান্স কিংবা তালিকায় একটু এগিয়ে থাকতে প্রত্যাশীদের গেমচেঞ্জার হচ্ছে অ্যানাটমি।

পরীক্ষার হলে যে কৌশল অবলম্বন

ডা. মো. আকতার উজ জামান: পরীক্ষার হলে আমাদের সব থেকে বেশি সমস্যা হয় দুশ্চিন্তার কারণে। এজন্য সহজ প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়ে যায়। আর পরীক্ষায় চান্স হবে কিন্তু সহজ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মাধ্যমেই। আমি প্রতি প্রশ্নে ফলস্ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলাম। দুইটা কনফার্ম ফলস্ পেলে আর বাকি স্টেম নিয়ে তেমন ভাবিনি। আর কিছু প্রশ্ন ছিল যেগুলো একেবারেই জানি না বা অজানা, সেসব প্রশ্ন সব ফলস বা সব ট্রু দাগানোর চেষ্টা করেছি।

পরীক্ষার কেন্দ্রে সময় ব্যবস্থাপনা

ডা. মো. আকতার উজ জামান: রেসিডেন্সি পরীক্ষার সব থেকে বড় শত্রু সময়। প্রতি প্রশ্নে ৫টি স্টেম মানে ৯০ মিনিটে ৫০০টা সার্কেল পূরণ করতে হবে। আমি টার্গেট নিয়েছিলাম, প্রতি ৩০ মিনিটে ৪০টি প্রশ্নের উত্তর দিবো। তাহলে শেষ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরে আমার কাছে ১৫ মিনিট সময় থাকবে। এই ১৫ মিনিটে আমি কিছু প্রশ্ন মার্ক করে এসেছিলাম, যা প্রথম দেখায় আমি পারছিলাম না, সেসব দাগানোর চেষ্টা করেছি। আমি একটানা কিছু প্রশ্ন পারছিলাম না। এগুলো দ্রুত স্কিপ করে চলে গিয়েছিলাম। সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর আবার ফিরে সেসব প্রশ্নে দেখলাম যে, সব প্রশ্নেরই কয়েকটা স্টেম আমি পারি। প্রথমেই সেসব প্রশ্ন নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করলে কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি যেতে পারতাম না। 

পছন্দের বিষয় ঠিক করবেন যেভাবে 

ডা. মো. আকতার উজ জামান: এর সহজ উত্তর ‘মনের চাওয়াকে গুরুত্ব দিন’। ইন্টার্নশিপে কাজ করতে গিয়ে আমরা বুঝে যাই কোন ডিপার্টমেন্টে কাজ করতে আমাদের রেশি ভাল লাগছে। সেই ভাল লাগাই পরবর্তীতে আমাদের থেকে যায়। এক বছর আগে ভর্তির সুযোগ কিংবা একটু তুলনামূলক কম প্রতিযোগিতার চিন্তায় সাবজেক্ট নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। কারণ আমাদের প্রফেশনে পড়াশোনা বা ডিউটি কোনোটাই সুখকর নয়। আমাদের প্রচুর চাপের মধ্যে থাকতে হয়। এই মানসিক চাপের মধ্যে থেকেও কোর্সটি তখনই চলমান করতে পারবেন, যখন সেই সাবজেক্টের প্রতি আপনার ভালবাসা থাকবে বা প্যাশন থাকবে। এমন সাবজেক্টে যদি যান যার প্রতি আপনার তেমন ভালোলাগা নাই বা আপনি তেমন কিছু জানেন না, একটা সময় এসব স্ট্রেসের মধ্যে আপনি বিরক্ত হয়ে কোর্সটা ছেড়ে দিবেন বা অনেক হতাশাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। তাই আমার অনুরোধ, যারা সামনে রেসিডেন্সি পরীক্ষা দিবেন, তাঁরা অবশ্যই সাবজেক্ট চয়েসের ক্ষেত্রে ভালোলাগার সাবজেক্ট চয়েস করবেন। 

রেসিডেন্সি কোর্সে ভর্তিচ্ছুদের প্রতি পরামর্শ

ডা. মো. আকতার উজ জামান: রেসিডেন্সিতে ভর্তিচ্ছুরা একটা কথা মনে রাখবেন, পোস্টগ্রাজুয়েশনের যাত্রা কিন্তু একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই যাত্রায় সফল হতে হলে অবশ্যই আপনাকে লেগে থাকতে হবে। হয়তো আপনি প্রথমবারে চান্স পাননি, এর পরেরবার হবে, না হলে তার পরেরবার হবে। এই যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বা পড়াশোনা করছেন সেটি কিন্তু বৃথা যাচ্ছে না। আপনার হয়তো প্রথমবারে কাজে না লাগলেও পরেরবারে কাজে লাগবে। আর আপনি জানেন, কোন সাবজেক্টে আপনি দুর্বল। যেই সাবজেক্টে প্রস্তুতি একটু কম, সেই সাবজেক্টে বেশি জোর দিবেন। বিশেষ করে অ্যানাটমিতে অনেকের ভয় থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় অ্যানাটমিতে দিবেন। সর্বোপরি মনে রাখবেন, আপনার জন্য যা লিখা আছে, সেটা সঠিক সময়ে আপনার কাছে আসবে। একদিন পরেও না একদিন আগেও না। আপনি যদি লেগে থাকেন, তাহলে সফল আপনি হবেনই।

অ্যানাটমিতে ভালো করার পরামর্শ

ডা. মো. আকতার উজ জামান: রেসিডেন্সি পরীক্ষার প্রতি বছরের প্রশ্ন দেখলে সহজেই বোঝা যায়, বাকি সব সাবজেক্ট থেকে অ্যানাটমির প্রশ্ন কঠিন। এই বিষয়ে সবাই একটা ভুলটা সিদ্ধান্ত নেন, সেটা হলো: যেহেতু প্রশ্ন অনেক কঠিন হয় তাই পড়ে কি লাভ! এমনেও পারবো না। কিন্তু আপনি যদি ভাল ইনস্টিটিউটে চান্স পেতে চান বা একটু সিরিয়ালে এগিয়ে থাকতে চান সেক্ষেত্রে অ্যানাটমিই গেমচেঞ্জার। বিগত বছরের প্রশ্নগুলো পর্যালোচনা করলে দেখবেন, টপিক রিপিট হয় কিন্তু স্টেম হয়তো আলাদা থাকে। আপনারা প্রতি অধ্যায় থেকে সেই গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো বাছাই করবেন। এরপরে সেগুলো এমবিবিএস লাইফে যেসব বই পড়েছিলেন সেসব বই থেকে দেখে নিবেন। যেহেতু অ্যানাটমির পড়াটা ছবি নির্ভর তাই নিটার পাশে রাখতে পারেন। আর অ্যানাটমির পড়াটা ধারাবাহিক হতে হবে। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় রাখবেন, সেটি হয়তো এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টা হতে পারে। প্রশ্ন সহজ হলে আপনি পেরে যাবেন, কিন্তু একেবারেই প্রিপারেশন না নিলে আপনি কিছুই পারবেন না। ফলে যারা পারবে তাদের চান্সের সম্ভাবনা আপনার থেকে বেড়ে যাবে। মনে রাখবেন, যা আপনার জন্য কঠিন তা সবার জন্যই কঠিন।

