ডা. মো. জাফর ইকবাল

ডা. মো. জাফর ইকবাল

ডিএ, এফসিপিএস (অ্যানাস্থেসিয়া) 
এমডি (ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন)
কন্সালটেন্ট- আইসিইউ
এভার কেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।
আরএমসি- ৪১তম প্রজন্ম।


২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:৪৯ পিএম

করোনার আইসিইউ রোগীদের গল্প

করোনার আইসিইউ রোগীদের গল্প
ছবি: প্রতীকী

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সঙ্গে আমার আত্মার বন্ধন। ২০০৭ সালে ইন্টার্নশিপ শেষ করেই মেডিকেল অফিসার হিসাবে শুরু করেছি। তারপর সিনিয়র হাউজ অফিসার, রেজিস্ট্রার, সিনিয়র রেজিস্ট্রার, স্পেসালিষ্ট, অ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্টের সব ধাপ পেরিয়ে আজ ফুল টাইম আইসিইউ কনসালটেন্ট। তাও প্রায় চার বছর হতে চললো।

চাকুরির পাশাপাশি ঢাকার সব স্বনামধন্য হাসপাতালে দীর্ঘ নয় বছর অনারারি ট্রেনিং করেছি অ্যানাস্থেসিয়া আর আইসিইউতে। মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় সম্পন্ন করেছি ডিপ্লোমা, এফসিপিএস, এবং এমডি নামক পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী। ভুমিকাটা লম্বা করলাম নিজেকে জাহির করার জন্য নয় বরং গত দেড় বছরের ভয়াবাহ অভিজ্ঞতার সামান্য কিছু শেয়ার করার জন্য। 

এই ১৪ বছরের আইসিইউ ক্যারিয়ারে কতশত মৃত্যু দেখেছি, কত রোগীর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে চক্ষু ভিজিয়েছি, কত রোগীর মৃত্যুতে রোগীর স্বজনকে কাউন্সিলিং করেছি তার হিসাব রাখিনি কখনো। কত রোগীর আপন জনকে শেষ বিদায়ের সময় রোগীর বিছেনার পাশে বসতে দিয়েছি, প্রিয়জনের হাতটা ধরতে দিয়েছি, স্পিরিচুয়াল সাপোর্ট দিয়েছি রোগী এবং তার প্রিয়জনের ইচ্ছা অনুযায়ী যতটুকু করা সম্ভব তার সবটুকুই।

কিন্তু কোভিড কালীন এই সময়ের প্রতিটা মৃত্যুই অন্যরকম। আপনি চিন্তা করুন আপনার আপনজনকে কোভিড আইসিইউতে ভর্তি করানোর পর যদি সুস্থ হয়ে ফেরত যান তবেই তাকে আবার দেখতে পারবেন। আর যদি সুস্থ না হন তবে আর কখনোই দেখতে পাবেন না। আপনি অনুমানও করতে পারবেন না যখন একজন রোগীর অক্সিজেন ডিমান্ড আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে তখন তাঁর মনের ভেতর কি অবস্থা চলতে থাকে। এ যেন ফাসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির অনিশ্চিত অপেক্ষা, এই বুঝি ডাক এলো ফাসির মঞ্চে যাওয়ার।

একটা রোগীকে হয়তোবা ফেস মাস্ক দিয়ে অক্সিজেন দেওয়া শুরু করলাম, তারপর হাই ফ্লো ন্যাযাল ক্যানুলায় অল্প পরিমাণ অক্সিজেন দিয়ে শুরু করতে হলো। রোগীর অক্সিজেন ডিমান্ড আরও বাড়তে থাকলো দিনকে দিন, আরও বেশি বেশি পার্সেন্টেজ অক্সিজেন দিতে থাকলাম, একটা সময় হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলা আর নন ইনভ্যাসিভ ভেন্টিলেশনে সর্বোচ্চ অক্সিজেন দেওয়া শুরু করলাম।

একটা গ্রুপ রোগী এই অবস্থা থেকেও ফেরত আসছেন। আর যে গ্রুপ এখানেও রেস্পন্স করছেন না তাঁর জন্য কি? হয়ত নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা নয়তো লাইফ সাপোর্টে দেবার পালা, কিন্তু তারপর? হ্যাঁ এবার আর আমাদের হাতে কিছুই নাই। আপনার রোগী কিন্তু ফুললি কনসাস অরিয়েন্টেড, তিনি সব বুঝতে পারছেন। তার প্রতিটা শ্বাস অনেক কষ্টের, আমরা সেই কষ্টকে লাঘব করার চেষ্টা করি এই অক্সিজেন দিয়েই।লাইফ সাপোর্টে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সব বুঝতে পারছেন এবং এটাও বুঝতে পারতেছেন লাইফ সাপোর্ট থেকে তাঁর ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু। আমরা অসহায় ভাবে অপেক্ষা করতে থাকি শেষ সময়ের জন্য।
 
আপনি কি জানেন সেই অপেক্ষাটা কত হৃদয়বিদারক, কতটা বেদনাদায়ক সেই রোগী আর তাঁর স্বজনদের জন্য?

এবার আসুন আপনার হাতে যদি পর্যাপ্ত পরিমান অক্সিজেন না থাকে তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে। আপনি কি জানেন অক্সিজেন ছাড়া অক্সিজেন ডিপেনডেন্ট কোভিড রোগীর একেকটি শ্বাস কতটা কষ্টকর। মাছকে যখন পানি থেকে উঠিয়ে মাটিতে রাখা হয়, তখন মাছ যে ভাবে ছটফট করে কষ্ট পায়, ঠিক তেমনিভাবে অক্সিজেন ডিপেন্ডেন্ট কোভিড রোগীরা অক্সিজেন ছাড়া কষ্ট পান। তার প্রতিটি শ্বাস ততটাই কষ্টকর আর অসহায় যেমনটি হয় কোনো জলচর প্রাণীকে স্থলে রাখলে।

আপনি কি জানেন একটি সিলিন্ডারে কত লিটার অক্সিজেন থাকে? মাঝারি সাইজের একেকটি সিলিন্ডারে থাকে প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ লিটার। প্রতি মিনিটে যদি ৫ লিটার অক্সিজেন কাউকে দেয়া হয় তবে ঘণ্টায় লাগবে ৩০০ লিটার। অতএব একটি সিলিন্ডারে চলবে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। আর মিনিটে চার বা পাঁচ লিটার অক্সিজেন সাপোর্ট লাগা কোভিড রোগীর অক্সিজেন সাপোর্টের প্রাথমিক অবস্থা। সময় যত গড়াবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীর অক্সিজেন সাপোর্টের পরিমান আরও বাড়াতে হবে।

অতএব এক-দুইটি সিলিন্ডার দিয়ে তীব্র সংক্রমণ যুক্ত কোভিড রোগীকে বাচানো সম্ভব নয়। আপনি হয়তো কিছুটা সময় পেতে পারেন রোগীকে ট্রান্সফার করার জন্য বা প্রাথমিক পর্যায়ের সাপোর্ট দেওয়ার জন্য। কিন্তু চিকিৎসার জন্য দরকার নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ। যা শুধুমাত্র   হাস্পাতালের সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ সিস্টেমের মাধ্যমেই সম্ভব।
 
আজ ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালের ভেতরে আর ইমারজেন্সিতে রোগীরা যেভাবে অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছেন তা মানবতার জন্য লজ্জাজনক, বিবেকসম্পন্ন মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট।
 
আজ অনেককেই দেখলাম ভারত যখন বাংলাদেশে অক্সিজেন রপ্তানি বন্ধ করেছে তখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছেন। আচ্ছা ভাই আপনি যদি বাংলাদেশের নাগরিক না হয়ে ভারতের নাগরিক হতেন, তখন কি এই অবস্থায় অক্সিজেন রপ্তানি করতে দিতেন। না দিতেন না, আপনি বর্ডারে গিয়ে অক্সিজেনের লড়ি ছিনতাই করতেন নিশ্চিত।
 
কই আপনিতো এই প্রশ্ন অপনার কর্তৃপক্ষকে করছেন না যে, আপনাকে কেনো এখনো আমদানি নির্ভর অক্সিজেনে বাঁচতে হবে? আপনার কেস সিনারিও যদি ভারতের মতো হয়, তবে আপনার কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি কি? আপনার নীতিনির্ধারক মহল কি প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাননি বা পাচ্ছেন না? আপনার কয়টা হাসপাতালে সেন্ট্রাল পাইপলাইন অক্সিজেন সরবরাহ সিস্টেম আছে? চিকিৎসকরা অক্সিজেন পাইপলাইনে অক্সিজেনের প্রেশার ঠিকমতো পাচ্ছেন তো? আপনি কি এই প্রশ্ন গুলো করার সাহস রাখেন? আমার দুঃস্বপ্ন শুরু এখান থেকে।

একটা সময় জানতাম আমার নার্ভ অনেক শক্ত, অনেক কঠিন সময়কে হজম করেছি নির্বিকার ভাবে। অনেকবার সিড়দাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়েছি জীবনের শত ধ্বংসস্তুপের ভেতর থেকেও। গত দেড় বছর ধরে যা মোকাবিলা করছি তাতে সেই শক্তি আর উদ্দমে ভাটা পরেছে অনেকটাই। আজ শুধু চোখের সামনে ভেসে আসে সেই রোগীগুলোর মুখ যাদের ফুসফুস কে ছিন্নভিন্ন করেছে করোনাভাইরাস আর তিলে তিলে ঠেলে দিয়েছে অনিবার্য মৃত্যুর দিকে, চোখের সামনে দেখেছি করুন চাহুনি, ওভার ফোনে স্বজনের আর্তনাদ।

আমার হাতে এখনও অনুভব করি ত্রিশ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট মেয়েটার পেটের ভেতরে বাচ্চাটার মুভমেন্ট। মেয়েটা সবসময় ওর পেটের উপর হাতটা রাখত আর বাচ্চাটার মুভমেন্ট মনিটরিং করতো। এ যেন অদৃশ্য  করোনা ভাইরাসের হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করার প্রানন্তকর প্রচেষ্টা। আহারে হতভাগা মেয়েটা। বেহেশতে গিয়ে নিশ্চয়ই তুমি তোমার বেবীকে পাবে, এই দোয়াই করি।

আমি ভুলতে পারিনা ৪২ বছরের সেই রোগীটার আকুলতা - ‘স্যার আপনি যদি আমায় আপনার হাতটা ধরে রাখার অনুমতি দেন শেষ সময় পর্যন্ত। তবেই আমি আমাকে লাইফ সাপোর্টে দেবার অনুমতি দিব’।

আমার কানে এখনও ভেসে আসে হাই ডিপেডেন্সি ওয়ার্ডের পাশাপাশি তিন বিছানায় শুয়ে থাকা মা-বাবা আর তাদের ছেলের মধ্যকার কথোপকথন, কি আসহায়, কি নিদারুন কষ্টে ভরা সেই আলাপন। তাদের একজনকে যখন আইসিইউতে শিফট করা হলো লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার জন্য, বাকি দুই জনের সেই অসহায় মুহূর্তের মায়াবী চাহনি বলে দিচ্ছিল পুরো এক জীবনের গল্প।

আমি ভুলতে পারিনা সেই ভদ্রমহিলার কথা যার স্বামী ভর্তি ছিলেন পাশের আইসিইউতেই। রাউন্ডের সময় সেই ভদ্রমহিলার কাছে গেলেই খবর নিতেন তার প্রিয়মুখটি কেমন আছেন। আমিও যতটুকু তাকে জানানো উচিত ঠিক ততটুকুই তাকে জানাতাম, এরপর একদিন উনি আর জানতে চাইলেন না উনার একান্ত আপন মানুষটি কেমন আছেন। আমারও আর জানানোর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। আচ্ছা ভদ্রমহিলা কি ভাবে জানলেন সেইদিন সকালেই তার প্রিয়মুখ তাকে রেখে অনেক দূরে চলে গেছেন। সচেতন ভাবেই আমার কোন স্টাফই তাকে কোন কিছুই বুঝতে দেননি। ওইদিনের পর থেকে উনার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে লাম্বা রাউন্ড দিতে পারতাম না, উনিও আর কিছুই জিজ্ঞেস করতেন না। আচ্ছা উনি কি উনার শত কষ্টের মধ্যেও আমার ফেসশিল্ড আর মোটা কাচের চশমার আড়ালে থাকা চোখের ভাষা পড়তে পেরেছিলেন?

আমি এখনও গন্ধ পাই সেই ছোট্ট তোয়ালেটার, যে ব্যবহৃত তোয়ালেটা ছিল নয়মাস বয়স্ক এক বেবীর আর যেটা হাতে করে হাসপাতালে এসেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত বুকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন ৪৬ বছর বয়স্ক কোভিড পজিটিভ এক হতভাগ্য বাবা। 

গত দেড় বছরে আমার দেখা প্রতিটা মৃত্যুই একেকটা ট্রাজিক মহাকাব্য। শত শত সাফল্যের গল্পও আছে, কিন্তু সেগুলো তো আর আমাকে ঘুমাপাড়ানির গান শুনিয়ে শান্তিতে ঘুম পাড়িয়ে দেয় না, বরং ওই মৃত্যুগুলোই উপস্থিত হয় আমার ক্লান্তিতে। 
 
আমার সুহৃদ, আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, যে আমার এই পোস্টটি পড়লেন, কি বলতে পারি আপনাকে? একান্ত পেটের দায়ে না হলে বাহিরে বের হইয়েন না, বাহিরে যদি বের হতেই হয়, তবে জামা জুতো পরার আগে মাস্ক পরুন। ভিড় এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, মাহামারী থেকে একা বাঁচার কোন সুযোগ নাই, বাঁচতে হলে সবাইকে একসাথে বাঁচতে হবে, আর মরতে চাইলে গণমৃত্যু অবধারিত। সিদ্ধান্ত আপনার। 

আমরা ফ্রন্ট-লাইনাররা ইতিমধ্যে ক্লান্ত, মহাক্লান্ত। শরীর অবসাদগ্রস্ত, মন বিষাদময়। আরও লম্বা সময় ধরে ফাইট করার আর মৃত্যুর মিছিল দেখার মত মন-মানসিকতায় আর আমরা নেই। আপনাদের সামান্য  অবহেলায় আমাদের এই অনিশ্চিত যাত্রা আরও দীর্ঘ হোক তা আর কোনভাবেই কাম্য নয়। 

নীতি নির্ধারক কর্তা ব্যাক্তিরা অনেক হয়েছে এবার থামুন, এখনও সময় আছে। সব হাসপাতালে পর্যাপ্ত সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের ব্যাবস্থাটা অন্তত করুন। আল্লাহ মাফ করুন, ভারতীয় ঠেউ যদি আমাদের এখানে আসে তবে কিন্তু কেউই রক্ষা পাবেন না। মনে রাখবেন কোনো ভিআইপি ব্যাবস্থাই আপনাকে সুরক্ষা দিতে পারবে না। গত দেড় বছর যাবত কিন্তু ব্যাংকক আর সিংগাপুরের এয়ার এম্বুলেন্স সার্ভিসও বন্ধ।

দোয়া করি বিশ্ব মানব সন্তানের জন্য, অন্তত অক্সিজেনের অভাবে আপন জনের সামনে কষ্ট করে তিলেতিলে মৃত্যু যেন না হয় কোন মানবের।আল্লাহ তুমি কবুল করো এই ফরিয়াদ। আমিন সুম্মা আমিন।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত