১৭ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৫:৪৯ পিএম

স্বাস্থ্য সচেতনতায় অবদান: পুরস্কৃত হলেন ডা. সাকলায়েন রাসেল

স্বাস্থ্য সচেতনতায় অবদান: পুরস্কৃত হলেন ডা. সাকলায়েন রাসেল
মারভেল’র এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আরও ১৪ জন, যারা অনলাইনে শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা রেখে চলেছেন।

মো. মনির উদ্দিন: করোনাভাইরাস মহামারীতে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতনতায় ভূমিকা রাখায় পুরস্কৃত হয়েছেন রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. সাকলায়েন রাসেল। সম্প্রতি হোটেল রেডিসন ব্লুতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ক্যাটাগরিতে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফরম মারভেল’র এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আরও ১৪ বিশিষ্ট ব্যক্তি, যারা অনলাইনে শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা রেখে চলেছেন।

পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ডা. সাকলায়েন রাসেল মেডিভয়েসকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে যে কোনো পুরস্কার প্রাপ্তি ভালো লাগার। আমিও এ রকম খুশি। তবে এ পুরস্কার পেয়ে আমি যে খুব উত্তেজিত—বিষয়টি এমন নয়। মারভেল একটি ভালো কাজের জন্য স্বীকৃতি দিলো, এটা অবশ্যই আনন্দের। কিন্তু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, একজন রোগী বা একজন মানুষ আমার মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। মূলত এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি, যা আমি প্রায় প্রতিদিনই পাই। ভালো পারফরমেন্সের জন্য আপনার অফিস আপনাকে কোনো একটি পুরস্কার দিলো—সেটা নিঃসন্দেহে বাড়তি আনন্দের।’

তিনি বলেন, ‘অন্য ১০টি মানুষের মতোই আমার কাছেও পুরস্কার প্রদানের এ উদ্যোগ ভালো লাগে। এটি নতুন করে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়। এ ক্ষেত্রে নিজেদে ভাগ্যবানই মনে হয়। কারণ এ কাজগুলো অনেকেই করেছেন, তবে আমি বোধ হয় তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব ফেলতে পেরেছি। এজন্য আমার কর্মগুলো জুরিদের অধিক নজর কেড়েছে।’

বাড়লো দায়বোধ 

পুরস্কার প্রাপ্তির কল্যাণে ইতিবাচক কাজগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়লো কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে এ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বলেন, ‘কাজগুলো আমি আসলে দায়বদ্ধতা থেকেই করি। এর মাধ্যমে এটি আরেকটু বাড়লো। এই পুরস্কারের জন্য তাঁরা মূলত এটা বিবেচনায় নিয়েছেন যে, আমার কাজ সমাজে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পেরেছে। এই দিকটি বিচার-বিশ্লেষণ করেই তারা এ পুরস্কার প্রদান করেছেন।

মমতাময়ী মাকে কৃতিত্ব প্রদান 

ডা. সাকলায়েন রাসেল বলেন, ‘গর্বটা আমি আমার মাকেই উপহার দিয়েছি। কৃতিত্বটা ‘আমরাই বন্ধু’ নামে উৎসর্গ করতে চাই। এ গ্রুপের ৮০ জন চিকিৎসক ও হবু চিকিৎসক রয়েছে। এটা এজন্য করেছি, আমিসহ এখানে আমরা প্রায় ৭৮ জন চিকিৎসক আছেন। একসঙ্গে পথচলার এত অধিক সংখ্যক চিকিৎসকের কোনো গ্রুপ বাংলাদেশে আছে বলে আমার জানা নাই। এই গ্রুপের সদস্যরা একে অপরের কল্যাণে কাজ করি। আমরা একজন আরেকজনকে ভালো রাখবো, একজন আরেকজনের বিপদে এগিয়ে আসবো। এই গ্রুপে তাদেরকেই নেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে সততা ও ত্যাগের মানসিকতা আছে, যারা মানুষের কল্যাণে কাজ করতে আগ্রহী।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় যেকোন দুর্যোগ দেখা দিলে আমরা সেখানে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বো সহযোগিতা নিয়ে। এখন আমরা কম্বল বিতরণ প্রজেক্টে কাজ করছি। ছয়শ’ শীতার্থ শিশুকে কম্বল দেওয়া হবে। সেন্ট মার্টিন, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও ঢাকায় এগুলো বিতরণ করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘গ্রুপের সদস্যদের আমি মেন্টরশিপ করি, যাতে তারা এক সময় বড় চিকিৎসক হয়ে বের হয়। তারা যখন ছাত্র ছিল, তখন থেকেই তাদের সঙ্গে আমার কাজ করা। এখন অনেকেই চিকিৎসা হয়ে গেছে। প্রতিবছরই তাদের মধ্য থেকে একজন দুইজন ভালো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করছে এবং ভবিষ্যতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে বের হয়ে আসবে। সব দিক বিবেচনায় কৃতিত্ব আমি তাদেরকে দিতে চাই। কারণ ওদের ভালো কাজগুলো আমাকে উৎসাহিত করে। আমাদের লক্ষ্য হলো, নিজেদেরকে এগিয়ে নিয়ে বাকিদেরকে সহযোগিতা করা। নিজে না থাকলে অন্যকে এগিয়ে নেওয়ার গল্প শোনানো যাবে না।’

পেশা-নেশায় সমম্বয় যেভাবে

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর নিরবচ্ছিন্নভাবে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কৌশল তুলে ধরে ঢাকা মেডিকেলের এ সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এটা স্বাভাবিক কাজের মতোই করি। অনেকে মনে করেন, এসব কাজে যুক্ত হলে সময়টা পাবো কোথায়? আমার কাছে মনে হয়, কাজগুলো আমাকে করতেই হবে। ধরেন, একজন একটু স্বস্তিতে সময় পার করার জন্য ঘুমান, কোথাও ঘুরতে যান, বিশেষ কোনো খাবার খান, চা-সিগারেট পান করেন—এটা তাঁকে স্বস্তি দেয়। এ রকমই আমার কাজ আমাকে স্বস্তি দেয়, আমাকে বিনোদন দেয়, শক্তি জোগায়—এই শক্তিটা আমি মূল পেশায় কাজে লাগাই।’ 

কোন প্রেরণায় কাজে যুক্ত হওয়া এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্যই বা কি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার মূল একটাই লক্ষ্য, সেটা হলো: আমাদের দেশে কোভিডে সবচেয়ে প্রাণহারানো মানুষগুলো চিকিৎসক। দুর্যোগে সবচেয়ে সক্রিয় মানুষ এই চিকিৎসক। কোভিডের কারণে দেশের রোগীরা বাইরে খুব কমই গেছেন। এ সময় অন্যান্য রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়েনি, বরং কমেছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, বাংলাদেশে সব ধরনের রোগীদের সেবা দেওয়াই সম্ভব। আমাদের সুচিকিৎসা আছে। করোনায় অন্যান্য রোগের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি করোনা নিয়ন্ত্রণেও আমরা সফলভাবে সেবা দিতে সক্ষম হয়েছি। আমার যুদ্ধটা আসলে এই জায়গাতেই যে, চিকিৎসার এই সুযোগটা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। তারা যেন সঠিক চিকিৎসক পছন্দ করতে ভুল না করেন। এই জায়গায় ভুল করলে, ওখান থেকে যেতে হবে আরেক জায়গায়। এই ভোগান্তি রোগীকেই পোহাতে হয়। এই জায়গাতে আলো ছড়ানোই আমার লক্ষ্য।’

ডা. সাকলায়েন রাসেল বলেন, ‘যেহেতু আমার নেশা-পেশা ভাসকুলার সার্জারি, সেই জায়গাটাতেই ভুল বোঝাবুঝিটা তুলনামূলকভাবে বেশি। সেজন্য আমি এই জায়গাটায় মূলত কাজ করতে চাই, যেন অসচেতনতার কারণে কোনো একজন মানুষ অকাল পঙ্গুত্বের শিকার না হন, অথবা সঠিক চিকিৎসার অভাবে যেন পাটা-হাতটা না হারান।’

চিকিৎসকদের কর্মক্ষম রাখার অঙ্গীকার 

তিনি বলেন, ‘আমাদের যে চিকিৎসক মানুষকে সুস্থ রাখায় ভূমিকা রাখেন, তারাই বেশি অসুস্থ। তাঁদের নিজেদের জন্য সময় নাই। তাঁরা শারীরিক ব্যয়াম করেন না। তাদের ফিটনেসের অবস্থা খুবই খারাপ। অসুখ হলে তিনবেলা ওষুধ খাবেন, সেটাও পারেন না, রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে। আমরা আসলে রোগীদের সেবা দিতে গিয়েই এক ধরনের চক্রে পড়ে যাই। এটা সাধারণ মানুষকে ভালো রাখার চক্র। অথচ সাধারণ মানুষ আমাদের ব্যস্ততাকে দেখে মনে করেন, ও হয় তো টাকা আয় করার জন্য এতো ব্যস্ত হয়েছে। আবার এই মানুষটাই যখন আমার সিরিয়াল পান না, তখন তিনিই আবার বলেন, আপনার সিরিয়াল তো আমি পাই না। তখন আমার বদনাম করছেন। তো আমাদের ব্যস্ততার কারণ হলো, আমরা সেবার প্রেমে পড়ে যাই। জানতে-অজানতে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আমরা বাধ্যতামূলক একটি প্রেমে পড়ে যাই। ভাবি, আমার বিভাগটাকে ভালো রাখতে হবে। অথচ সাধারণ মানুষ এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখতে চান। আসলে এই জায়গাটাতেই আমি কাজ করতে চাই। আমরা সাধারণ মানুষকে ফিট করে তুলতে পারি। একই সঙ্গে চিকিৎসকদেরও ফিট করে তুলতে চাই। কারণ আমরা নিজেরা ফিট না থাকলে সাধারণ মানুষকে ফিট রাখবো কিভাবে?’ 

ডা. সাকলায়েন রাসেল আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন ফাইভ স্টার মানের অনেক হাসপাতাল হচ্ছে। কিন্তু ফাইভ স্টার মানের পার্ক কোথায় পাবেন, যেখানে মানুষ একটু শারীরিক ব্যায়াম করবেন, অথবা ফুটপাথ কোথায়—যে পথ দিয়ে হেঁটে যাবেন? এই বিষয়গুলোতে যদি আমরা উৎসাহিত করি যে, আপনার ফিট থাকার ব্যবস্থা আপনাকেই আগে নিতে হবে। এটি নিশ্চিত করা গেলে মানুষ অনেক সুস্থ থাকবেন এবং তখন এমনিতেই হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমে যাবে।’

যে চিন্তা থেকে ব্যতিক্রমী পথচলা 

সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতায় যুক্ত হওয়ার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রথমত আমি একজন রোগীর লোক। তার পর আস্তে আস্তে আমি ডাক্তার হয়েছি। এখন আমি নিজেও রোগী। সুতরাং এই চিন্তাটা আসলে রোগীর লোক হিসেবেই হয়েছে যে, আমি একজন চিকিৎসকের কাছে রোগী নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর কাছে কি প্রত্যাশা করি? আপনি মেডিসিনের লোক, আপনি রোগীকে ওষুধ দিয়ে সুস্থ করে তুলবেন। আপনি সার্জারির লোক, আপনি রোগীকে অপারেশন করে ভালো করে তুলবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশে অনেক গাইড লাইন দেওয়া চিকিৎসক দরকার, যাদের কাছে রোগী গেলে যথাযথ দিক-নির্দেশনা পাবেন। দুঃখজনক হলেও সত্য—এমন চিকিৎকের বড়ই অভাব।’

‘গাইড লাইন দেওয়া চিকিৎসকের কাছে কোনো রোগী গেলে তিনি বলবেন যে, হ্যা আপনি আমার রোগী, আপনি আমার কাছে চিকিৎসা নেন অথবা আপনি অমুকের রোগী, তার কাছে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করুন। অর্থাৎ আপনার এই অসুখের জন্য এই চিকিৎসার দরকার নাই’, যোগ করেন তিনি।

একনজরে ডা. সাকলায়েন রাসেল

রংপুরের মিঠাপুকুরের রূপসী গ্রামের সন্তান সাকলায়েন রাসেল রাজধানীর একে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। 

পরে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ভর্তি পরীক্ষায় তিনি মেধাতালিকায় সারাদেশে ৬৭তম স্থান অধিকার করেন।

পরে কার্ডিয়াক ভাসকুলার অ্যান্ড থোরাসিক সার্জারিতে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকে।

পড়াশোনা শেষে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্ডিয়াক ও ভাসকুলার অ্যান্ড থোরাসিক সার্জারি বিভাগে কাজ শুরু করেন ডা. সাকলায়েন রাসেল। দীর্ঘ ১১ বছর চাকরি শেষে সেখান থেকে স্বেচ্ছা অবসর নেন তিনি।

২০১৭ সালে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটে তাঁর নেতৃত্বে ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ চালু হয়। সেখানে সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি