বিশেষজ্ঞদের ভাবনা
ভারতের করোনা ভ্যারিয়েন্ট ঠেকাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন?
সাখাওয়াত আল হোসাইন: করোনার নতুন ধরনের তীব্রতায় লণ্ডভণ্ড পুরো ভারত। শ্মশানে লাশের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, চিতায় দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। চিতার আশপাশের এলাকায় স্বজনদের কান্নায় ভারি হচ্ছে ভারতের আকাশ। প্রতিদিন করোনায় মৃত্যুর মিছিল ও শনাক্তের সংখ্যা ছাপিয়ে যাচ্ছে ভারতে।
ভারতের হাসপাতালে শয্যার সংকট, অক্সিজেন সংকটসহ নানা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। করোনার নতুন ধরনে দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ভারতের আশপাশের দেশগুলো করোনার এ নতুন ধরন ঠেকাতে নিয়েছে বিভিন্ন প্রদক্ষেপ। এদিকে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন ভারতীয় করোনার ধরন আশপাশের দেশগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার।
তারা বলছেন, মানুষের স্বাস্থ্যবিধি শতভাগ নিশ্চিত করা ও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে না পারলে আমাদের দেশেও ভারতের এ করোনা প্রকোপ আকার ধারন করবে।
কত দ্রুত এবং কতদূর নতুন ধরনের এই ভাইরাসটি ভারতে ছড়িয়েছে তার সুনির্দিষ্ট ধারণা পেতে যে মাত্রায় নমুনা পরীক্ষা করতে হয় তা এখনও ভারতে সম্ভব নয়। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ২২৯ জন। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৩৩ জন। একদিনে দেশটিতে করোনায় মারা গেছে ৩ হাজার ৪৪৯ জন। এ নিয়ে ভারতে করোনায় মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ২২ হাজার ৪০৮ জনে পৌঁছেছে।
ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার শংকা
করোনার যতগুলো ভ্যারিয়েন্ট বা ধরন আসছে। করোনার প্রত্যেকটি ধরনই বিপজ্জনক। এবারের ভারতের ধরনটি আরও বিপজ্জনক।
করোনার এ ধরন ঠেকাতে দেশে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভিসি ও দেশের অন্যতম শীর্ষ ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মেডিয়েসকে বলেন, ভারতের করোনার ধরন ঠেকাতে যে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তার বিভিন্ন হুকুম করেছে সরকার কিন্তু তা কোনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বলা হয়েছে, ভারতের সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে, তা সরকার করেনি।
তিনি বলেন, ভারতে থেকে করোনা সংক্রমিত হয়ে দেশে মানুষ ঢুকছে। যারা ভারত থেকে দেশে আসছেন, তাদেরকে ঠিকমত কোয়ারেন্টাইন করা হচ্ছে না। এর ফলে বাংলাদেশেও ভারতের করোনা অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এবং আরও ভয়াবহ রূপ ধারন করবে।
পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই
ভারতের করোনা রোধে দেশের যথাযথ প্রস্তুতি নেই উল্লেখ করে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ভারত থেকে আসার পর যাদের রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে তাদেরকে কোয়ান্টাইন করার পর থেকে ছেড়ে দিতে হবে। আর যাদের পজিটিভ আসবে তাদের কোয়ান্টাইন এবং চিকিৎসা সুরক্ষা বাস্তবায়ন করাতে হবে। রাস্তাঘাটে মানুষের অবাধ চলাচল, কেউ মাস্ক পড়ছেন আবার কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না।
গত ১৮ এপ্রিল থেকে ২৪ এপ্রিল যশোরের বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আসা সাতজন করোনা রোগী কোয়ান্টাইন না করে পালিয়ে গেছেন। ভারতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ায় এই পালানোর বিষয়টি দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আরিফ আহম্মেদ বলেন, ভারত থেকে আসা সাতজন করোনা পজিটিভ ছিলেন। তাঁদের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তির পর করোনা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভর্তির টিকিট ওয়ার্ডে পৌঁছেছে, কিন্তু রোগীরা সেখানে যাননি। হাসপাতালে থাকতে হবে বলে সেখান থেকে তাঁরা পালিয়ে গেছেন।
প্রতি মুহূর্তে ধরনের পরিবর্তন হয়
যে কোনো ভাইরাসই ক্রমাগত নিজের ভেতরে নিজেই মিউটেশন ঘটাতে করতে থাকে অর্থাৎ নিজেকে বদলাতে থাকে, এবং তার ফলে একই ভাইরাসের নানা ধরন তৈরি হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ে তেমন মাথাব্যথার প্রয়োজন হয় না, তবে ভাইরাসের বেশির ভাগ পরিবর্তনই তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। কারণ নতুন সৃষ্ট অনেক ভ্যারিয়েন্ট মূল ভাইরাসের চেয়ে দুর্বল এবং কম ক্ষতিকর হয়। কিন্তু কিছু ভ্যারিয়েন্ট আবার অধিকতর ছোঁয়াচে হয়ে ওঠে - যার ফলে টিকা দিয়ে একে কাবু করা দুরূহ হয়ে পড়ে।
বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা দেখছি যে, বিভিন্ন শপিংমলে, দোকানে মানুষের উপচেপড়া ভিড় তৈরি হয়েছে। অনেকেই ঈদের বাজার করতে বের হচ্ছেন। সেখানে যে স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা ছিল, সেটি করা হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে স্বাস্থ্যবিধি পালনে অবহেলা করছেন মানেই কিন্তু আপনারা আশপাশ থেকে সংক্রমিত হয়ে পরিবার ও নিকটজনকে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
যেসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত
নতুন করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই উল্লেখ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, পুরানো ভাইরাস আর নতুন ভাইরাস রোধ করার নিয়ম একই। করোনা ঠেকাতে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ভারতের করোনা ঠেকাতে বর্ডারের যাতায়াত বন্ধ করে দিতে হবে। যারা আসছে তাদেরকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন করাতে হবে। জনগণকে সচেতন করতে হবে। মাস্ক পড়া, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার করা। অপ্রয়োজনে বাসা থেকে বের না হওয়া।
তিনি বলেন, ‘ভারতে থেকে অনেক লোক অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশে আসেন। ভারতের করোনা ঠেকাতে বর্ডারের স্থানীয় লোকজনকে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে। যারা ভারত থেকে আসছেন তারা তো জানেন কে আসছেন না আসছেন। মসজিদের ইমাম বা স্থানীয় প্রতিনিধিদেরকে বলতে হবে যারাই ভারত থেকে যাওয়া আসা করছেন, তাদের ১৪ দিনের কোরেন্টাইনে থাকতে হবে। কেউ তোমাদেরকে কিছু বলবেন না। কোয়ারেন্টাইন শেষে তোমরা আগের মত কাম কাজ করতে পারবা।’
বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছা বলেন, মিডিয়ার প্রচার বাড়াতে হবে। প্রত্যেক ওয়ার্ডের স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে সচেতনতামূলক বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হবে। গ্রামে বা মহল্লায় মানুষ যাদের কথা শুনে তাদের মাধ্যমে করোনার ভয়াবহটা বুঝিয়ে বলা কেন আমাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা প্রয়োজন।