এমবিবিএসে অধ্যয়নরতদের প্রতি পরামর্শ

ডা. মো. আকতার উজ জামান: আমাদের মেডিকেলে এমবিবিএস বলেন কিংবা পোস্ট গ্রাজুয়েশন বলেন সবই একটি ধারাবাহিক যাত্রা। স্টেপ বাই স্টেপ আপনাকে আগাতে হবে। এক ধাপ বাদ দিয়ে আরেক ধাপে যাওয়ার সুযোগ নাই। যারা এখন এমবিবিএস কোর্সে আছেন তাদের মূল টার্গেট হওয়া উচিত ফাইনাল প্রফে ভালো করা। যে পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা ডাক্তার হয়ে থাকি। আমাদের একটা নতুন পরিচয় হয়। আর ইন্টার্ন ভাই-বোনদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা এই এক বছরে ক্যারিয়ার একটি প্লানিং করে ফেলতে পারেন, যেমন: আপনি ক্লিনিক্যাল সাবজেক্টে ক্যারিয়ার করবেন নাকি বেসিকে বা পাব্লিক হেলথ অথবা দেশের বাইরে চলে যাবেন। এই পরিকল্পনা করে ফেলতে পারলে আপনার লক্ষ্যে পৌছানোর বিশাল কষ্ট, তা অনেকাংশে কমে যাবে। আর যেহেতু এই সময় আমরা হাতে-কলমে কাজ শিখি, তাই এই সময়টাকে আপনারা যথাযথ গুরুত্ব দিবেন।

ফল প্রকাশে অপেক্ষমাণ তালিকার বিষয়ে অভিমত

ডা. মো. আকতার উজ জামান: আমার মতে, এটি একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে। কারণ, অনেকেই হয়তো ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো সমস্যার জন্য ভর্তি হবেন না। তখন সিটটি ফাঁকা থেকে যায়। যদি অপেক্ষমাণ তালিকা থাকতো তাহলে সেই সিটে নতুন একজন সুযোগ পেতেন। এর মাধ্যমে তাঁর স্বপ্ন পূরণ হতো এবং এই স্বপ্ন শুধু তার নয়, পরিবার ও তাঁর কাছের মানুষদেরও। আর এই স্বপ্ন পুরণের যে খুশি সেটা অবর্ণনীয়।

আগামী দিনের পরিকল্পনা

ডা. মো. আকতার উজ জামান: আগেই বলেছি, আমি যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চেয়েছি, সেই যাত্রার প্রথম ধাপ উত্তীর্ণ হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। এখন যেমন আমি বলতে পারছি আমি একজন নিউরোসার্জারি রেসিডেন্ট। একটা সময় যেন বলতে পারি আমি একজন নিউরোসার্জন। এজন্য আমাকে একটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। আসলে কোর্সে ঢুকাটাই সব না, সফলতার সাথে শেষ করাটাই মূল বিষয়। সেই কোর্স কমপ্লিট করে, একজন নিউরোসার্জন হয়ে যেন আমি দেশের মানুষের সেবা করতে পারি, এই স্বপ্নই আমি দেখি। আল্লাহ যেন আমার সেই স্বপ্ন পূরণ করেন।

বেড়ে ওঠার গল্প 

দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট ডা. আকতার উজ জামান। এক ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার এবং আরেক ছেলেকে ডাক্তার বানাতে বাবা-মায়ের প্রবল ইচ্ছা থেকেই চিকিৎসক হয়ে উঠা। 

ডা. আকতার উজ জামান বলেন, এতদূর আসার পেছনে যেমন আমার বাবা-মায়ের অনেক ত্যাগ, অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে এবং পাশে থেকে তাঁরা যথেষ্ট সাহস জুগিয়েছেন, তেমনি আমার স্ত্রী ডা. তানজিলা নওরীনের অনুপ্রেরণা আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। আমার স্ত্রী বর্তমানে নিওনেটোলজি রেসিডেন্ট এবং আমার রেসিডেন্সি পরীক্ষায় সফলতার পিছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। 

আগামীতে দুইজনই যেন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, প্রতি মুহূর্তে এই স্বপ্নই দেখেন—এই নবীন চিকিৎসক দম্পতি।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
স্বাধীনতা পদক ২০১৭ প্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী
বাংলাদেশের গাইনী এবং অবসের জীবন্ত কিংবদন্তী

স্বাধীনতা পদক ২০১৭ প্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী