মানসম্মত মেডিকেলে ইন্টার্নশিপ চান রাঙামাটির শিক্ষার্থীরা, কর্তৃপক্ষের না
মাহফুজ উল্লাহ হিমু: রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ দেশের অন্যতম কনিষ্ঠ মেডিকেল কলেজ। ২০১৪ সালের ১০ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে এই মেডিকেল কলেজের পাঠ কার্যক্রম। স্থানীয় পাহাড়ি সংগঠনগুলোর বাঁধার মুখে প্রথম তিন মাস কলেজটির পাঠদান স্থগিত ছিল। তবে সকল চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ষষ্ঠ ব্যাচ চলমান রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অবকাঠামোগত নানা ঘাটতির ফলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল না থাকায় এলাকাবাসীও বঞ্চিত হচ্ছে আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে। একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ থাকার কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না রাঙামাটির সাধারণ মানুষ। মেডিকেলটি থেকে এখন পর্যন্ত মোট দুইটি ব্যাচ এমবিবিএস ডিগ্রি সম্পন্ন করেছে। তবে পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় প্রথম ব্যাচের (২০১৪-১৫) শিক্ষার্থীরা নিজ মেডিকেলে ইন্টার্নশিপ না করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করেছেন। দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিজ মেডিকেলে (জেলা সদর হাসপাতাল) ইন্টার্নশিপ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সদ্য পাস করা শিক্ষার্থীরা প্রথম ব্যাচের মতোই চমেকে হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
তাঁদের দাবি, ইন্টার্নশিপ করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে নেই। ইন্টার্নশিপের জন্য ন্যূনতম ২৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রয়োজন হলেও এখানে আছে ১০০ শয্যার ব্যবস্থা। এর মধ্যে হাসপাতালটিতে ৫০ শয্যার অবকাঠামো রয়েছে, পরে তা বাড়িয়ে ১০০ শয্যা করা হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালটিতে প্রয়োজনীয় ডিপার্টমেন্ট ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই।
তবে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি নতুন মেডিকেল হিসেবে অবকাঠামোগত ও জনবলের ঘাটতি থাকলেও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ইন্টার্নশিপে কোনো সমস্যা হবে না। নিয়ম অনুযায়ী, তাদের নিজ প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত হাসপাতালেই করতে হবে।
নেই অবকাঠামো, প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সুযোগের তীব্র অভাব রয়েছে বলে মেডিভয়েসকে জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষার্থী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেডিকেল কলেজের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের একজন ইন্টার্ন বলেন, ‘আমরা রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় ব্যাচ। আমাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসের কাজ এখনও চলমান, ফলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। আমাদের আগের ব্যাচ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করেছে। নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সকল সুযোগ-সুবিধা থাকবে তা আমরা আশাও করছি না। তবে আমাদের আগের ব্যাচের সময় অবকাঠামোগত যে অবস্থা ছিল তার থেকে ভালো হবে বলেই আশা করেছিলাম, কিন্তু তা হয়নি। এর পরও আমাদেরকে রাঙামাটিতেই ইন্টার্ন করতে বলছে কর্তৃপক্ষ।’
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ইন্টার্নশিপে অস্বীকৃতি জানানোর কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে সদর হাসপাতালটি অবকাঠামো অনুযায়ী ৫০ শয্যার, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১০০ শয্যার করা হয়েছে। এছাড়া আরও ১৫০ শয্যার ভবন নির্মাণের কাজ চলছে, পরিচালক স্যারের ভাষ্যমতে যা শেষ হতে কমপক্ষে তিন বছর লাগবে। অর্থাৎ আমাদের মাত্র ১০০ শয্যার হাসপাতালে ইন্টার্ন করতে হবে, যেখানে ইন্টার্নশিপের জন্য ন্যূনতম ২৫০ শয্যার হাসপাতাল প্রয়োজন। হাসপাতালটিতে ইন্টার্ন ডাক্তারদের শেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল যেমন: রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রার ও জরুরি মেডিকেল অফিসারের ঘাটতি রয়েছে। শুধুমাত্র মেডিসিন ও গাইনি বিভাগে দুই-একজন করে রেজিস্ট্রার আছেন। সার্জারিতে কেউ নেই। এখানে প্রয়োজনীয় কার্ডিওলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টোরোলজি, অর্থপেডিক, আই, কাজুয়ালিটি ও নিউরোলজিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ নেই। হাসপাতালটিতে কোনো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) নেই। একটা মেডিকেল কলেজে অন্তত চারটা অপারেশন থিয়েটার প্রয়োজন। রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার মাত্র একটি। যেখানে সপ্তাহে শুধু একদিন সার্জারি করা হয়। দুপুর দুইটা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র একজন চিকিৎসক জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে জটিল ও সামর্থ্যবান রোগীরা এই হাসপাতালে থাকেন না।’
হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য কাজের পরিবেশে ঘাটতি রয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালটিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওয়ার্ডে বসার জন্য কোনো রুমের ব্যবস্থা নেই। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বসার ব্যবস্থা তো দূরের বিষয়, আমাদের স্যারদেরই বসার ব্যবস্থা নেই। বহির্বিভাগে বসারও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। রাতে কর্মরত ইন্টার্নদের জন্যে কোনো বিশ্রাম কক্ষ নেই। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, প্রত্যেক মেডিকেল কলেজে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা থাকে। আমাদের এখানে আবাসনের কোনো ব্যবস্থা নেই।’
চমেক হাসপাতালে ইন্টার্নের সুযোগ নেই
জানতে চাইলে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. প্রীতি প্রসূন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। আমরা চাইলেই কিছু করতে পারবো না, আমরা শুধু নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছি। এখানে তাঁরা চিকিৎসক হিসেবে মৌলিক প্রশিক্ষণ পাবে, এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে তো তারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হবে না। মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য যে সকল বিভাগ এবং রোগী প্রয়োজন তা এখানে আছে। যেহেতু এর আগে কখনও কোনো ব্যাচ ইন্টার্নি করেনি, তাই আমাদের কিছু ঘাটতি আছে। যেমন: ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বসার জায়গা, নৈশকালীন দায়িত্ব পালনের সময় বিশ্রামের জায়গা না থাকা। এসব ধাপে ধাপে সমাধান হয়ে যাবে। আমরা বলছি না, এ সকল সমস্যা রাতারাতি সমাধান হয়ে যাবে। প্রথম যেকোনো কিছুর জন্যই কিছু না কিছু ঘাটতি থাকে। লোকবলেও কিছু ঘাটতি আছে, তবে এতে ইন্টার্নশিপ পরিচালনায় কোনো সমস্যা হবে না। এর থেকে খারাপ পরিস্থিতিও অনেক স্থানে, বিশেষ করে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে রয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সবার আগে রোগী প্রয়োজন, যা এখানে অনেক আছে। বাকি সমস্যাগুলো সময়ের সাথে সাথে সমাধান হয়ে যাবে। এগুলো রাতারাতি সমাধানের বিষয় না। তবে কাউকে না কাউকে শুরু করতে হবে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নশিপের সুযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ সুযোগ আমাদের হাতে নেই। প্রথম ব্যাচের সময় রাঙামাটিতে প্রতিকূল পরিস্থিতি ছিল। তখন স্থানীদের বিরোধিতা ছিল। মেডিকেল কলেজ স্থাপনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে একজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। মেডিকেলের ক্লাস শুরুর দিন দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল, করফিউ জারি করে ক্লাস নিতে হয়েছিল। এ সকল পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রথম ব্যাচকে সরকার সুযোগ দিয়েছিল। সে পরিস্থিতি এখন নেই।’
‘তারা সব জেনে শুনেই এই মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে, তাদের কেউ জোর করে ডেকে আনেনি। এটা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ না যে, তাদের আমরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে এখানে ভর্তি করেয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী, যেই মেডিকেলে পড়াশোনা করবে, সেখানেই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। এর অন্য রকম হওয়ার সুযোগ নেই’, যোগ করেন অধ্যাপক প্রীতি প্রসূন।
সংখ্যাগত নয়, গুণগত দিক বিবেচ্য
জানতে চাইলে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মেডিকেল কলেজে ভালো মানের শিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতি থাকা জরুরি। যদি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার পর্যাপ্ত পরিবেশ না থাকে, তবে ব্যাঙের ছাতার মতো কলেজ করে লাভ নেই। প্রতিষ্ঠান যদি মানসম্মত হয়, তবে ভালো চিকিৎসক তৈরি হয়। এলাকার মানুষ ভালো সেবা পায়, সর্বোপরি দেশ উপকৃত হয়। মেডিকেল কলেজে ভালো চিকিৎসক তৈরির যথাযথ সুযোগ থাকতে হবে। তা না হলে এই চিকিৎসক দিয়ে লাভ নেই। এ বিষয়ে সকলের নজর দেওয়া উচিত।’
‘মেডিকেল কলেজ বিশেষত সরকারি মেডিকেলগুলোতে ভালো চিকিৎসক তৈরি করতে হবে। তা না হলে চিকিৎসক সমাজ গালি খাবে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। শুধুমাত্র বানানোর জন্য মেডিকেল না বানিয়ে মানের দিকে নজর রাখতে হবে’, যোগ করেন অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ।