০৭ মার্চ, ২০২১ ১১:৫৪ পিএম

করোনা তাণ্ডবের এক বছর আজ, প্রাণ ঝড়লো ১২৯ চিকিৎসকের

করোনা তাণ্ডবের এক বছর আজ, প্রাণ ঝড়লো ১২৯ চিকিৎসকের
ছবি: সংগৃহীত

মো. মনির উদ্দিন: চীনের উহান প্রদেশে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দেখা দেয় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। এর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাসটি। গত বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে দিন দুপুরের পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই খবরে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ। ভয়াল এ খবরে কেঁপে ওঠে সবার হৃদয়।

কয়েক দিনের মাথায় সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এর পর থেকে ঘরমুখো হয়ে যায় সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। সংক্রমণ প্রতিরোধে ২৬ মার্চ লকডাউন ঘোষণা করা হলে কিছু দিনের জন্য অচল হয়ে যায় দেশের যাতায়াত ব্যবস্থা; স্থবিরতা নেমে আসে অর্থনীতিসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।

চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের চেষ্টায় সচল স্বাস্থ্যখাত

প্রাণঘাতী করোনা পরিস্থিতিতে সব কিছুতে নেমে আসে অস্বাভাবিকতা। কিন্তু দেশপ্রেমে উজ্জীবিত সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস চেষ্টা ও পরিশ্রমের কল্যাণে তখনও সদর্পে চলতে থাকে দেশের স্বাস্থ্যখাত।

ওই সময় থেকে কোভিড, নন-কোডিভ সকল রোগীকে দিন-রাত চিকিৎসা সেবা দিয়ে যান সময়ের এই শ্রতিশ্রুতিশীল সন্তানেরা। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে ঝুঁকিতে ফেলে দেন নিজের ও সজনের জীবন।

অদৃশ্য শত্রুর মোকাবিলায় চিকিৎসকরা 

দুর্বিসহ ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ মেডিভয়েসকে বলেন, কোনো প্রস্তুতি বা পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া একটি অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে চিকিৎসকরা। শুরুতে বেশ কিছু ঘাটতি ছিল। রোগ নির্ণয়ে ঘাটতি ছিল। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা কম থাকার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে তারা অভ্যস্ততা ছিল না। চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতালে ছিল সমন্বয়হীনতা। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও নার্সদের প্রস্তুত করা ছিল চ্যালেঞ্জ। অক্সিজেন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ও ভ্যান্টিলেটরের ব্যবস্থা করাও ছিল কঠিন। চিকিৎসকদের জন্য গাইডলাইন তৈরি করা ছিল আরেকটি চ্যালেঞ্জ।’

পিপিই সংকটে তটস্থ স্বাস্থ্যকর্মীরা 

ভয়াবহ দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘শুরুতে সুরক্ষার কিছুটা ঘাটতি থাকায় চিকিৎসক-নার্সরা রোগীর কাছে যেতে খানিকটা ভয় পেতেন। এমনকি করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিকে সজনেরা দেখতে যেতে পারতেন না। সীমিত সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে কবর দিতেন, না হয় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করতেন।

চলে গেলেন ১২৯ চিকিৎসক

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে বিগত এক বছরে প্রাণ হারান শতাধিক চিকিৎসক। গত ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ)তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত চিকিৎসক ১২৯ জন চিকিৎসক করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

এর মধ্যে রয়েছেন নবীন চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, যাদের শূন্যতা আগামী ৫০ বছরেও পূরণ হওয়ার নয়।

অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করেছেন। এটা করতে গিয়ে অনেক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা মারা গেছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের চিকিৎসকরা প্রমাণ করেছেন, দেশের মানুষের জন্য তারা প্রতিমুহূর্তে প্রস্তুত। প্রমাণ হয়েছে, তারা কতটা ঐক্যবদ্ধ এবং এ দেশের মানুষের জন্য নিবেদিত।’

কমে আসছে সংক্রমণ 

শীত মৌসুমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল বিশেষজ্ঞসহ সকল মহলে। তবে সে আশঙ্কা দূর করে চলতি বছরের প্রথম মাস থেকেই কমতে শুরু করেছে সংক্রমণের হার। একই সঙ্গে কমেছে মৃত্যুর হারও। 

সংক্রমণের দশম মাসে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের হার ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসে। অর্থাৎ সেদিন পরীক্ষা অনুপাতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নমুনা পরীক্ষার হার চার দশমিক ৩০ শতাংশ। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ৪০ শংতাশ। শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার এক দশমিক ৫৪ শতাংশ।

সতর্ক জীবন যাপনের পরামর্শ 

সংক্রমণ কমে আসলেও করোনা থেকে পুরোপুরি মুক্তির জন্য আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি গাছাড়া ভাব দেখা দিয়েছে। তারা যেভাবে অবাধে বেপরোয়া চলাফেরা করছেন—এই মুহূর্তে এটা সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।

এ নিয়ে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘গতকাল অনলাইনে চিকিৎসা করতে গিয়ে আমি তিনজন রোগীর মধ্যে করোনা পজিটিভ পেয়েছি। গত এক মাসেও তা পাওয়া যায়নি। আমাদের এখনো গাছাড়া হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ আমরা সবাই এখনো টিকা নেইনি। টিকাদানের মাধ্যমে ৭০ ভাগ প্রতিরক্ষা পেলেও ৩০ ভাগের বিষয়ে আমরা এখনো জানি না। এজন্য আমাদেরকে এখনো সতর্ক থাকতে হবে।’ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি