১৬ জুলাই, ২০২১ ০৯:৩৫ পিএম

লিভারের সর্বাধুনিক চিকিৎসায় ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন

লিভারের সর্বাধুনিক চিকিৎসায় ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন
ছবি: সংগৃহীত

ক্রনিক লিভার ডিজিজ সারাবিশ্বে প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্যমতে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই লিভার রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে প্রায় ২১ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এর অধিকাংশই লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার ও লিভার ফেইলিওরসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সংস্থাটির তথ্যমতে দেশে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫.৫ ভাগ হেপাটাইটিস-বি আক্রান্ত, শূন্য দশমিক ৮ ভাগ হেপাটাইটিস-সি এবং ২০ থেকে ২৫ ভাগ মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।

লিভারের নানা রোগে আক্রান্ত এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা রয়েছে। ফলে আক্রান্তদের একটা বড় অংশ চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে গমন করেন। জটিল এই রোগীদের বিদেশমুখিতা কমানোর লক্ষ্যে লিভার রোগীদের চিকিৎসায় এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে দেশের চিকিৎসাখাতের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২তম সিন্ডিকেট সভায় লিভার রোগীদের সেবায় ‘ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন’ নামে এই ডিভিশন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গত ৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ এই ডিভিশন প্রতিষ্ঠার অফিস আদেশটি হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন। নবগঠিত বিভাগটির প্রধান হিসেবে যোগদান করা অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল সম্প্রতি মেডিভয়েসের সঙ্গে এর কাজ ও গঠনসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। মেডিভয়েস পাঠকদের জন্য ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মাহফুজ উল্লাহ হিমু। 

ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশনের কাজের পরিধি

অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব: লিভার সিরোসিস একটি ভয়ঙ্কর রোগ। লিভার সিরোসিসি রোগীদের লিভার ফেইলিওর হলে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ছাড়া আর কোনো কিছু করার নেই। আমাদের লক্ষ্য হলো, যেনো রোগীদের লিভার আরও খারাপ না হয়। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ লিভারের প্রেসার বেড়ে যাওয়া। স্বাভাবিক ব্লাড প্রেসার যেভাবে মাপা হয়, লিভারের প্রেসার সেভাবে হয় না। এটি কার্ডিয়াক ক্যাথেটারের মাধ্যেমে করতে হয়। যেভাবে হার্টের চিকিৎসকরা হার্টে রিং বসান সেভাবে আমরা এটি করতে পারি। এই কাজটি আমরা বাংলাদেশেই করি। বিএসএমএমইউতে এই বিভাগটি স্থাপনের পর আরও অধিক পরিসরে আমরা তা করতে পারবো। 

লিভার সিরোসিসের রোগীদের যাদের লিভার ফেইলিওর হয়ে গেছে, যাদের ট্রান্সপ্ল্যান্ট লাগবে--তাদের ট্রান্সপ্ল্যান্টটি যদি বিলম্ব করাতে পারি বা লিভারকে এমন একটি অবস্থায় নিয়ে আসতে পারি, যাতে ট্রান্সপ্ল্যান্টের আর প্রয়োজন হবে না। তাহলে সেটাই ভালো। কারণ ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল ও চাইলেই করোনা যায় না। নবসৃষ্ট এই বিভাগে আমরা সেই লক্ষ্যে সেবা প্রদান করবো। 

সবকিছু বিবেচনায় লিভার সিরোসিস ও ফেইলিওর রোগীদের জন্য আমরা স্টেম সেলের ব্যবস্থা করেছি। বাংলাদেশে গত চার-পাঁচ বছর যাবত আমরা এই সেবা দিচ্ছি। বিএসএমএমইউতেও স্বল্প পরিসরে এ সেবা প্রদান করছে। আমাদের এ সংক্রান্ত পাঁচ থেকে ছয়টি আন্তার্জাতিক গবেষণাপত্র আছে। এই বিভাগটি চালু হওয়ায় এ সংক্রান্ত সেবা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষ উপকৃত হবেন।

লিভার ক্যানসার একটি বড় সমস্যা। এর চিকিৎসা অন্যান্য ক্যানসারের মতো না। কারণ লিভার ক্যানসার লিভার সিরোসিসের ব্যাকগ্রাউন্ডে হয়। তাই শুধু ক্যানসারের চিকিৎসা দ্বারা হয় না। লিভার সিরোসিসের চিকিৎসাও মাথায় রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা আরএফএ করতে পারি। এর মানে হচ্ছে, রোগীকে ঘুম পাড়িয়ে লিভারে থাকা টিউমারে একটি সুই প্রবেশ করিয়ে বিদ্যুত প্রয়োগ করে তা পুড়িয়ে দিতে পারি। 

আমাদের দেশে যারা লিভারের ক্যানসার নিয়ে আসেন, তারা গুরুতর অবস্থায় আসে। তাদের লিভারে একাধিক টিউমার থাকে। তাদের না করা যায় সার্জারি, না করা যায় আরএফএ। তাদের ক্যাথেটারে নিয়ে লিভারের মধ্যে যেসব জায়গায় টিউমার আছে সেখানে কেমোথেরাপির ইনজেকশন দিয়ে টিউমারগেুলো নষ্ট করে ব্লক করে দিয়ে আসি। এ সংক্রান্ত বিষয়েও আমরা আমাদের অভিজ্ঞতাপত্র প্রকাশ করেছি। বিএসএমএমইউর এ বিভাগে সেই সেবাও প্রদান করা হবে। অর্থাৎ এ বিভাগটি চালুর মাধ্যমে দেশের মানুষ এমন অনেক অধুনিক চিকিৎসাসেবা পাবেন যা তারা আগে পেতেন না। 

সম্প্রতি আমরা প্লাজমা এক্সচেঞ্জ শুরু করেছি। এই বিভাগে আমরা লিভার ডায়ালাইসসি করতে পারবো। এখানে অ্যাডভান্সড ফেলোশিপ ট্রেনিং চালু করবো। সারাদেশের লিভার বিশেষজ্ঞরা টেকনিকগুলো শিখে মফস্বলেও সেবা চালু করতে পারবে।

কবে থেকে সেবা চালু 

অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব: কার্যক্রম শুরুর জন্য আমরা একদিনও বসে থাকতে চাই না। আমরা এই সপ্তাহের মধ্যেই কিছু একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করবো। আমরা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ করেছি। করোনাকালে সরাসরি ক্লাস নিতে না পারলেও বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ অনলাইনে লেকচার প্রদান করবেন। আমরা আশাবাদী শিগগিরই একাধিক সেবা চালু করতে সক্ষম হবো। 

প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা 

অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব: আপাতত হেপাটোলজি বিভাগ থেকে ধার করে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ নেওয়া হয়েছে। আমি নিজে এই বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেছি। একজন সহযোগী অধ্যাপক ও একজন মেডিকেল অফিসার আমাদের সঙ্গে যোগদান করেছেন। তারা প্রত্যেকেই এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ। 

সেবার পরিধি 

অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব: এখন সীমিত পরিসরে সেবা পাচ্ছে। কিন্তু যখন ডেডিকেটেড ইউনিট হয়ে যাবে, তখন বাকি সেবাগুলো কমিয়ে শুধুমাত্র ওই রোগের চিকিৎসা হবে। একইসঙ্গে আমরা এ ধরনের ক্লাস ও ট্রেনিংয়ে বেশি মনোনিবেশ করবো। এতে লিভার সিরোসিস, ফেইলিওর ও ক্যানসার রোগীরা উপকৃত হবেন। 

চিকিৎসায় খরচ 

অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব: আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, এ বিভাগে খরচ অবশ্যই বেসরকারি খাত থেকে কম হবে। সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন, ট্রান্সআর্টারিয়াল কেমোএম্বোলাইজেশন, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবলেশন, প্লাজমা এক্সচেঞ্জ, হেপাটিক ভেনাস প্রেসার গ্রেডিয়েন্টসহ সকল চিকিৎসা ব্যয়বহুল। কিন্তু ভারতে সরকারি হাসপাতালে এ ধরনের চিকিৎসায় যা খরচ হয়, আমাদের বেসরকারি খাতে একই খরচে সেই সেবা প্রদান করছি। সঙ্গত কারণেই যখন বিএসএমএমইউর মতো একটি হাসপাতালে এ সেবাগুলো চালু হবে, তখন খরচ আরও কমে আসবে।  

সর্বোপরি এটি শুধু একটি নতুন বিভাগ নয়, এটি একটি বড় অর্জন। হেপাটোলজি বিভাগ বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে যাত্রা শুরু করেছে। সাব-স্পেশালিটি বিভাগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি অনন্য পর্যায়ে পৌঁছাল দেশের স্বাস্থ্যখাতের সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপিট। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পেরেছি যে আমরা এ ধরনের কাজগুলো দক্ষতার সঙ্গে করছি। শুধু প্রচারের উদ্যেশ্যে না আমরা আমাদের সক্ষমতার কথা আন্তর্জাতিক জার্নালেও প্রকাশ করেছি। আমাদের আরেকটি বড় সফলতা হলো, ইতিমধ্যে একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে আরও তৈরি হবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি